স্বামী-সন্তানের মৃত্যুর খবর জানেন না অ্যানি

‘ভাইরে, ভাবি-ভাতিজিকে বাঁচাতে পারলাম না’

  শিপন হাবীব ১৭ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

‘ভাইরে সব শেষ, ভাবি আর ভাতিজিকে বাঁচাতে পারিনি। বাঁচার জন্য তারা আমার চোখের সামনে ছটফট করছিল। কিছুই করতে পারলাম না। মুহূর্তেই পুরো বিমানটি কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। কাউকেই দেখা যাচ্ছিল না। শুধুই চিৎকার- বাঁচাও বাঁচাও শব্দ। শরীর পুড়ে যাচ্ছিল। আমাকে যখন নিচে নামিয়ে আনা হল তখনও ছুটে গিয়েছিলাম বিমানের পাশে। তোরা আমায় মাফ করে দে।’ কথাগুলো নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় আহত মাহমুদুল হাসান মেহেদীর। শুক্রবার বিমান দুর্ঘটনায় আহত যে তিনজন বাংলাদেশিকে নেপাল থেকে ফিরিয়ে এনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয় তাদের একজন মেহেদী। নেপালে পাঁচ দিনের চিকিৎসা শেষে মেহেদীর সঙ্গে আরও যে দু’জনকে দেশে আনা হয়েছে তারা হলেন- আনমুন নাহার অ্যানি ও কামরুন্নাহার স্বর্ণা। তাদেরও ভর্তি করা হয়েছে ঢাকা মেডিকেলে।

ইউএস-বাংলার বিমানে মেহেদীর সঙ্গে নেপাল যাচ্ছিলেন তার ফুফাতো ভাই ফারুক আহমেদ প্রিয়ক ও তার স্ত্রী আনমুন নাহার অ্যানি এবং তাদের আড়াই বছরের শিশুসন্তান তামান্না প্রিয়ম্মী। তারা পাশাপাশি সিটে বসেছিলেন। বিমান দুর্ঘটনায় ফারুক আহমেদ প্রিয়ক ও তার শিশুসন্তান তামান্না মারা যান। স্বামী ও সন্তানের মৃত্যুর খবর এখনও জানানো হয়নি বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অ্যানিকে। বার্ন ইউনিটের ৬ তলার ভিআইপি কেবিনে যখন মাহমুদুল হাসান বিলাপ করছিলেন তখন তার পাশের শয্যায় শুইয়ে কাঁদছিলেন তার স্ত্রী কামরুন্নাহার স্বর্ণা। খবর পেয়ে তাদের স্বজনরাও হাসপাতালে ছুটে আসেন। এ সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিমান দুর্ঘটনায় বেঁচে গেলেও তারা এখনও ভীতসন্ত্রস্ত। মাঝে মধ্যেই তারা আঁতকে উঠছেন। অ্যানির মাথার পাশে বসে শিশুর মতো কাঁদছিলেন তার বাবা সালাহ উদ্দিন। চিকিৎসকদের সান্ত্বনায়ও কাজ হচ্ছিল না।

অ্যানির এক স্বজন জানান, কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ থেকে বের হওয়ার সময়ও অ্যানি জানতে চেয়েছিল তার স্বামী ও সন্তান কোথায়। ওকে বলা হয়েছে, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদেরকে সিঙ্গাপুর নেয়া হয়েছে। প্রিয়কের বন্ধু খবর পেয়েই ছুটে গিয়েছিল নেপালে। গাজীপুরের একই এলাকায় তাদের বাড়ি।

বিকালে নেপাল থেকে আসা আহত তিন রোগী সম্পর্কে ব্রিফ করেন বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেন, তিনজনই শঙ্কামুক্ত। তবে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত রয়েছে। অ্যানির শ্বাসনালিতে সমস্যা আছে, কিছুটা পুড়ে গেছে। তার শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া অ্যানি তার স্বামী ও সন্তানকে না পেয়ে ব্যাকুল হয়ে আছে। আমরা চেষ্টা করছি চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সাপোর্ট দেয়ার। তিনি বলেন, আগের দিন নেপাল থেকে আসা আহত শাহরীন আহমেদও ভালো আছেন। তারা পাশাপাশি বেডেই ভর্তি। ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, নতুন আসা এ তিন রোগী ট্রমার মধ্যে আছেন। ট্রমা কাটাতে সময় লাগবে। চোখের সামনে স্বজনদের মর্মান্তিক মৃত্যু দেখার দৃশ্য ভুলতে পারছেন না। তাদের দ্রুত সুস্থ করার চেষ্টা করছি। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ রয়েছে, আহত রোগীদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেয়ার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে রোগীদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। তাদের সেরে উঠতে ৫-৬ সপ্তাহ লাগতে পারে।

ইউএস-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রফেসর মেজর (অব.) একেএম মাহবুবুল হক যুগান্তরকে জানান, অ্যানি, স্বর্ণা ও মেহেদীকে প্রথমে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করার কথা ছিল। কিন্তু শুক্রবার জুমার নামাজের পর সিদ্ধান্ত বদল করা হয়। পরে বিমানবন্দর থেকে তাদের সরাসরি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসা হয়। তিনি বলেন, যেখানেই তাদের চিকিৎসা দেয়া হোক সব ব্যয় বহন করবে ইউএস-বাংলা। আহতদের যদি বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা দরকার হয় তাতেও রাজি আমরা।

অ্যানি হাসপাতালে থাকতে চাচ্ছেন না। বলছিলেন, ‘আমি এখানে কেন। আমাকে বাড়িতে নিয়ে যাও। নেপাল থেকে তো আমার বাড়ি যাওয়ার কথা। বারবার তিনি তার স্বামী-সন্তানের খোঁজ করছিলেন। কথা বলার সময় অ্যানি বারবার হাঁপিয়ে উঠছিলেন। ডা. সামন্ত লাল সেন অ্যানিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছিলেন, আপনার শরীর খারাপ, কাঁদবেন না, কাঁদলে সমস্যা হবে। জবাবে অ্যানি তার স্বামী-সন্তানকে এনে দেয়ার কথা বলছিলেন।

শুক্রবার বিকাল ৪টা ৩৫ মিনিটের নেপাল থেকে তিন রোগীকে বার্ন ইউনিটে আনা হয়। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে আহতদের দেখতে বার্ন ইউনিটে যান সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। তিনি আহত ও তাদের স্বজনদের সান্ত্বনা দেন। এর আগে বার্ন ইউনিটে শাহরীন আহমেদকে দেখতে যান সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

ঘটনাপ্রবাহ : নেপালে ইউএস বাংলা বিধ্বস্ত

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter