স্থবির মশক নিধন কার্যক্রম, মশার কামড়ে অতিষ্ঠ ঢাকাবাসী

  মতিন আব্দুল্লাহ ১৪ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মশা নিধন
মশা নিধন কার্যক্রম। ফাইল ছবি

ঢাকার দুই সিটির ভোটের ডামাডোলে স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানীর মশক নিধন কার্যক্রম। যার ফলে এডিস মশার মতো কিউলেক্স মশাও নগরবাসীর বড় যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাত কিংবা দিন সারাক্ষণই মশার কামড়ে অতিষ্ঠ নগরবাসী।

ছোট্ট শিশু বা স্কুলপড়ুয়া খুদে শিক্ষার্থীদের নিয়েই বেশি বিপাকে অভিভাবকরা। দিনের বেলায়ও কয়েল, স্প্রে ব্যবহার বা মশারি না টানিয়ে কেউই ঘুমানো বা বিশ্রাম নিতে পারছেন না। এ ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার চরম উদাসীনতায় ক্ষুব্ধ, বিরক্ত নগরবাসী।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, মূল রাজধানীর ১৩৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে প্রায় ৬ বর্গকিলোমিটার জলাশয় রয়েছে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এসব জলাশয়ের মালিক।

সিটি কর্পোরেশনসহ সব সংস্থার নিজ নিজ জলাশয় পরিষ্কার করার দায়িত্ব থাকলেও কেউই করছে না। অন্যান্য বছর কিউলেক্স মশার প্রজনন মৌসুমের শুরুতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো জলাশয় পরিষ্কার করলেও এবার তেমন কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

একইচিত্র বিরাজ করছে, দুই সিটি কর্পোরেশনসহ অন্যান্য সেবা সংস্থা মিলিয়ে অন্তত ৩০০ কিলোমিটার কার্পেটিং ড্রেনের ক্ষেত্রেও। এসব ড্রেনে মশক নিয়ন্ত্রণে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি ওষুধ ছিটানোর কাজও পরিচালনা করতে পারছে না দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো। পর্যায়ক্রমে কার্পেটিং ড্রেনগুলো উন্মুক্ত করার বিষয়ে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে তেমন কোনো উদ্যোগও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সংস্থার আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত) মো. আবদুল হাই যুগান্তরকে বলেন, আমরা ঢাকা শহরের ১০ ভাগের এক ভাগের মালিক।

অন্যান্য অংশের মালিক বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ও সংস্থা। এ কারণে অন্যান্য এলাকার জলাশয়গুলো আমরা পরিষ্কার করতে পারছি না। তবে আমরা এডিস ও কিউলেক্স দুই ধরনের মশক নিয়ন্ত্রণে যৌথভাবে কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রেখেছি।

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. মোমিনুর রহমান মামুন যুগান্তরকে বলেন, মশক নিধনের রুটিন কাজের পাশাপাশি জলাশয় পরিষ্কারের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

তবে সব জলাশয় ডিএনসিসির আয়ত্তে না থাকা এবং কার্পেটিং ড্রেনগুলোয় মশার ওষুধ ছিটাতে না পারার কারণে মশক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে। আমাদের রুটিন কাজের পাশাপাশি স্পেশাল কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করছি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে মশক নিয়ন্ত্রণে সফল হবো।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মীর মুস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মশক নিয়ন্ত্রণে ডিএসসিসি রুটিন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া সার্ভে অনুযায়ী মশার প্রজননস্থল ধ্বংসেও কার্যক্রম জোরালো করা হয়েছে।

পাশাপাশি কচুরিপনা পরিষ্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনা করলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করছি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিউলেক্স মশা থেকে ফাইলেরিয়াসিস (গোদ রোগ) ও ওয়েস্ট নাইল (এক ধরনের জ্বর) ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও উদাসীন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস সাধারণত কাকজাতীয় পাখির শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকে।

এই ভাইরাসে সংক্রমিত মশা কামড়ালে মানুষ এতে আক্রান্ত হয়। ভাইরাসের কারণে স্নায়ুতন্ত্রের রোগে মানুষের মৃত্যুও হতে পারে। আক্রান্ত মানুষের ৮০ শতাংশের রোগের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।

এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে দুই সিটির কিছুদিন ব্যাপক তোড়জোড় থাকলেও পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ৮০ ভাগ মশক নিধন তৎপরতা গুটিয়ে নেয়া হয়েছে। স্বল্পসংখ্যক মশক নিধন কর্মী দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে কিছু কাজ সচল রাখা হয়েছে।

ডিএনসিসির সংশ্লিষ্টরা জানান, মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে ডিএনসিসির ২৭০ জন জনবল রয়েছে। নতুন করে ৫৪টি ওয়ার্ডে ১০ জন করে জনবল নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। নতুন আধুনিক মানের ২৩৮টি ফগার মেশিন, ২০টি মিক্সড ব্লেয়ারসহ বেশকিছু সরঞ্জাম ক্রয় করা হয়েছে।

এছাড়া একজন কীটতত্ত্ববিদকে প্রধান করে ১০ জনের একটি টিমের সমন্বয়ে ডিএনসিসি নিজ এলাকায় জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে। সেখান থেকে তারা জানতে পেরেছে, ডিএনসিসির ৫৪টি ওয়ার্ডের ৫৪০টি স্থানে ৬২০টি কিউলেক্স মশা প্রজননের হটস্পট রয়েছে।

সেসব হটস্পটসহ ডিএনসিসি এলাকার সার্বিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ডিএনসিসির মশক নিধন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হলেও মশক নিয়ন্ত্রণে এই সংস্থার তেমন কোনো সাফল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

ডিএসসিসির সংশ্লিষ্টরা জানান, রুটিন মশক নিয়ন্ত্রণে ৪০০ জন জনবল রয়েছে। নতুন করে কিছু জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেবে তারা। সেই জনবল এলে কাজের গতি অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। নতুন করে ২৫০টি ফগার মেশিন ক্রয় করা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ডিএসসিসির মশক নিধন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। তারপরও মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে চরম ব্যর্থতা উঠে এসেছে ডিএসসিসির।

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার যুগান্তরকে বলেন, মশক নিয়ন্ত্রণে সুফল পেতে হলে ‘সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা’ গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এছাড়া ঢাকঢোল পিটিয়ে যেনতেনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করলে সেখান থেকে তেমন কোনো সুফল মিলবে না।

তিনি আরও বলেন, কিউলেক্স মশার কামড়ে ফাইলেরিয়াসিস ও ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফাইলেরিয়াসিসে আক্রান্ত হতে হলে ১০ হাজারবার কিউলেক্স মশার কামড় খেতে হবে। আর যে কোনো মশার শরীরে ওয়েস্ট লাইন ভাইরাস থাকলে, ওই মশা কামড়ালেই চিকুনগুনিয়ার মতো এক ধরনের জ্বরে আক্রান্ত হবে মানুষ।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) দাবি করেছে, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে আক্রান্ত একটি রোগী পেয়েছেন তারা। এটা ছড়িয়ে গেলে, কিউলেক্স মশাও বড় ভয়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াতে পারে। এজন্য খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ ছাড়া মশক নিয়ন্ত্রণ করা দুরূহ ব্যাপার হবে।

ঘটনাপ্রবাহ : ভয়ংকর ডেঙ্গু

আরও

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৫১ ২৫
বিশ্ব ৮,৫৬,৯১৭১,৭৭,১৪১৪২,১০৭
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×