ক্যাবের বার্ষিক প্রতিবেদন

দ্রব্যমূল্যের অভিঘাতে ১২ কোটি মানুষ

২০১৭ সালে ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ * পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়েছে ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির অভিঘাতে পড়েছে দেশের অতি দরিদ্র, হতদরিদ্র, নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের ১২ কোটি মানুষ। ২০১৭ সালে চালসহ বেশকিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা ও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা এই অভিঘাতের শিকার হয়েছেন। এতে মানুষের জীনযাত্রার ব্যয় অত্যধিক হারে বেড়ে গেছে। এর প্রভাবে বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ দেশের সার্বিক উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ পর্যবেক্ষণ কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)। এই অভিঘাত উত্তরণে সংস্থাটি ১০ দফা সুপারিশও করেছে।

মঙ্গলবার দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ক্যাব। এতে বলা হয়, বিদায়ী বছরে ঢাকাবাসীর জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ। পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়েছে ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। বৃদ্ধির এই হার আগের বছরের চেয়ে বেশি। ২০১৬ সালে এই বৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৪৭ এবং ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। রাজধানীর ১৫টি খুচরা বাজার ও বিভিন্ন সেবা-সার্ভিসের মধ্যে থেকে ১১৪টি খাদ্যপণ্য, ২২টি নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী এবং ১৪টি সেবা-সার্ভিসের তথ্য এই পর্যালোচনায় বিবেচনা করা হয়েছে। এই হিসাব শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রকৃত যাতায়াত ব্যয় বহির্ভূত।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৭ সালে সব ধরনের চালের গড় মূল্য বেড়েছে ২০ দশমিক ৪০ শতাংশ। তুলনামূলক বেশি বেড়েছে মোটা চালের দাম। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে পেঁয়াজের। দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৪০ দশমিক ৯৯ শতাংশ ও আমদানিকৃত পেঁয়াজে ৫৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এছাড়া এই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার বেশিরভাগেরই দাম বেড়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির ফলে মানুষ অনেকে কষ্টে আছেন। তাদের জমানো সঞ্চয় হ্রাস পাচ্ছে। এ প্রবণতার প্রতিকার জরুরি। অন্যথায় স্থিতিশীলতা ব্যাহত হতে পারে। ১২ থেকে ১৫টি অতি প্রয়োজনীয় পণ্য চিহ্নিত করে সেসব পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল ও মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করারও সুপারিশ করা হয়েছে ক্যাবের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, এর লক্ষ্যে ‘সরবরাহ ও মূল্য’ নামে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি পৃথক বিভাগ অথবা একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করা যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার দায়িত্বে তার কার্যালয়ে একটি পৃথক উইং প্রতিষ্ঠাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে বক্তব্য দেন ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান, সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির ভূঁইয়া, জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম, আহ্বায়ক স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন প্রমুখ।

গোলাম রহমান বলেন, দেশে এখনও প্রায় দুই কোটি মানুষ অতি দরিদ্র। এছাড়া বেশিরভাগ জনসংখ্যা হতদরিদ্র, নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের মানুষ। পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধিতে এসব মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব আরও বেশি হারে পড়েছে। এতে ধনী দরিদ্রের বৈষম্য বাড়াচ্ছে। মানুষের মাঝে হতাশা আর অসন্তোষ বাড়ছে। দেশে অর্থনৈতিক অনেক উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু ২০১৭ সালে এই মানুষেরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল পায়নি। এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে সরকারকে অবশ্যই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত এক বছরে শাকসবজির গড়ে দাম বেড়েছে ২৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। তরল দুধে বেড়েছে ২০ দশমিক ৩৬ শতাংশ, গরুর মাংস ১৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। ভোজ্যতেলে ১০ দশমিক ৭৮ শতাংশ, চা-পাতায় বেড়েছে ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ। সেবা খাতে ২ বার্নার গ্যাসের চুলার গ্যাসের মূল্য বেড়েছে ২৩ দশমিক ০৮ শতাংশ, আবাসিক খাতে বিদ্যুতের মূল্য বেড়েছে ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ, বাণ্যিজিক খাতে বেড়েছে ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ। বাসা ভাড়া বেড়েছে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে গত এক বছরে কিছু পণ্যের দাম কমেছে বলেও জানায় ক্যাব। দেশি মসুর ডালের দাম কমেছে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। কমেছে ফার্মের ডিম, নারকেল তেল, আলু, রসুন, জ্বালানি তেলের দাম। সার্বিকভাবে মাছের দাম বাড়লেও দেশে উৎপাদিত কই ও ইলিশের দাম কমেছে।

ক্যাবের জরিপে বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক অপচয়ের বিষয়টিও জোরালোভাবে উঠে এসেছে। কম খরচে বিদ্যুতের উৎপাদনে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বেশি দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। স্বল্প ব্যয়ে উৎপাদন কৌশল গ্রহণ না করায় বছরে ৬ হাজার ৩৪২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। ক্যাব দাবি করছে, সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবর্তে ব্যয়বহুল রেন্টাল কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ, চুক্তি পরিবর্তন করে মেঘনাঘাট বিদ্যুৎ কেন্দে ফার্নেস অয়েলের পরিবর্তে ডিজেল ব্যবহার, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির সময় ক্যাপাসিটি পেমেন্ট যৌক্তিক হারে না কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় না করায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি ব্যয় হচ্ছে।

ক্যাব বলেছে, ২০১৭ সালেও স্বাস্থ্য খাতে সেবার মান ছিল আগের মতোই প্রশ্নবিদ্ধ ও ব্যয়বহুল। সরকারি হাসপাতালে রোগীর বাড়তি চাপ ও অব্যবস্থাপনা অব্যাহত আছে। সরকারি হাসপাতালে, বিশেষ করে মফস্বল এলাকার হাসপাতালে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দক্ষ লোকবলের অভাব, প্রাইভেট হাসপাতালের দালালের প্রকোপ ইত্যাদি কারণে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা হতে ভোক্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। দরিদ্রদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য স্বাস্থ্যকার্ড ব্যবস্থা চালু এবং স্বাস্থ্য খাতকে রাজনীতি ও দুর্নীতিমুক্ত রাখার পরামর্শ রাখে ক্যাব। এছাড়া হৃদরোগ বা হার্টের চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্টের মূল্য নির্ধারণ সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে ক্যাব মনে করে, জনস্বার্থে ডাক্তারদের ফিসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ, ওষুধের মান ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ; বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সুলভে মানসম্মত চিকিৎসা ও সেবা প্রদান নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে ভোক্তারা উপকৃত হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×