অর্থনীতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন: চাপের মুখে আমদানি রফতানি খাত

বেড়েছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি * রেমিটেন্স, রাজস্ব ও বিনিয়োগে স্বস্তি * ক্যাসিনোসহ সার্বিক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন ব্যবসায়ীরা -এম কে মুজেরী

  মিজান চৌধুরী ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংক

দেশে আমদানি-রফতানি চাপের মুখে পড়েছে। অর্থবছরের শুরুতে এ খাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে, বেড়েছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। এর সঙ্গে পেঁয়াজের দাম যোগ হয়ে মূল্যস্ফীতি আরেক দফা বাড়তে পারে। তবে সরকার প্রণোদনা দেয়ায় বেড়েছে রেমিটেন্সের পরিমাণ।

পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ ও রাজস্ব আহরণের গতি কিছুটা ইতিবাচক অবস্থানে আছে। দীর্ঘ আলোচনার পর ব্যাংকগুলোতে কমতে শুরু করেছে স্প্রেডের হার। যা ঋণের সুদের হার একক অঙ্কে নামিয়ে আনতে সহায়তা করবে।

অর্থবছরের (২০১৯-২০) প্রথম প্রান্তিকের অর্থনীতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে এ চিত্র। সম্প্রতি প্রতিবেদনটি পাঠানো হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরী যুগান্তরকে বলেন, ক্যাসিনোসহ সামগ্রিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান ইতিবাচক। তবে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন ব্যবসায়ীরা। যে কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা গতি কমে যাওয়ায় আমদানি-রফতানির পরিমাণ কমছে। এ জন্য অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের পরিমাণও কমছে। যদিও বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে। এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, কার্তিকে একটি মৌসুমের ধাক্কা পড়ে নিত্যপণ্যের ওপর। যে কারণে এ সময় মূল্য কিছুটা বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে পেঁয়াজের ইস্যু যোগ হওয়ায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়বে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থনীতির অন্যান্য খাতের অবস্থা খারাপ থাকলেও এতদিন বৈদেশিক খাত ভালো ছিল। কিন্তু বর্তমানে এ খাতেও কালো মেঘ দেখা দিয়েছে। তার মতে, দেশের অর্থনীতির আকার ৩০০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১২০ বিলিয়ন ডলারই কোনো না কোনোভাবে বিদেশের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এ খাতে গুরুত্ব দেয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগ বাড়লেও তা সরকারিভাবে অবকাঠামো খাতে। এর সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ, রাজস্ব আদায়, মুদ্রানীতি, টাকার মূল্যমান, আয়-ব্যয় এবং অন্যান্য বাণিজ্যনীতির সম্পর্ক খুবই দুর্বল।

আমদানি ও রফতানি খাত : সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে দেশের আমদানি-রফতানি খাত। গত জুলাই-অক্টোবর চার মাসে রফতানি আয় হ্রাস পেয়েছে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৬১ কোটি মার্কিন ডলার। এ সময় লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় প্রায় ১ হাজার ৪৩৩ কোটি মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে প্রকৃত রফতানি আয় হয়েছে ১ হাজার ২৭২ কোটি ডলার। এ ছাড়া আমদানির পরিমাণও কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়- কাস্টমস সংক্রান্ত আমদানির রাজস্ব আয় কমেছে ২ দশমিক ২৯ শতাংশ। এ সময় আয়ের লক্ষ্য ছিল ৯৫৪ কোটি মার্কিন ডলার। বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয় ৯৩২ কোটি ডলার। এদিকে জুলাই-আগস্টে এলসি খোলার পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। এ সময় ৯০৩ কোটি মার্কিন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে।

রাজস্ব আদায় : চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকরের কারণে সংশ্লিষ্টরা আশা করছে এটি অর্জন সম্ভব হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী অর্থবছরের প্রথম দু’মাসে রাজস্ব আদায়েও কিছুটা গতি পেয়েছে। এ সময় রাজস্ব সংগ্রহ হয়েছে ২৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। এটি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৯৫৯ কোটি টাকা বেশি। গত অর্থবছরে একই সময়ে আদায়ের পরিমাণ ছিল ২৮ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা।

মূল্যস্ফীতি : খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেকটা চাপের মুখে রয়েছে। অক্টোবরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে যোগ হয়েছে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্য। যা মূল্যস্ফীতিকে আরেক দফা উসকে দেবে। বর্তমানে এক কেজি পেঁয়াজ ২৪০ টাকা অতিক্রম করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, মূল্যস্ফীতির পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে অক্টোবরে কিছুটা কমে ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। এর আগের মাসে ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এ সময় কমেছে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি।

আর্থিক খাত : ব্যাংক ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার দাবি দীর্ঘদিনের। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীও নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের মালিকরা একক অঙ্কে সুদের হার নামিয়ে আনার কথা বলে সরকারের কাছ থেকে কিছু সুবিধা নিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল একাধিকবার বলেছেন ঋণের সুদের হার এত বেশি হলে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবেন না। তবে দীর্ঘদিন পর কিছুটা কমতে শুরু করেছে ঋণের সুদ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান- স্প্রেডের হার গত আগস্টে কিছুটা কমেছে। ওই মাসে স্প্রেডের হার দাঁড়িয়েছে ৪ শতাংশে। যা গত জুলাইয়ে ছিল ৪ দশমিক ০৯ শতাংশ।

বিদেশি বিনিয়োগ : দীর্ঘদিন মন্দা কাটছে না বিদেশি বিনিয়োগে। বিনিয়োগে মন্দা কাটাতে বিশেষ উদ্যোগও নেয়া হয়। তবে সর্বশেষ হিসাবে বিনিয়োগে কিছুটা ইতিবাচকের আভাস পাওয়া গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক জুলাই-আগস্টে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৭৫ কোটি মার্কিন ডলার। এটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে একই সময়ে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসে ৭০ কোটি মার্কিন ডলার।

রেমিটেন্স : রেমিটেন্স নিয়ে স্বস্তিতে আছে সরকার। বৈধপথে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স আয় বাড়াতে গত জুলাই থেকে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা চালু করা হয়েছে। অর্থাৎ ১০০ টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠালে তিনি ১০২ টাকা পাবেন। এরপর থেকে রেমিটেন্স বাড়তে থাকে। গত জুলাই-সেপ্টেম্বর দু’মাসে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স সংগ্রহের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি। এ সময় মোট ৪৫১ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিটেন্স আসে দেশে। এটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেশি।

চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত দেখা গেছে। একটি দেশের চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত থাকা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। এটি গত বছর জুলাই-আগস্টে ঘাটতি ছিল। তবে চলতি বছরের একই সময়ে সেটি উদ্বৃত্ত হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে স্বস্তি নিয়ে আসছে। গত জুলাই-আগস্টে ব্যালেন্স অব পেমেন্ট উদ্বৃত্ত ৩১ কোটি ডলার।

কৃষিঋণ : কৃষকদের ঋণ দেয়ার পরিমাণ কমেছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঋণের পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

অকৃষি ঋণের পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×