প্রশ্নের মুখে কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা
jugantor
প্রশ্নের মুখে কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা
শিক্ষকদের দৃষ্টিতে ধ্বংসের কারণ ১০টি * কোচিং বাণিজ্য, নানা খাতে চলছে শিক্ষার্থীদের অর্থ লুট * শিক্ষক অনুপস্থিতির জন্য চালু আছে ‘ম্যানেজ’ প্রথা * প্রতি বছর গড়ে ৩৭টি অনার্স কলেজ অনুমোদন * যত্রতত্র অনার্স খুলে আমরা শিক্ষিত বেকার তৈরি করে ফেলেছি-শিক্ষামন্ত্রী

  মুসতাক আহমদ  

০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কলেজগুলোতে নেই পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। এসব প্রতিষ্ঠানে একাদশ বা ডিগ্রি শিক্ষা কার্যক্রম চালানোই দায়। অথচ চলছে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স। প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঠিকমতো লেখাপড়া হচ্ছে না। পাশাপাশি আছে শিক্ষকদের ফাঁকিবাজি। এসব কারণে উচ্চশিক্ষা অনেকটাই হয়েছে পড়েছে কোচিং আর গাইডনির্ভর। এমন বাস্তবতায় এ ধরনের কলেজে লেখাপড়া নিশ্চিতের পরিবর্তে শিক্ষার্থী ভর্তি আর পরীক্ষা নেয়াই রুটিন হয়েছে দাঁড়িয়েছে। যুগান্তরের অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বলছেন, অন্তত দশটি কারণে কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা মান প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এগুলো হচ্ছে- মান নিশ্চিত না করে যত্রতত্র অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু; নির্বিচার ক্রাশ প্রোগ্রাম ও বছরব্যাপী পরীক্ষা; নামকাওয়াস্তে উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং প্র্যাকটিক্যাল, ইনকোর্স, ভাইভা ও টার্ম পেপার যথেচ্ছা নম্বর প্রদান। আরও আছে ফাঁকিবাজির শিক্ষকতা ও শিক্ষকদের দলাদলি; তাদের দক্ষতার অভাব; নিজ জেলায় শিক্ষক পদায়ন। কোচিং বাণিজ্য ও গাইডনির্ভরতা এবং শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকটও কম নয়। আর্থিক লোভে কলেজে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তিও কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা ধ্বংসের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া শিক্ষকদের মধ্যে নানা কারণে সৃষ্ট হতাশাও এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। এসব চিত্র সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে সব ধরনের কলেজেই বিরাজ করছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১১২১টি ডিগ্রি কলেজ আছে। আর সারা দেশে ৫৯৬টি অনার্স ও ১৭৫টি মাস্টার্স কলেজ আছে। এর মধ্যে সরকারি ডিগ্রি কলেজ ১৮৯টি আর বেসরকারি ৯৩২টি। সরকারি অনার্স ও মাস্টার্স কলেজ যথাক্রমে ২৪৩ ও ১২৫টি আর বেসরকারি অনার্স ও মাস্টার্স কলেজ ৩৫৩ ও ৫০টি।

৯ জানুয়ারি রাজধানীর আইডিইবিতে এক অনুষ্ঠানে খোদ শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, যত্রতত্র অনার্স খুলে আমরা শিক্ষিত বেকার তৈরি করে ফেলেছি। আমরা শিক্ষিত বেকার তৈরি করতে চাই না। উচ্চশিক্ষার অ্যাপেক্স বডি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একাধিক বার্ষিক প্রতিবেদনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোতে নিুমানের গ্র্যাজুয়েট সৃষ্টি হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও এ নিয়ে সুপারিশ করেছে। এর ভিত্তিতে সম্প্রতি চিঠি দিয়ে যত্রতত্র অনার্স কোর্স চালুর অনুমতি না দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গত ১১ বছরের মধ্যে গড়ে প্রতি মাসে ৩টি অনার্স কলেজ সৃষ্টি করেছে। ব্যানবেইসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৬ সালে দেশে বেসরকারি অনার্স কলেজের সংখ্যা ছিল ২০টি। ২০১০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮টি। ২০১৭ সালে তা হয়েছে ৩৬০টি। সরকারি অনার্স কলেজ সংখ্যা ২০০৬ সালে ছিল ৪১টি, ২০১০ সালে ৫৮ এবং ২০১৭ সালে ১০৮টি। সেই হিসাবে প্রতি বছর গড়ে ৩৭টি কলেজ অনুমোদন করা হয়েছে, যা প্রতি মাসে গড়ে ৩টি। আর বেসরকারি মাস্টার্স কলেজের সংখ্যা ২০০৫ সালে ছিল ২৮টি, ২০১০ সালে ৩০ এবং ২০১৭ সালে ছিল ৬১টি। নিয়ম অনুযায়ী এসব কলেজ অনুমোদনের আগে গুণগত মান নিশ্চিত করার কথা। কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক-শ্রেণিকক্ষ ও পাঠদানের পরিবেশ আছে কিনা, নিয়মিত পাঠদান হয় কিনা, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো কোথায়- অনার্স অনুমোদনের পর এ বিষয়গুলো সব ক্ষেত্রে যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি। বরং অনার্স এবং মাস্টার্স কোর্স চালুর জন্যই যেন আগ্রহ বেশি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন বাণিজ্যই এর নেপথ্য কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ উঠেছে, কোনো বিষয়ে অনার্স বা মাস্টার্স কোর্স অনুমোদনের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ধাপে ধাপে কলেজ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়।

একটি বেসরকারি অনার্স কলেজের শিক্ষক নেকবর হোসাইন জানান, অনার্স চালুর পর গত ২৬ বছরেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রতিনিধি দ্বিতীয়বার সরেজমিন কোনো কলেজে পরিদর্শন করেছেন কিনা সন্দেহ। শুধু তাই নয়, সেশনজট নিরসনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাশ প্রোগ্রাম ভালো। কিন্তু এতে লেখাপড়ার কী ক্ষতি হচ্ছে আর সেটা চিহ্নিত করে কী পদক্ষেপ নেয়া যায়, তেমন কোনো চিন্তাও করা হয়নি। তার মতে, ২০১৫ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে যে ৮১ দফা সুপারিশ তৈরি করেছিল সেগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারলে সমস্যা অনেকটাই সমাধান হয়ে যেত।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) এক কর্মকর্তা বলেন, মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি করা হয় ২ হাজার শিক্ষার্থী। অথচ বিদ্যমান অবকাঠামো সুবিধায় ৫-৬শ’ জন ভর্তি সম্ভব। ওই একই অবস্থা অনার্স, মাস্টার্স ও ডিগ্রির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেমন- ওই কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্সে ভর্তি করা হয় ৮শ’। অথচ তাদের সামর্থ্য আছে সর্বোচ্চ ১০০ জনের। এভাবে সরেজমিন ঘুরে রাজধানী ও ঢাকার আশপাশের কলেজগুলোতেও দেখা গেছে, অবকাঠামো ও ল্যাবরেটরি সুবিধার ঘাটতি সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। ওই কর্মকর্তা জগন্নাথ কলেজের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজধানীর ৭টি কলেজ নেয়ার পর শিক্ষার্থী ভর্তি সংখ্যা হ্রাসের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন, অন্যান্য কলেজেও মাত্রাতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।

প্রায় সব কলেজেই কয়েকগুণ বেশি ভর্তি করা হয় কেন- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, মূলত আর্থিক কারণেই ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ভর্তি করা হয়। বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফি ছাড়া কলেজের নানা ব্যবস্থাপনা ফি, উন্নয়ন, পরিবহন, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, বিবিধ খাতের টাকা আদায় করা হয়। দেয়া হয় বৈধ-অবৈধ ভাইভা ও প্র্যাকটিক্যাল ফি। অভিযোগ আছে, এসব খাতের টাকা ভুয়া ভাউচার, নামে-বেনামে ভাগ-বাটোয়ারা আর লুটপাট হয়। বড় বড় দুর্নীতি হয় ক্রয়, উন্নয়ন, পরিবহন, পরীক্ষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, বিবিধ খাতের টাকা। এসব অর্থের বড় অংশ পায় অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সংশ্লিষ্ট কমিটি, হিসাব শাখা ও বিভাগের শিক্ষকরা।

এখানেই শেষ নয়, ভর্তির পর তাদের নির্বিচারে পাস করানোর দায়িত্বও নেয়া হয় কোনো কোনো কলেজে! শিক্ষকদের অভিযোগ, প্র্যাকটিক্যাল, ইনকোর্স, ভাইভা ও টার্মপেপারে নির্বিচারে নম্বর দেয়া হয়। তাদের দাবি, বেশিরভাগ শিক্ষকই উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন নামকাওয়াস্তে। ফলে ফাঁকিবাজ, অযোগ্য শিক্ষার্থীরাও পরীক্ষায় ভালো ফল করছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে ন্যূনতম ৬০ শতাংশের উপস্থিতি মানা হয় না বললেই চলে। এতে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত থাকে না।

এদিকে ক্রাশ প্রোগ্রাম চালুর পর কলেজে ক্লাস কার্যক্রমের হার তুলনামূলক কমেছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির শিক্ষক কোচিংয়ের নেশায় মেতে উঠেছেন। কলেজে কলেজে কোচিং বাণিজ্যের বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ইংরেজি, আইসিটি, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিষয়ের শিক্ষকদের এ কোচিং বাণিজ্য রমরমা। কলেজ প্রশাসনকে নানাভাবে ‘ম্যানেজ’ করেই ওই কোচিং চলছে বলে সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়। শিক্ষার্থীরা বলেছেন, নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে ক্লাস হয় না বলেই তাদের কোচিংয়ের দ্বারস্থ হতে হয়।

জানা গেছে, সপ্তাহের সবদিন সরকারি কলেজ শিক্ষকরা কর্মস্থলে যান না। রুটিন করে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, অধ্যাপক থেকে শুরু করে প্রভাষক পর্যন্ত অনুপস্থিত থাকেন। এক্ষেত্রে ‘ম্যানেজ’ নামে একটি শব্দ বহুল প্রচলিত। অপরদিকে বেসরকারি কলেজে শিক্ষক নিয়োগে অনেক ক্ষেত্রে এনটিআরসিএর সনদ বাধ্যতামূলক থাকলেও তা মানা হয় না। সরকারের অন্য নিয়মেরও তোয়াক্কা করা হয় না। এক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও উদাসীন। সম্প্রতি রাজধানীর শেখ বোরহানুদ্দীন কলেজে সভাপতি থাকাকালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিন্ডিকেট সদস্য উল্লিখিত নিয়ম লঙ্ঘন করে ৪০ জনের বেশি শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন।

মুন্সীগঞ্জের একটি কলেজের এক সহকারী অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম সুমন বলেন- দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখতে ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিজ জেলায় পদায়ন না দেয়া এবং ৩ বছর পরপর বদলির বিধান আছে। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারে একজন কোনো কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে অবসরে চলে যাচ্ছেন। এ কারণে কর্মস্থলে বিশৃঙ্খল, অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব, প্রতিপত্তি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, কোচিং বাণিজ্য, অনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অস্বচ্ছতা দিন দিন বাড়ছে। অনেক কলেজে স্থানীয় ও অন্য অঞ্চলের শিক্ষক নির্বিশেষে দ্বন্দ্ব এতই প্রকট যে তা শিক্ষা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

প্রশ্নের মুখে কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা

শিক্ষকদের দৃষ্টিতে ধ্বংসের কারণ ১০টি * কোচিং বাণিজ্য, নানা খাতে চলছে শিক্ষার্থীদের অর্থ লুট * শিক্ষক অনুপস্থিতির জন্য চালু আছে ‘ম্যানেজ’ প্রথা * প্রতি বছর গড়ে ৩৭টি অনার্স কলেজ অনুমোদন * যত্রতত্র অনার্স খুলে আমরা শিক্ষিত বেকার তৈরি করে ফেলেছি-শিক্ষামন্ত্রী
 মুসতাক আহমদ 
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কলেজগুলোতে নেই পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। এসব প্রতিষ্ঠানে একাদশ বা ডিগ্রি শিক্ষা কার্যক্রম চালানোই দায়। অথচ চলছে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স। প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঠিকমতো লেখাপড়া হচ্ছে না। পাশাপাশি আছে শিক্ষকদের ফাঁকিবাজি। এসব কারণে উচ্চশিক্ষা অনেকটাই হয়েছে পড়েছে কোচিং আর গাইডনির্ভর। এমন বাস্তবতায় এ ধরনের কলেজে লেখাপড়া নিশ্চিতের পরিবর্তে শিক্ষার্থী ভর্তি আর পরীক্ষা নেয়াই রুটিন হয়েছে দাঁড়িয়েছে। যুগান্তরের অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বলছেন, অন্তত দশটি কারণে কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা মান প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এগুলো হচ্ছে- মান নিশ্চিত না করে যত্রতত্র অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু; নির্বিচার ক্রাশ প্রোগ্রাম ও বছরব্যাপী পরীক্ষা; নামকাওয়াস্তে উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং প্র্যাকটিক্যাল, ইনকোর্স, ভাইভা ও টার্ম পেপার যথেচ্ছা নম্বর প্রদান। আরও আছে ফাঁকিবাজির শিক্ষকতা ও শিক্ষকদের দলাদলি; তাদের দক্ষতার অভাব; নিজ জেলায় শিক্ষক পদায়ন। কোচিং বাণিজ্য ও গাইডনির্ভরতা এবং শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকটও কম নয়। আর্থিক লোভে কলেজে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তিও কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা ধ্বংসের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া শিক্ষকদের মধ্যে নানা কারণে সৃষ্ট হতাশাও এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। এসব চিত্র সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে সব ধরনের কলেজেই বিরাজ করছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১১২১টি ডিগ্রি কলেজ আছে। আর সারা দেশে ৫৯৬টি অনার্স ও ১৭৫টি মাস্টার্স কলেজ আছে। এর মধ্যে সরকারি ডিগ্রি কলেজ ১৮৯টি আর বেসরকারি ৯৩২টি। সরকারি অনার্স ও মাস্টার্স কলেজ যথাক্রমে ২৪৩ ও ১২৫টি আর বেসরকারি অনার্স ও মাস্টার্স কলেজ ৩৫৩ ও ৫০টি।

৯ জানুয়ারি রাজধানীর আইডিইবিতে এক অনুষ্ঠানে খোদ শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, যত্রতত্র অনার্স খুলে আমরা শিক্ষিত বেকার তৈরি করে ফেলেছি। আমরা শিক্ষিত বেকার তৈরি করতে চাই না। উচ্চশিক্ষার অ্যাপেক্স বডি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একাধিক বার্ষিক প্রতিবেদনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোতে নিুমানের গ্র্যাজুয়েট সৃষ্টি হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও এ নিয়ে সুপারিশ করেছে। এর ভিত্তিতে সম্প্রতি চিঠি দিয়ে যত্রতত্র অনার্স কোর্স চালুর অনুমতি না দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গত ১১ বছরের মধ্যে গড়ে প্রতি মাসে ৩টি অনার্স কলেজ সৃষ্টি করেছে। ব্যানবেইসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৬ সালে দেশে বেসরকারি অনার্স কলেজের সংখ্যা ছিল ২০টি। ২০১০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮টি। ২০১৭ সালে তা হয়েছে ৩৬০টি। সরকারি অনার্স কলেজ সংখ্যা ২০০৬ সালে ছিল ৪১টি, ২০১০ সালে ৫৮ এবং ২০১৭ সালে ১০৮টি। সেই হিসাবে প্রতি বছর গড়ে ৩৭টি কলেজ অনুমোদন করা হয়েছে, যা প্রতি মাসে গড়ে ৩টি। আর বেসরকারি মাস্টার্স কলেজের সংখ্যা ২০০৫ সালে ছিল ২৮টি, ২০১০ সালে ৩০ এবং ২০১৭ সালে ছিল ৬১টি। নিয়ম অনুযায়ী এসব কলেজ অনুমোদনের আগে গুণগত মান নিশ্চিত করার কথা। কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক-শ্রেণিকক্ষ ও পাঠদানের পরিবেশ আছে কিনা, নিয়মিত পাঠদান হয় কিনা, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো কোথায়- অনার্স অনুমোদনের পর এ বিষয়গুলো সব ক্ষেত্রে যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি। বরং অনার্স এবং মাস্টার্স কোর্স চালুর জন্যই যেন আগ্রহ বেশি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন বাণিজ্যই এর নেপথ্য কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ উঠেছে, কোনো বিষয়ে অনার্স বা মাস্টার্স কোর্স অনুমোদনের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ধাপে ধাপে কলেজ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়।

একটি বেসরকারি অনার্স কলেজের শিক্ষক নেকবর হোসাইন জানান, অনার্স চালুর পর গত ২৬ বছরেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রতিনিধি দ্বিতীয়বার সরেজমিন কোনো কলেজে পরিদর্শন করেছেন কিনা সন্দেহ। শুধু তাই নয়, সেশনজট নিরসনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাশ প্রোগ্রাম ভালো। কিন্তু এতে লেখাপড়ার কী ক্ষতি হচ্ছে আর সেটা চিহ্নিত করে কী পদক্ষেপ নেয়া যায়, তেমন কোনো চিন্তাও করা হয়নি। তার মতে, ২০১৫ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে যে ৮১ দফা সুপারিশ তৈরি করেছিল সেগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারলে সমস্যা অনেকটাই সমাধান হয়ে যেত।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) এক কর্মকর্তা বলেন, মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি করা হয় ২ হাজার শিক্ষার্থী। অথচ বিদ্যমান অবকাঠামো সুবিধায় ৫-৬শ’ জন ভর্তি সম্ভব। ওই একই অবস্থা অনার্স, মাস্টার্স ও ডিগ্রির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেমন- ওই কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্সে ভর্তি করা হয় ৮শ’। অথচ তাদের সামর্থ্য আছে সর্বোচ্চ ১০০ জনের। এভাবে সরেজমিন ঘুরে রাজধানী ও ঢাকার আশপাশের কলেজগুলোতেও দেখা গেছে, অবকাঠামো ও ল্যাবরেটরি সুবিধার ঘাটতি সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। ওই কর্মকর্তা জগন্নাথ কলেজের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রাজধানীর ৭টি কলেজ নেয়ার পর শিক্ষার্থী ভর্তি সংখ্যা হ্রাসের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন, অন্যান্য কলেজেও মাত্রাতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।

প্রায় সব কলেজেই কয়েকগুণ বেশি ভর্তি করা হয় কেন- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, মূলত আর্থিক কারণেই ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ভর্তি করা হয়। বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফি ছাড়া কলেজের নানা ব্যবস্থাপনা ফি, উন্নয়ন, পরিবহন, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, বিবিধ খাতের টাকা আদায় করা হয়। দেয়া হয় বৈধ-অবৈধ ভাইভা ও প্র্যাকটিক্যাল ফি। অভিযোগ আছে, এসব খাতের টাকা ভুয়া ভাউচার, নামে-বেনামে ভাগ-বাটোয়ারা আর লুটপাট হয়। বড় বড় দুর্নীতি হয় ক্রয়, উন্নয়ন, পরিবহন, পরীক্ষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, বিবিধ খাতের টাকা। এসব অর্থের বড় অংশ পায় অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সংশ্লিষ্ট কমিটি, হিসাব শাখা ও বিভাগের শিক্ষকরা।

এখানেই শেষ নয়, ভর্তির পর তাদের নির্বিচারে পাস করানোর দায়িত্বও নেয়া হয় কোনো কোনো কলেজে! শিক্ষকদের অভিযোগ, প্র্যাকটিক্যাল, ইনকোর্স, ভাইভা ও টার্মপেপারে নির্বিচারে নম্বর দেয়া হয়। তাদের দাবি, বেশিরভাগ শিক্ষকই উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন নামকাওয়াস্তে। ফলে ফাঁকিবাজ, অযোগ্য শিক্ষার্থীরাও পরীক্ষায় ভালো ফল করছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে ন্যূনতম ৬০ শতাংশের উপস্থিতি মানা হয় না বললেই চলে। এতে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত থাকে না।

এদিকে ক্রাশ প্রোগ্রাম চালুর পর কলেজে ক্লাস কার্যক্রমের হার তুলনামূলক কমেছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির শিক্ষক কোচিংয়ের নেশায় মেতে উঠেছেন। কলেজে কলেজে কোচিং বাণিজ্যের বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ইংরেজি, আইসিটি, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিষয়ের শিক্ষকদের এ কোচিং বাণিজ্য রমরমা। কলেজ প্রশাসনকে নানাভাবে ‘ম্যানেজ’ করেই ওই কোচিং চলছে বলে সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়। শিক্ষার্থীরা বলেছেন, নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে ক্লাস হয় না বলেই তাদের কোচিংয়ের দ্বারস্থ হতে হয়।

জানা গেছে, সপ্তাহের সবদিন সরকারি কলেজ শিক্ষকরা কর্মস্থলে যান না। রুটিন করে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, অধ্যাপক থেকে শুরু করে প্রভাষক পর্যন্ত অনুপস্থিত থাকেন। এক্ষেত্রে ‘ম্যানেজ’ নামে একটি শব্দ বহুল প্রচলিত। অপরদিকে বেসরকারি কলেজে শিক্ষক নিয়োগে অনেক ক্ষেত্রে এনটিআরসিএর সনদ বাধ্যতামূলক থাকলেও তা মানা হয় না। সরকারের অন্য নিয়মেরও তোয়াক্কা করা হয় না। এক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও উদাসীন। সম্প্রতি রাজধানীর শেখ বোরহানুদ্দীন কলেজে সভাপতি থাকাকালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিন্ডিকেট সদস্য উল্লিখিত নিয়ম লঙ্ঘন করে ৪০ জনের বেশি শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন।

মুন্সীগঞ্জের একটি কলেজের এক সহকারী অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম সুমন বলেন- দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখতে ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিজ জেলায় পদায়ন না দেয়া এবং ৩ বছর পরপর বদলির বিধান আছে। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারে একজন কোনো কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে অবসরে চলে যাচ্ছেন। এ কারণে কর্মস্থলে বিশৃঙ্খল, অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব, প্রতিপত্তি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, কোচিং বাণিজ্য, অনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অস্বচ্ছতা দিন দিন বাড়ছে। অনেক কলেজে স্থানীয় ও অন্য অঞ্চলের শিক্ষক নির্বিশেষে দ্বন্দ্ব এতই প্রকট যে তা শিক্ষা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন