ওএমআর-উত্তরপত্র সরবরাহ

নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে ‘অবাস্তব’ শর্ত

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

  মুসতাক আহমদ ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার উত্তরপত্রের কাগজ এবং ওএমআর ফরম সরবরাহের কাজ নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দিতে নানা শর্ত আরোপের অভিযোগ উঠেছে। অভিজ্ঞতা ও অবকাঠামোগতসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে আরোপ করা ওইসব শর্তকে ‘অবাস্তব’ উল্লেখ করেছে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব শর্তের কারণে এটি মনোপলি হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গচ্চা যেতে পারে কোটি কোটি টাকা। এ কারণে গতবছর বিশ্ববিদ্যালয়টি একই ধরনের সেবা ৯ কোটি টাকা বেশিতে কিনেছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি প্রতিষ্ঠানকে সামনে রেখে এসব শর্তের মধ্যে আছে, বিগত ৩ বছরের মধ্যে ওএমআরসহ উত্তরপত্র সরবরাহ কাজের একক কার্যাদেশ কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা এবং সংশ্লিষ্ট কাজে মোট কার্যাদেশ কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছরের মধ্যে একক কার্যাদেশ কমপক্ষে ১ কোটি ওএমআর ফরম সরবরাহের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কমপক্ষে ২টি অনলাইন লিথোকোড মেশিন থাকতে হবে। এছাড়া অন্যান্য শিক্ষা বোর্ড যেখানে সাড়ে ৮ বাই ১১ ইঞ্চি উত্তরপত্র ক্রয় করে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়টি সাড়ে ৮ বাই পৌনে ১২ ইঞ্চির খাতা এবং সাড়ে ৮ বাই ১১ দশমিক ৬৯ ইঞ্চির ওএমআর ফরম কেনার কথা দরপত্রে উল্লেখ করেছে। এসব শর্ত পূরণ করে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানটি গত তিন বছর ধরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তরপত্র সরবরাহ করছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ও এই দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির প্রধান অধ্যাপক নোমান-উর-রশীদ যুগান্তরকে বলেন, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষেই মালামাল ক্রয়ের শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কাজের জন্য একাধিক কমিটি আছে। সরকারি ক্রয় আইনের (পিপিআর) বাইরে কিছু করা হয়নি।

জানা গেছে, লিথোকোডের ওএমআর ফরমসহ কভার পেজ ছাপানো উত্তরপত্র সরবরাহের কাজ বাংলাদেশে ছয়টি প্রতিষ্ঠান করে থাকে। এগুলো হচ্ছে- এলিট প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, এশিয়া বাংলাদেশ এসোসিয়েটস, প্রিন্ট মাস্টার, বাংলাদেশ মনোস্পুল পেপার লিমিটেড, বসুন্ধরা পেপার মিলস লিমিটেড এবং মাস্টার সিমেক্স পেপার লি.। এগুলোর মধ্যে প্রথম প্রতিষ্ঠানটি গতবছর ধরে সর্বনিু দরদাতা হয়েও কাজ পায়নি।

রেকর্ড ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে একই কাজের জন্য এমএন মল্লিক ২৭ কোটি ২৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা দর দিয়েছিল, আর এলিট প্রিন্টিং দিয়েছিল ৩২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ওই বছর তৃতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা ছিল মাস্টার সিমেক্স। তারা প্রায় সাড়ে ৩৩ কোটি টাকায় কাজটি পায়। ২০১৮ সালে একই ধরনের কেনাকাটায় এলিট প্রিন্টিং দর দিয়েছিল ৩২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। কিন্তু প্রায় ৪২ কোটি টাকায় সেই কাজটি পায় মাস্টার সিমেক্স। সে হিসাবে এই প্রতিষ্ঠানটিই এ বছরে আরোপিত শর্তগুলো পূরণ করে।

উল্লিখিত তথ্য উল্লেখ করে এলিট প্রিন্টিং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি দিয়েছে। এতে শর্তগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার আবেদন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আশরাফ আলী বলেন, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে এবারও নানা অবাস্তব শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। আমরা তা তুলে দিতে বলেছি।

জানা গেছে, দরপত্রের শর্ত তুলে দিতে মোট ৫টি প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত আবেদন করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রিন্ট মাস্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেছেন, দরপত্রের নোটিশে উল্লেখ করা শর্তগুলো দেখলেই প্রতীয়মান হয় যে, একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে চাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। কেননা, যে পরিমাণ কাজ করাবে বিশ্ববিদ্যালয় তার জন্য দুটি লিথোকোড মেশিন দরকার নেই। তাছাড়া বাংলাদেশে লিথোকোড এবং ওএমআর ফরম তৈরির কাজ করা ৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫টিরই ওই মেশিন নেই। এছাড়া বাংলাদেশের কোনো শিক্ষা বোর্ডই ২০ কোটি টাকার কাজ করায় না। একক কার্যাদেশে এক কোটি ওএমআর ফরম সরবরাহের অভিজ্ঞতাও ওই প্রতিষ্ঠানেরই আছে। একমাত্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তিন বছর ধরে এ পরিমাণ কাজ করাচ্ছে এবং তিন বছরই ওই প্রতিষ্ঠানটি কাজ পাচ্ছে। এসব কারণে প্রতীয়মান হচ্ছে, একটি প্রতিষ্ঠানকেই কাজটি দিতে চাচ্ছে তারা। এখন যেই কাজ ৩২-৩৩ কোটি টাকায় শেষ করা সম্ভব হবে, তা একক প্রতিষ্ঠানের দখলে গেলে ৫০ কোটি টাকা হয়ে যাবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাদে উত্তরপত্র এবং ওএমআর ফরম কেনাকাটার কাজ করে থাকে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় কেনাকাটা করা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের প্রধান সিস্টেম অ্যানালিস্ট মনজুরুল কবীর যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা বছরে তিনটি পরীক্ষার জন্য তিনবারে সর্বোচ্চ ১৬-১৭ কোটি টাকার কেনাকাটা করি। একক দরপত্রে ২০ কোটি বা এর বেশি টাকার কেনাকাটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় করে থাকে।

জানা গেছে, গত ৩ নভেম্বর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এরমধ্যে এশিয়া বাংলাদেশ এসোসিয়েটসের চিটিতে দরপত্রে আরোপিত অবাস্তব শর্তের সংশোধন চেয়ে বলা হয়, শর্তের কারণে মাস্টার সিমেক্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান কাজটি পাবে। বাস্তব শর্ত আরোপ করা হলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতা করতে পারবে। এ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আবদুল মান্নান বলেন, একই প্রতিষ্ঠান বারবার যেন কোনো কাজ না পায় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা আছে। অথচ অভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবাস্তব শর্ত আরোপ প্রশ্নবিদ্ধ।

এ প্রসঙ্গে রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মোল্লা মাহফুজ আল-হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের কেনাকাটার ক্ষেত্রে শর্ত তিনি তৈরি করেন না। স্বাক্ষর দানকারী হিসেবে অন্যান্য বিষয়ের মতো টেন্ডারেও তার স্বাক্ষর নেয়া হয়। এ বিষয়ে শর্ত আরোপ বা কারিগরি নির্দেশনা দেয় সংশ্লিষ্ট শাখা। যেহেতু পরীক্ষার উত্তরপত্রের বিষয়, তাই চাহিদা অনুযায়ীই শর্ত নির্ধারিত হওয়ার কথা। নির্দিষ্ট কাউকে কাজ পাইয়ে দেয়ার লক্ষ্যে শর্ত আরোপের অভিযোগ সঠিক নয়। কেননা, এজন্য একটি কমিটি আছে। তবু এ বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ শাখা ভালো বলতে পারবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্নীতি ঠেকাতে সরকার ই-টেন্ডারিং প্রবর্তন করেছে। কিন্তু সেখানে এই প্রতিষ্ঠানটি ‘দুই খাম’ পদ্ধতি চালু রেখেছে। এই পদ্ধতিই দুর্নীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এ পদ্ধতিতে প্রথম খামে থাকে দরপত্রে অংশগ্রহণকারীর নথিপত্র। এগুলোর ভিত্তিতে একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজের জন্য মনোনীত বা বাতিল করা হয়। এরপর কাজের দর সংক্রান্ত খাম খোলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় চাইলে আগে থেকে ঠিক করে রাখা প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করা যায়। ফলে সর্বনিু দরদাতা আর কাজটি পায় না।

এ ব্যাপারে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. বদরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, নিয়ম মেনেই দুই খাম পদ্ধতিতে কাজ করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে সর্বনিু দরের বিষয়টি মুখ্য নয়। উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়। তিনি বলেন, মোট কাজের ৫০ শতাংশ পরিমাণ অভিজ্ঞতা চাওয়ার বিধান পিপিআরে আছে। উত্তরপত্রের সাইজ গতবছরের মতোই আছে। যাদের নির্দিষ্ট মেশিন আছে তাদেরই কাজটি পাওয়া উচিত। নইলে পরীক্ষার মতো স্পর্শকাতর কাজে অনেক ঝুঁকিতে পড়তে হয়। পরীক্ষা শুরু করে দিয়ে ওএমআর ফরম বা উত্তরের অভাবে তা বন্ধ করা যায় না। তাছাড়া ইতিপূর্বে উন্মুক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপদে পড়ার অভিজ্ঞতা আছে। তাই আমরা ঝুঁকি নিতে চাই না বলেই এসব শর্ত।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×