রাজধানীর ধূপখোলা এলাকা

আসকারি বাহিনী মূর্তিমান আতঙ্ক

চাঁদাবাজি, জুয়াসহ নানা অভিযোগ * আছে টর্চার সেল

  যুগান্তর রিপোর্ট ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া থানার ধূপখোলা এলাকায় মূর্তিমান আতঙ্ক আসকারি বাহিনী। এ বাহিনীর মূল হোতা ৪৫নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি হাসান আসকারি। এলাকায় নিজের ভাই-ভাতিজা ও সহযোগীদের নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন একচ্ছত্র আধিপত্য। ক্যাসিনো ব্যবসায়ী এনু-রুপনের ভাই রাশিদুল ওরফে রশিদের সঙ্গে জুটি বেঁধে দখলে রেখেছেন ধূপখোলা এলাকার ইস্ট অ্যান্ড ক্লাব। এ ক্লাবে বছরের পর বছর চলে আসছিল জুয়ার আসর। এছাড়া খেলার মাঠে অবৈধভাবে বসানো হতো মেলা, সার্কাস। এদিকে মাঠের চারপাশের ফুটপাত, ধূপখোলা বাজার, কাঁচাবাজার থেকে হাসান আসকারির লোকজন নিয়মিত চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। শুধু তাই নয়, কেউ প্রতিবাদ করলে তার ওপর নেমে আসে নির্যাতনের স্টিমরোলার। ভুক্তভোগীদের দেয়া তথ্যে এবং আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর পাঠানো আবেদনে উঠে এসেছে হাসান আসকারির নানা অপকর্মের ফিরিস্তি।

অপরদিকে অভিযোগের বিষয়ে হাসান আসকারির সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে যুগান্তরকে বলেন, এলাকায় এসে তদন্ত করে আমার বিরুদ্ধে লেখেন। ধূপখোলা এলাকায় তিন দিন ঘুরে এ প্রতিবেদক প্রতিবেদন তৈরি করেছেন, এ কথা জানানো হলে হাসান আসকারি বলেন, আমি চায়ের দাওয়াত দিলাম, দুই ভাই বসে চা খেতে চাই। আপনি যদি না আসেন তবে বলেন আমি আপনার সঙ্গে দেখা করি। এর আগে তিনি নিউজ করলে মামলা করে দেব বলে হুমকি দিয়েছিলেন এ প্রতিবেদককে। এ বিষয়ে সোমবার আবারও প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আসলে কথাটা আমি ওভাবে বলিনি। তিনি বলেন, আমার প্রতিপক্ষের লোকজন হয়তো আমার বিরুদ্ধে এসব বলতে পারে। আমি আসলে এতটা খারাপ নই। তিনি রাজাকার পরিবারের সন্তান কিনা এ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান হাসান আসকারি।

এদিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হেদায়েতুল ইসলাম স্বপনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তার হোয়াটসঅ্যাপ সচল ছিল। হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার ফোন দিলেও রিসিভ করেননি। পরে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো হোয়াটসঅ্যাপ এসএমএসে লিখে পাঠিয়ে বক্তব্য চাওয়া হলেও তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।

ধূপখোলা বাজার, টেম্পোস্ট্যান্ড ও ফুটপাত থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে হাসান আসকারির বাহিনীর বিরুদ্ধে। ৮টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, রাজাকার পরিবারের সন্তান হয়েও হাসান আসকারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৪৫নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি পদ বাগিয়ে নেন। এরপর বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। শুরু হয় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, আওয়ামী লীগ কর্মীদের ওপর হামলা। তার ছোট ভাই হারুন, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী সালমা, ভাগিনা বিদ্যুত ও ভাতিজা মিমো ৪৫নং ওয়ার্ডকে মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত করে তুলেছেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, সম্প্রতি হাসান আসকারির বাহিনী ৪৫নং ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি ছামির হোসেন জাবেদকে লাঞ্ছিত করেন। এছাড়া গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগ সহসভাপতি এসএম হোসেন কাজলের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ মোকাররম হোসেনকে ইস্ট অ্যান্ড ক্লাবে নিয়ে মারধর করে তার বাহিনীর লোকজন। এছাড়া ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহত শরীফ হোসেন খোকনকেও লাঞ্ছিত করেন আসকারি। তার বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৪৫নং ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগ সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান, থানা আওয়ামী লীগ কৃষি ও সমবায় সম্পাদক আখতার আহমেদ। এছাড়া সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর হেলেন আক্তারকেও অপদস্থ করেন আসকারি। আসকারির বিরুদ্ধে ইস্ট অ্যান্ড ক্লাবে জুয়ার বোর্ড বসানো, ধূপখোলা মাঠ এলাকায় বাজার, লেগুনাস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি, স্বজনদের নিয়ে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ কমিটি গঠনসহ ৮টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।

গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত জাহান শিপন যুগান্তরকে বলেন, হাসান আসকারি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক হেদায়েতুল ইসলাম স্বপনের সঙ্গে আঁতাত করে স্বজন ও বিএনপি থেকে কিছু লোক নিয়ে ওয়ার্ড কমিটি করেন। ওই কমিটির স্বঘোষিত সভাপতি তিনি।

এ বিষয়ে সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর হেলেন আখতার যুগান্তরকে বলেন, হাসান আসকারি ও তার বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ এলাকার মানুষ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৪৫নং ওয়ার্ড কমিটির এক নেতা যুগান্তরকে বলেন, ফারুক, জলিল মল্লিক, মনা, চিকু আলমগীর, রায়হানসহ ১২ জনের একটি বাহিনী রয়েছে হাসান আসকারির। এরা বাজারে চাঁদা আদায়সহ নানা অপকর্ম করে। এলাকায় কেউ বাড়ি করতে গেলেও আসকারি বাহিনীকে চাঁদা দিতে হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, ফারুক, ক্যাসিনো স্টাফ জলিল মল্লিক টাকা তুলে ধূপখোলা বাজার ও আশপাশ এলাকার দোকান, ফুটপাত থেকে চাঁদা তুলে হাসান আসকারিকে দেয়। মাছের হাটে প্রতি খাড়িতে চাঁদা ২০০, ২৫০, ৩৫০, ৪০০ টাকা করে আদায় করা হয়। জয়নাল মাছের খাড়ি থেকে চাঁদা তুলে জলিল মল্লিক ও ফারুকের কাছে দেয়। ফারুক গিয়ে আসকারির কাছে দেয়। কাঁচামালে আগে ছিল ২০ টাকা খাজনা। এখন ৫০ থেকে ৮০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। প্রায় ৬০টা দোকান রয়েছে কাঁচামালের। ফলপট্টিতে প্রতি দোকান থেকে আদায় করা হতো ১০০ টাকা করে। ফুটপাত বন্ধ করে দেয়ায় ফলপট্টি বন্ধ রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×