বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি: ফিলিপাইনের ক্যাসিনোতেই ঢোকে ৫০২ কোটি টাকা

মানি লন্ডারিং নিয়ে এপিজির প্রতিবেদন প্রকাশ * প্রতিবেদনটি পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের পক্ষে আসবে-বিএফআইইউ উপদেষ্টা

  মিজান চৌধুরী ৩০ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কোটি টাকা

২০১৬ সালে চুরি করে ফিলিপাইনে নেয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের ২ কোটি ৬৯০ লাখই (২৪৭ কোটি টাকা) ঢোকে ক্যাসিনোতে। ২০১৬ সালের ৫-১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিএমবি রিসোর্ট অ্যান্ড হোটেলের ক্যাসিনোতে বিপুল অঙ্কের এই অর্থ নেয়া হয়।

বাকি অর্থের ২৫৫ কোটি টাকা (৩ কোটি ডলার) চীনের এস ক্যাসিনোর জুয়াড়– ডব্লিউএক্স নামে এক ব্যক্তি নগদ তুলে নেন, ধারণা করা হচ্ছে, এই অর্থও ক্যাসিনোতেই ঢুকেছে। বাকি ১৮১ কোটি টাকা (প্রায় ২ কোটি ১২ লাখ ডলার) গেছে সি কর্পোরেশন নামের প্রতিষ্ঠানের নামে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী কে ডব্লিউ। সম্প্রতি ফিলিপাইনের মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন নিয়ে এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ফিলিপাইনে গত কয়েক বছরের অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রতিবেদনটি করে আন্তর্জাতিক সংস্থা এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ (এপিজি)। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

ফিলিপাইনের ওপর এপিজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে ফিলিপাইনের অবস্থা সন্তোষজনক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির অর্থ ফিলিপাইনে গেলেও তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় তা ধরা পড়েনি। সন্দেহজনক হিসেবে এত বড় লেনদেন নিয়ে কোনো আগাম সতর্ক বার্তাও দিতে পারেনি দেশটি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ সংস্থাগুলো। যদিও ফিলিপাইনের ৫টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এই বিপুল অর্থ তুলে নেয়া হয়। তবে রিজার্ভ চুরির মামলা চলমান থাকায় এপিজির এ প্রতিবেদন চাপের মুখে ফেলেছে ফিলিপাইন সরকারকে। প্রতিবেদনটি পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের পক্ষে আসবে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের (বিএফআইইউ) উপদেষ্টা দেবপ্রসাদ দেবনাথ যুগান্তরকে জানান, ফিলিপাইনের মানি লন্ডারিংয়ের ওপর এপিজির প্রতিবেদন পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের পক্ষে আসবে। এটি ডকুমেন্ট হিসেবে বিশ্বব্যাপী জানতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলা চলছে। সেখানে তথ্য হিসেবে এটি উপস্থাপন করা যাবে। তিনি বলেন, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে ফিলিপাইন তাদের পরিস্থিতি উন্নতি করতে না পারলে দেশটি অর্থ পাচার ও মানি লন্ডারিং সূচকে ‘গ্রে’ তালিকায় চলে যাবে।

জানা গেছে, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে কোন দেশের ভূমিকা কি তা মূল্যায়ন করে থাকে আন্তর্জাতিক সংস্থা-এপিজি। একটি দেশের ৩ বছরের প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডের ওপর মূল্যায়ন প্রতিবেদন করা হয়। ফিলিপাইনের ক্ষেত্রেও গত তিন বছরের তথ্য ও উপাত্ত নিয়ে প্রতিবেদনটি করেছে এপিজি।

এপিজির এ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা ছাড়াও দেশটির গত ৫ বছরে (২০১৩-২০১৭) মাদক সংক্রান্ত দেড় লাখ অপরাধ ও ৪৬ হাজার দুর্নীতির ঘটনা স্থান পেয়েছে। দুর্নীতির কারণে দেশটির জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ অর্থ নষ্ট হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, বিদেশি সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে ফিলিপাইনের উদ্যোগ সন্তোষজনক নয়। দেশটির মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এন্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের (এএমএলসি) থাকলেও তাতে রয়েছে নানা দুর্বলতা।

এএমএলসি সঠিকভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারছে না। এপিজির এ প্রতিবেদনে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নে ফিলিপাইনের অবস্থা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে রিজার্ভ চুরির এ ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে সংরক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১০০ কোটি ডলার তুলে নেয়ার জন্য ৩৫টি বার্তা পাঠানো হয়। এর মধ্যে ৫টি বার্তা কার্যকর করা হয় এবং এর মাধ্যমে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার সরানো হয়। এর মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার পাঠানো হয় ফিলিপাইনের চারটি ব্যাংকে। বাকি ২ কোটি ডলার শ্রীলংকায় পাঠানো হলেও পরে তা ফেরত পাঠানো হয়।

এপিজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার ৭ দিনের মাথায় সুইফট থেকে বার্তা পাঠানো ও টেলিফোন করা হয় এএমএলসি-কে। এর আগে এত বড় লেনদেনকে সন্দেহজনক হিসেবে সতর্ক করতে পারেনি তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিপাইনের এন্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল-এএমএলসি পরে দেখতে পায় রিজার্ভের অর্থ উত্তোলনে ফিলিপাইনের পাঁচটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জড়িত। এর মধ্যে ২০১৫ সালেই খোলা হয় ৪টি ব্যাংক হিসাব। অপর একটি খোলা হয় ঘটনার একদিন আগে ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। মি ডব্লিউএসজি নামের এক ব্যবসায়ী হিসাবটি খোলেন। শেষ হিসাব খোলার পরই প্রাথমিকভাবে দেয়া হয় ২ কোটি ২৭ লাখ ৩৫ হাজার ডলার।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুরি যাওয়া ডলারের মধ্যে ৫-১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ২ কোটি ৯০ লাখ ডলার ঢোকানো হয় বিএমবি রিসোর্ট অ্যান্ড হোটেলের ক্যাসিনোতে। ১০-১১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ২ কোটি ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৫শ’ ডলার কর্পোরেশন সি নামের প্রতিষ্ঠান তুলে নেয়। আর ৩ কোটি ডলার নগদ তুলে নেয়া হয় ৫ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে। এটি তোলেন ক্যাসিনোর চীনা জুয়াড়– ডব্লিউএক্স নামের এক ব্যক্তি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×