প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের অনুশীলন গ্রন্থ

কমেছে বইয়ের দাম সমন্বয় করে আকার

শিক্ষকদের উপহার-উপঢৌকন ও ডোনেশন দেয়া বন্ধ

  মুসতাক আহমদ ১৫ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নতুনরূপে সাজানো হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণির সৃজনশীল অনুশীলনমূলক ও শিক্ষাসহায়ক গ্রন্থ। শ্রেণির পাঠের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারণ করা হয়েছে এসব বইয়ের আকার। পাশাপাশি নির্ধারণ করা হয়েছে দাম। এতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের এসব সহায়ক এবং অনুশীলনমূলক বইয়ের দাম ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বেসরকারিভাবে বই পাঠ্যভুক্ত করতে শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক সমিতিকে ডোনেশন, চাঁদা ও উপহার-উপঢৌকন দেয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। এছাড়া অসুস্থ প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে খুচরা ব্যবসায়ীদের উচ্চহারে কমিশন প্রদান করা হতো। ছিল বিক্রি-পরবর্তী ক্যাশব্যাক প্রথা। এই তিনটি চর্চাই বন্ধ করে দিয়ে প্রকাশকরা বইয়ের দাম কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে এখন থেকে গায়ে লেখা দামেই বিক্রি হবে বই। ১ জানুয়ারি কার্যকর হয়েছে নতুন দর।

সোমবার বইয়ের সবচেয়ে বড় বাজার বাংলাবাজারে সরেজমিন দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা নতুন রেটে পাইকারি দরে বই কিনছেন। খুচরা ওষুধ ব্যবসায়ীদের মতোই এসব বিক্রেতার জন্য সংরক্ষিত কমিশনে বিক্রি হচ্ছে ওইসব বই। প্রতিটি বইয়ের ইনারে পরিবর্তিত দর দেয়া হয়েছে। আগে যে বইয়ের গায়ের দর লেখা ছিল ৪৪৫ টাকা, এখন সেটিতে লেখা হয়েছে ২৬৫ টাকা। বইয়ের গায়ে দেয়া ওই দামেই বিক্রি হবে তা। এক্ষেত্রে সাধারণ ক্রেতা আগের মতো ‘কমিশন’ পাবেন না। ‘গাইড বই’ হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন শ্রেণির অনুশীলনমূলক গ্রন্থ এবং ব্যাকরণ, রচনা, গ্রামার, রেপিড রিডার ও একাডেমিক গল্পগ্রন্থের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তিত দর কার্যকর করা হচ্ছে। কিন্তু কিন্ডারগার্টেনের বিভিন্ন বইয়ের দাম আগের মতোই আকাশচুম্বী আছে। অবশ্য সৃজনশীল গ্রন্থ গল্প, উপন্যাসসহ অন্যান্য সাহিত্যের নতুন বই আছে এই উদ্যোগের বাইরে।

বইয়ের এই দরদাম নিয়ন্ত্রণ করছে এই খাতের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ‘বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি’ (বাপুস)। আলাপকালে সংগঠনটির সভাপতি আরিফ হোসেন ছোটন যুগান্তরকে বলেন, একই আকারের বই ভিন্ন দরে বাজারে থাকায় নানা সমস্যা ছিল। তাছাড়া এক্ষেত্রে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ব্যবসায়িক নৈতিকতার বিষয়টিও কাজ করেছে। সবমিলে দর কমানোর ক্ষেত্রে এই খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর সুবিধা বিবেচনায় পেয়েছে। তিনি বলেন, একদরে বই বিক্রির ব্যবস্থা করার ব্যাপারে সারাদেশ থেকে সাধারণ সদস্যদেরও দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। যে কারণে গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ সাধারণ সভায় (এজিএম) এ ব্যাপারে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেটিই কার্যকর হয়েছে। বাপুসের সারা দেশের ২৬ হাজার সদস্য এ নিয়ম মেনে চলবে। এ সংক্রান্ত নীতিমালা ইতিমধ্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

বাপুস সূত্র জানায়, বইয়ের দাম কমানোর লক্ষ্যে উপহার-উপঢৌকন দেয়া বন্ধ করার পাশাপাশি বইয়ের আকার ও দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। ইতঃপূর্বে কারও কারও মধ্যে বইয়ের দাম বেশি নির্ধারণের লক্ষ্যে অপ্রয়োজনেও বইয়ের আকার বড় করারও প্রবণতা ছিল। বাপুসের সভাপতির নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি উভয় ক্ষেত্রে নীতি ঠিক করে দিয়েছে। সেটির আলোকে ছাপানো হয়েছে বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সহায়ক বই।

বাপুসের সহ-সভাপতি ও লেকচার পাবলিকেশন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ উল আলম যুগান্তরকে বলেন, বইয়ের দাম কমাতে গিয়ে মানের সঙ্গে কোনো আপস করা হয়নি। শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে বাপুস শ্রেণিভেদে বইয়ের সর্বোচ্চ ফর্মা সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এরপরই কমিটি বই মুদ্রণের উপাদানের বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে ফর্মা অনুযায়ী বইয়ের দাম ঠিক করে। এরপরও কেউ যদি কাউকে উপহার-উপঢৌকন দেয়, তাহলে সেটা তাকে লাভ থেকেই দিতে হবে।

নীতিমালায় দেখা যায়, অনুশীলনমূলক গ্রন্থের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শ্রেণির (বইয়ের) আকার হবে সর্বোচ্চ ৪২ থেকে ৪৭ ফর্মার। এভাবে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত যথাক্রমে ১০৪, ১২০ ও ১৯২ ফর্মার হবে। এগুলো সবই ডাবল ডিমাই আকারের। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির ক্ষেত্রে সৃজনশীল বইয়ের আকার হবে যথাক্রমে ২২৪, ২৩২ ও ৩৮৫ ফর্মা। ষষ্ঠ শ্রেণির ইংরেজি গ্রামার বই হবে সর্বোচ্চ ৮০ ফর্মা আর বাংলা ব্যাকরণ ৬৫ ফর্মা। সপ্তম শ্রেণির ইংরেজি গ্রামার ৮৫ ও বাংলা ব্যাকরণ ৭৫ ফর্মা, অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি গ্রামার ১০৫ ও বাংলা ব্যাকরণ ৯০ ফর্মা। নবম শ্রেণির ইংরেজি গ্রামার ১৩০ ও বাংলা ব্যাকরণ ১২৫ ফর্মার বেশি হবে না।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডাবল ডিমাই সাইজের প্রতিটি বইয়ের প্রতি ফর্মার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বইয়ের প্রথম ৫০ ফর্মার ক্ষেত্রে প্রতি ফর্মার মূল্য হবে তিন টাকা দশ পয়সা। পরবর্তী প্রতি ফর্মা (৫১ থেকে ১০০ পর্যন্ত) ২ টাকা ৮০ পয়সা করে। ১০১ থেকে ১৫০ ফর্মা পর্যন্ত প্রতিটির দাম ২ টাকা ৫০ পয়সা এবং ১৫১তম থেকে তদূর্ধ্ব ক্ষেত্রে প্রতি ফর্মার দাম হবে ২ টাকা ২০ পয়সা। এর সঙ্গে যুক্ত হবে চার রঙা কভার হলে ১৫ টাকা ও ইনার ১২ টাকা। এই তিনটি যুক্ত করে নির্ধারিত হবে বইয়ের দাম।

বাপুসের সহসভাপতি ও পুঁথিনিলয়ের স্বত্বাধিকারী শ্যামল পাল এ প্রসঙ্গে বলেন, নতুন দর নির্ধারণের ফলে দেখা গেছে, গতবছর ষষ্ঠ শ্রেণির একটি ইংরেজি গ্রামার বইয়ের মূল্য ছিল ৪৪৫ টাকা। জানুয়ারি থেকে তা ২৬৫ টাকা হয়েছে। আবার একই শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের মূল্য ৩৯০ টাকার স্থলে হয়েছে ২২৪ টাকা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বই বাদে অন্য কোনো ব্যবসায় ক্রেতাকে কমিশন ধরে পণ্য দেয়ার রীতি নেই। কমিশন সাধারণত পাইকারি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে খুচরা ব্যবসায়ী পেয়ে থাকেন। আর নির্ধারিত মূল্যেই বিক্রি হয় পণ্য। মূলত পূর্বসূরিদের সময়ে চালুকৃত প্রথা বন্ধ করে এই ব্যবসায় নতুন যুগের সূচনা করা হয়েছে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত