শোকে স্তব্ধ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল

নিহতদের স্মরণে তিন দিনের কর্মসূচি শুরু

  ইয়াহ্ইয়া মারুফ, সিলেট ব্যুরো ১৪ মার্চ ২০১৮, ১৭:৩৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

শোকে স্তব্ধ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল

কারও মুখে কথাবার্তা নেই। শুধু একে-অপরের দিকে তাকাচ্ছেন। চেহারায় ফুটে উঠছে সহপাঠী-স্বজন হারানোর ছাপ। নীরব-নিস্তব্ধ পরিবেশ সিলেটের রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সকাল থেকেই মেঘের ঘনঘটা আকাশে। যেন এই মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও স্টাফদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে আকাশও।

প্রতিদিনের মতো শিক্ষার্থীদের আনাগোনা নেই কলেজ ক্যাম্পাসে। একই চিত্র হাসপাতালেও। ইন্টার্নরা দল বেঁধে আসছেন, রোগীদের সেবাও দিচ্ছেন। তবে কারও মুখে নেই প্রতিদিনের মতো রঙিন হাসি। চিকিৎসক-স্টাফদেরও একই অবস্থা। চোখে-মুখে ফুটে উঠছে শোকের চায়া। মনে হচ্ছে একটি পরিবারের ১৩ জন সদস্য একই সঙ্গে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।

রোববার এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করেছিলেন রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। নেপালি ১৩ শিক্ষার্থী সঞ্জয় পাউডাল, সঞ্জয়া মেহেরজান, নিগা মেহেরজান, অঞ্জলি শ্রেষ্ঠ, পূর্ণিমা লুনানি, শ্বেতা থাপা, মিলি মেহেরজান, সারুনা শ্রেষ্ঠ, আলজিনা বড়াল, চারু বড়াল, আশনা সাকিয়া, প্রিন্সি ধামি ও সামিরা বায়ানজানকর। এদের মধ্যে ১১ জন ছাত্রী ও দু’জন ছাত্র। তারা সোমবার ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজে উড়েছিলেন।

উড়োজাহাজটি নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়। ওই উড়োজাহাজের যাত্রী ছিলেন সিলেটের রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের এই ১৩ নব্য ডাক্তার। প্রথমদিকে তারা সবাই নিহত হয়েছে বলে ধারণা ছিল কর্তৃপক্ষের।

তবে মঙ্গলবার দুপুরে কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মো. ফজলুর রহমান যুগান্তরকে জানিয়েছেন, ‘প্রিন্সি ধামি ও সামিরা বায়ানজানকর নামের দু’জন বেঁচে আছেন। তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাকিদের কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না।’

১৩ জনই ছিলেন নেপালি বাংশোদ্ভূত। উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার খবর আসার পর থেকে উদ্বিগ্ন সবাই। ১৩ জনের একজন অঞ্জলি শ্রেষ্ঠ। এই কলেজে তারা দুই বোন ডাক্তার হয়েছেন। অঞ্জিল মাত্র পড়ালেখা শেষ করে বাড়ি ফিরছিলেন। আর বড় বোন অবিকা ডাক্তার হয়ে এখানেই ইন্টার্নশিপ করছেন। বোন মিসিংয়ের খবরে অবিকা জ্ঞান হারিয়ে আছেন।

মঙ্গলবার সকালে তাকে হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। একইভাবে ১৩ জনের একজন ইন্টার্ন নেহা মাগার স্বজন। নেহাও মঙ্গলবার দুপুর থেকে অজ্ঞান। তাকে মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের ইমার্জেন্সি চিকিৎসক ডা. আবুল কালাম মুনজুল মুর্শেদ। ছাত্রী হোস্টেলের সুপারভাইজার সুরমা বেগম যুগান্তরকে জানান, ‘এদের দেখলে মনে হয় সবই একে-অপরের খুব আপন।’

ক্যান্টিনে বসে ল্যাপটপে বন্ধু মামুন আহমদের সঙ্গে ক্লাস সিট শেয়ার করছেন তাসলিমা ঝর্ণা। তারা রাগীব-রাবেয়া নার্সিং কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। দু’জনেরই মন খারাপ। মামুনের ফুটবল খেলার সাথী ছিল ওই ১৩ জনের একজন সঞ্জয়া মেহেরজান। খেলার সাথী হারিয়ে সেও শোকাহত। ১৩ জনের কয়েকজনের সঙ্গে প্রায় ক্যান্টিনে দেখা হতো তাসলিমা ঝর্ণার। তারা তাকে খুব øেহ করতেন।

রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজে পড়ালেখা শেষ করে বর্তমানে হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার ডা. নাফিসা। তিনি বলেন, ‘শেষ বর্ষে ওদের সঙ্গে পরিচয়। এরপর থেকে ওদের আচরণে কখনও মনে হয়নি ওরা ভিনদেশি। পরিবেশ ভারী কলেজ ক্যাম্পাসের পাশের দোকানগুলোয়ও। সারিফ অ্যান্ড রাফি স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. রবুল হোসেন।

তিনি বলেন, রোববার ১৩ জনের দু’জন সঞ্জয়া মেহেরজান পূর্ণিমা লুহানির সঙ্গে কথা হয় আমার। বাড়ি যাচ্ছি জানিয়ে তারা বলেছিল ফিরে আসছি, দোয়া করবেন। তাদের আর ফিরে আসা হবে না!

কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মো. ফজলুর রহমানও শোকে স্তব্ধ। তিনি বলেন, রোববার রাতে তারা এসে জানায় বাড়ি যাবে। রাত ১২টায় অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে তাদের বাস কাউন্টারে পৌঁছে দেয়া হয়েছিল।’

তিনি জানান, সকালে কলেজের একাডেমিক ভবনে কাউন্সিলের মিটিং হয়েছে। সব বিভাগীয় প্রধান, গভর্নিং বড়ির চেয়ারম্যানসহ সবাই উপস্থিত ছিলেন। মিটিংয়ে তিন দিনের শোক ঘোষণা করা হয়। ক্লাস-পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। মঙ্গলবার কালো ব্যাজ ধারণ ও পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।

ফয়জুর রহমান বলেন, মিসিং হওয়া অঞ্জলি শ্রেষ্ঠর বোন অবিকা সুস্থ হলে তাকে কলেজ কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় দেশে পাঠানো হবে। ইতিমধ্যে কলেজ কর্তৃপক্ষ নেপালে থাকা প্রতিনিধির মাধ্যমে সান্ত্বনাপত্র পাঠানো হয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ : নেপালে ইউএস বাংলা বিধ্বস্ত

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter