রাজধানীতে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত নিরাপত্তা, হতদরিদ্রদের পাশে ডিএমপি

  মোয়াজ্জেম হোসেন নাননু ও মাহমুদুল হাসান নয়ন ৩০ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কাকরাইলে রমনা মডেল থানার সামনে রোববার গরিব-দুস্থদের মাঝে ডিএমপির খাবার বিতরণ। ছবি: যুগান্তর

করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনায় থমকে গেছে নগরজীবন। রাজধানীতে চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত নিরাপত্তা। ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে নেই জনসমাগম।

বাস ও ট্রাক টার্মিনাল, লেগুনা স্ট্যান্ডগুলোতে নেই চিরচেনা ভিড়। গাড়ির শব্দ কিংবা পরিবহন শ্রমিকদের তোড়জোড়ও নেই। এর বিপরীতে বিভিন্ন স্ট্যান্ডে দেখা গেছে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির সারি। রাজধানীতে সুনসান নীরবতা। ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান ছাড়া সরকারি-বেসরকারি অফিসসহ সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঢাকার রাজপথ যেন বিরাণভূমি। জনশূন্য রাতের ঢাকা পরিণত হয়েছে ভুতুড়ে নগরীতে।

শুক্রবার রাত, শনিবার ও রোববার দিনভর রাজধানীতে ঘুরে দেখা গেছে এসব চিত্র। তবে রাজধানীর পাড়া-মহল্লায় কিছু খেটে খাওয়া মানুষের দেখা মিললেও তাদের চোখে-মুখে আতঙ্ক। এদের অনেকেই পেটের তাগিদে রিকশা কিংবা ভ্যান নিয়ে বের হয়েছেন। তবে যাত্রী না পাওয়ায় সংসার কিভাবে চলবে সেই চিন্তায় তারা দিশেহারা।

এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভয় রয়েছেই। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। এরপর থেকে রাজধানীসহ গোটা দেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৫ জন। রোববার পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৪৮ জন। এদিকে রাজধানীর গরিব ও ছিন্নমূল মানুষের দ্বারে দ্বারে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে পুলিশ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উদ্যোগে রাজধানীর ৫০টি থানা থেকে এ খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।


খাবার জোগাড়ের চিন্তায় নিম্ন আয়ের মানুষ : সরেজমিন পরিদর্শনের সময় হতদরিদ্র বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। করোনাভাইরাসের ভয়ের চেয়ে তাদের মধ্যে সংসার টিকিয়ে রাখার চিন্তা বেশি কাজ করছে। তারা শুধুই জানেন, ‘টাকা রোজগার করতে না পারলে পরিবারের সদস্যরা না খেয়ে থাকবে।’ কথা হল রিকশাচালক শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। বয়স তার পঞ্চাশের কিছু বেশি হবে।

শনিবার দুপুর ১টার দিকে ফার্মগেট তেজতুরী বাজার বিজ্ঞান কলেজের সামনে রিকশার ওপর বসে ছিলেন তিনি। তেজগাঁও রেললাইন সংলগ্ন বস্তিতে তিনি দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন। চোখ-মুখে বিষণ্নতার ছাপ। কথা বলে জানা গেল, সকাল ৯টায় গ্যারেজ থেকে রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন তিনি। দুপুর ১টা পর্যন্ত আয় হয়েছে মাত্র ৬০ টাকা। অথচ এক বেলার জন্য (৯টা-৫টা) গ্যারেজ মালিককেই ভাড়া দিতে হবে দেড়শ’ টাকা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে শরিফুল জানান, পরিবারের সদস্যদের খাওয়ার ব্যবস্থা তো দূরে থাক মহাজনের টাকাই এখন পর্যন্ত জোগাড় করতে পারেননি।

ফার্মগেট ওভারব্রিজের নিচে দোকান খুলে বসেছেন পরিতোষ। পেশায় তিনি মুচি। পরিতোষ জানান, সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মাত্র ৪০ টাকার কাজ করেছেন। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেটে সুনসান নীরবতা। নেই হকারের হাঁকডাক। ওভারব্রিজের নিচে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন কয়েকজন। আশপাশের দোকানপাট ও মার্কেট বন্ধ। এরই মধ্যে দুপুর ১টা ২০ মিনিটের দিকে সাইরেন বাজিয়ে র‌্যাবের একটি গাড়িবহর এসে থামে ফার্মভিউ সুপার মার্কেটের সামনে। র‌্যাব সদস্যরা গাড়ি থেকে নামার আগ মুহূর্তেই ফাঁকা হয়ে যায় পুরো এলাকা।


ডিএমপির খাবার বিতরণ : এদিকে রাজধানীতে দরিদ্রদের দ্বারে দ্বারে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে পুলিশ। প্রতিদিন শহরের আড়াই হাজার ছিন্নমূল মানুষ পুলিশের এ উদ্যোগের সুবিধা ভোগ করছেন। এর বাইরে ডিএমপির বিভিন্ন বিভাগ ও থানা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় খাবার বিতরণ করছে। রোববার থেকে শুরু হওয়া এ কার্যক্রম চলবে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত। ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন দুপুরে ছিন্নমূল শিশু ও দুস্থ নাগরিকদের কাছে প্যাকেটে করে খাবার পৌঁছে দেয়া হবে। ৪ এপ্রিল পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে।

ডিএমপি জানায়, ঢাকার দুটি স্থান থেকে আড়াই হাজার প্যাকেট খাবার রান্না হচ্ছে। এর মধ্যে অর্ধেক রান্না হচ্ছে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। বাকি অর্ধেক রান্না হচ্ছে মিরপুরের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে (পিওএম)। প্লাস্টিকের বক্সে ভরা খাবার মেনুতে রয়েছে ডিম-খিচুড়ি ও পানির বোতল। সঙ্গে প্রত্যেককে দেয়া হচ্ছে একটি মাস্ক।

থানা হিসাব করে প্রত্যেকটি বিভাগে খাবার পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোস্তাক আহম্মেদ যুগান্তরকে বলেন, আমাদের বিভাগের সাতটি থানার জন্য ৩৫০ প্যাকেট খাবার এসেছে। দুপুরের মধ্যেই সেগুলো বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি অনেকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় খাবার বিতরণ করছেন। লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, খাবারের প্রচুর চাহিদা রয়েছে।

ডিএমপি থেকে আমাদের ৬টি থানার প্রত্যেকটিতে ৫০ প্যাকেট করে দেয়া হয়েছে। এগুলোর তদারকিতে ছিলেন নিজ নিজ এলাকার সহকারী কমিশনাররা। পাশাপাশি অনেকে ব্যক্তিগতভাবেও সহযোগিতা করছেন। স্থানীয় সাংসদ ও কাউন্সিলরাও সহযোগিতা করছেন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, আমরা খাবার বিতরণের ক্ষেত্রেও সামাজিক দূরুত্বের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করছি।

সেজন্য গিয়ে গিয়ে খাবার দিয়ে আসা হচ্ছে। পাশাপাশি যেসব সংগঠন ও ব্যক্তি সহযোগিতা করছেন তাদেরও এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ডিএমপির উদ্যোগের বাইরে পুলিশ সদস্যদের নিজস্ব উদ্যোগেও চলছে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা। মতিঝিল জোনের সহকারী কমিশনার জাহিদুল ইসলাম বলেন, রাস্তাঘাটে ছিন্নমূল অনেক মানুষ রয়েছেন। মূলত আমরা তাদেরকেই সহযোগিতা করছি।

রিকশাওয়ালা ও খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যেও খাবার পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, ডিএমপি থেকে পঞ্চাশ প্যাকেট পেয়েছি। যেগুলো দুপুরেই বিতরণ করা হয়েছে। রাতে শাহবাগ থানার উদ্যোগে আরও ২৫০ প্যাকেট খাবার বিতরণ করা হবে।


থমকে গেছে নগরজীবন : রাজধানীর পান্থপথ, কারওয়ানবাজার, মগবাজার, ফার্মগেট, পশ্চিম তেজতুরী বাজার, তেজকুনিপাড়া, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মানুষের আনাগোনা একদম কম। বাজার, পাড়া-মহল্লার দোকানপাট বন্ধ। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের অনেকেই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে গ্রামে চলে গেছেন। আর যারা আছেন বেচা-বিক্রি কম হওয়ায় তারাও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে নিজেরা সুরক্ষিত থাকার চেষ্টা করছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে রাতে রাজধানীর চিত্র আরও ভয়াবহ। যতদূর চোখ যায়, জনশূন্য সড়ক। যেন ভুতুড়ে নগরী।

এর মাঝেই রাস্তায় বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেকপোস্ট। সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জীবাণুনাশক ছিটাচ্ছেন সিটি কর্পোরেশনের কর্মচারীরা। পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে তৎপর রয়েছে সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের সদস্যরা।

বৃত্ত এঁকে নির্দিষ্ট দূরত্বে থেকে কেনাকাটা ও নিত্যপণ্যের বাজার সহনীয় রাখতে টহল দিচ্ছেন তারা। হোম কোয়ারেন্টিন মানতেও বাধ্য করা হচ্ছে। টহল গাড়ির পাশাপাশি হেঁটেও দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ।


হোটেল-রেস্তোরাঁয় নির্দেশনা শিথিল : খাবার হোটেল কিংবা রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে নির্দেশনা কিছুটা শিথিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা। তারা বলছেন, খাবার হোটেল খোলা রাখা যাবে। তবে ভেতরে খাবার পরিবেশন করা যাবে না। ক্রেতারা শুধু পার্সেল নিতে পারবেন। হাতিরঝিলে টহলে থাকা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার এসআই মো. মুস্তাফিজ যুগান্তরকে বলেন, কিছু মানুষ নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে রাস্তায় অহেতুক ঘোরাঘুরি করছেন।

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত