বরিশালে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া চালাচ্ছে থ্রি হুইলার

বিট মানি পাওয়ায় পদক্ষেপ নেয় না পুলিশ * গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করেই দায় সারেন মালিকরা * মহানগরে সর্বোচ্চ ৪০ কিমি. গতিসীমা নির্ধারণ

  তন্ময় তপু, বরিশাল ব্যুরো ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়া বরিশালে ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যতীত ঝুঁকিপূর্ণভাবে থ্রি হুইলার যানবাহন চালাচ্ছেন চালকরা। দীর্ঘদিন ধরেই এরা লাইসেন্স ছাড়া চালালেও মাঝে-মধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করে পুলিশ। এমনটাই অভিযোগ করেছেন অনেকে। থ্রি হুইলার আলফা-মাহিন্দ্রা, গ্যাস চালিত সিএনজি, গ্যাস-তেল চালিত নীল অটোগুলো বিট মানি এবং রোটেশন অনুযায়ী পুলিশের রিকুইজিশনে কাজে লাগায় এ চালকরা বীরদর্পে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুরো নগরীজুড়ে। প্রায় ৪ হাজার ব্যাটারিচালিত অটোও চলছে বীরদর্পে। যদিও এ বাহনগুলো চলাচলে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সড়কে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মেট্রো পুলিশ। আর বিআরটিএ দাবি করছে ব্যাটারিচালিত থ্রি হুইলার অটো গাড়িগুলো অবৈধ। এ অবৈধ গাড়ির বৈধ চালক হতে পারে না। তাই এদের লাইসেন্সও নেই। পুলিশ জানিয়েছে, এসব বিষয়ে প্রায়ই অভিযান চালানো হয়। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কোনো চালকই যাত্রী পরিবহন করতে পারবে না। বেপরোয়া গতিতে থ্রি হুইলার যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে গতিসীমা নির্ধারণের কাজও ইতিমধ্যে শেষ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিআরটিএ।

বিআরটিএ বরিশাল সার্কেলের এক কর্মকর্তা জানায়, ২০১৭ সাল থেকে বরিশালে গ্যাস চালিত থ্রি হুইলার সিএনজি অটোরিকশা চালু হয়। বৈধ যান হওয়ায় বিআরটিএ কর্তৃক রেজিস্ট্রেশনও পায় এ যান। তবে এ যাবৎকাল পর্যন্ত এ সার্কেল থেকে ১৫শ’ সিএনজি রেজিস্ট্রেশন করা হলেও চালকদের কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে দেখা যায়নি। কয়েকজন চালক নিজ উদ্যেগে লাইসেন্স করলেও বাকিরা চলছেন নামসর্বস্ব সংগঠনের মাসিক ৫শ’ টাকা ফি আর মাসে একদিন পুলিশের ডিউটি করে। একই অবস্থা থ্রি হুইলার আলফাগুলোর ক্ষেত্রেও। হাইকোর্ট থেকে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এ যানের চালকরা প্রশিক্ষণ ছাড়া এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যতীত মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পুলিশ বা প্রশাসন বারবার ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেও তারা আদৌ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে দাবি বাস চালকদের। থ্রি হুইলার আলফার সংখ্যাও প্রায় ৩ হাজার। গ্যাস-তেল চালিত থ্রি হুইলারের সংখ্যাও ১ হাজারের মতো। এ যানগুলো পুলিশের কোনো কাজে না এলেও মাস শেষে পুলিশের নামে টাকা তোলা হয়ে থাকে চালক বা মালিকদের কাছ থেকে। এ যান পরিবেশ দূষণ করায় বর্তমানে এর রেজিস্ট্রেশন বন্ধ রেখেছে বিআরটিএ।

ইব্রাহিম হোসেন নামের এক বাসচালক জানান, রোববারও ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের কাশিপুর চৌমাথা এলাকায় একটি বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে আমার বাসটির সামনেই পড়েছিল একটি থ্রি হুইলার আলফা। আল্লাহর রহমতে ওই মাহিন্দ্রা আলফাতে থাকা ড্রাইভারসহ ৯ জন প্রাণে বেঁচে যায়। আমরা বারবার দাবি জানিয়ে আসছি মহাসড়কে থ্রি হুইলার সরিয়ে ফেলার বিষয়ে। এরা যে মহাসড়কে কতটা ভয়াবহ সেটা বলে বোঝানোর মতো না। সুমন গাজী নামের এক বাসচালক বলেন, থ্রি হুইলার আলফা মাহিন্দ্রার ৮০ শতাংশ চালকের কোনো লাইসেন্স নেই। বেপরোয়া গতি নিয়ে কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই এরা যাত্রী পরিবহন করে। ইতিমধ্যে অনেকগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে, সবগুলোতেই প্রাণহানি ঘটেছে। অনেককে করতে হয়েছে পঙ্গুত্ব বরণও। বর্তমানে মহাসড়কে গলার কাঁটা থ্রি হুইলার আলফা মাহিন্দ্রা হলেও নগরীতে ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন চালকদের হাতে সিএনজি ও গ্যাস-তেল চালিত নীল অটোর কন্ট্রোল থাকায় প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা। জানা গেছে, এসব দেখার জন্য বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ থেকে তদারকি না করায় নেশাসক্তরাও চালনা করে যাত্রী পরিবহন করা এ থ্রি হুইলারগুলো।

সূত্র বলছে, বরিশাল মেট্রো পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ থাকায় মাস শেষে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা চলে যায় অসাধু পুলিশ কর্মকর্তাদের পকেটে। যাতে ট্রাফিক বিভাগ মোটরসাইকেলসংক্রান্ত বিষয়ে অভিযান চালালেও থ্রি হুইলারগুলোর দিকে তাদের তেমন কোনো নজর নেই। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো মামলা দিয়েই ক্ষান্ত থাকে ট্রাফিক পুলিশ। একটি বিশেষ মহল ও পুলিশের অসাধু কর্মকর্তাদের একটি চক্র থ্রি হুইলার যানের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে বরিশালে বিআরটিএ থেকে তিন ধরনের থ্রি হুইলার যানের রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়। এর মধ্যে বরিশালে চলাচল করা প্রায় ৮ হাজার যানের চালকের লাইসেন্স নেই বলে নিশ্চিত করেছে একটি সূত্র।

বিআরটিএ বরিশাল সার্কেলের উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) জিয়াউর রহমান যুগান্তরকে জানান, থ্রি হুইলার চালকদের সংগঠনের নেতাদের নিয়ে আমরা শিগগিরই বসব। সব চালককে ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার জন্য আমরা নির্দেশনা দেব। নতুবা ওই গাড়ি চালককে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে। ইতিমধ্যে যে থ্রি হুইলারটা গ্যাসে এবং তেলে চলে অর্থাৎ নীল অটো যেটাকে বলা হয় বিআরটিএ থেকে সেটির রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করা হয়েছে। কেননা এ গাড়িটি পরিবেশ দূষণ করে থাকে। ইতিমধ্যে আমরা নগরীর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪০ কিলোমিটার গতিসীমা নির্ধারণ করেছি। যা এক সপ্তাহের মধ্যেই চালু করা হবে।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান যুগান্তরকে বলেন, বিআরটিএ থেকে রেজিস্ট্রেশন দেয়া থ্রি হুইলার যান চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে সে অবৈধভাবে গাড়ি চালনা করছে। এদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করব। নগরীতে কোনো ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলতে পারবে না। এই সংক্রান্ত অভিযান শিগগির শুরু হবে। যে থ্রি হুইলারগুলো অবৈধ অর্থাৎ বিআরটিএর রেজিস্ট্রেশন নেই, সেই গাড়ির তো বৈধ চালক হতে পারে না। তাই সেই থ্রি হুইলার গাড়িগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×