নারায়ণগঞ্জের ‘কলঙ্ক’ লিংক রোডের ময়লার ভাগাড়

‘ময়লার গন্ধেই মারা যাব’

  রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ ১৩ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘এ রোজার মধ্যে এমন কষ্ট খোদা সহ্য করত না। করোনায় আর কি মরমু? ময়লার গন্ধের কারণে প্রতিদিনই মরতাছি। এই দেশে এমপি-মন্ত্রী আর মেয়ররা গরিবের লেইগ্যা নাইরে ভাই’- এমন ভাবেই ক্ষোভ আর কষ্টের কথা প্রকাশ করেন ষাটোর্ধ্ব দিনমজুর আবুল হোসেন। প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বেশ ক্ষেপেই যান চায়ের দোকানি মজিদ কাঙালি। তিনি বলেন, ‘ধুর, যান তো ভাই। কত্ত সাংবাদিক আইল গেল, নিউজ করল। কিছুই তো হইল না। আপনেরা আমাগো আবর্জনা মনে করেন বইলাই আহেন তামশা করতে। এখন যান-যান।’ প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে রাস্তার দু’পাশে গড়ে উঠা পুতিগন্ধময় ভাগারের কারণে দুর্বিষহ জীবনযাপন করা মানুষদের এমন মন্তব্য এবং ভাগ্যকে দোষ দেয়া ছাড়া যেন আর কিছু করার নেই। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু খানসাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের পাশের চিত্র এটি। এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আট বছর ধরে ময়লা ফেলা হচ্ছে। শুধু ওই এলাকা নয়, কয়েক লাখ নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য লিংক রোডের এক কিলোমিটার যেন নরক সমতুল্য। কেউ কেউ বলেন, ময়লার ভাগারটি নারায়ণগঞ্জের কলঙ্ক। সিটি কর্পোরেশন এলাকা থেকে ময়লা আনা হলেও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করছেন।

সরেজমিন ক্রিকেট স্টেডিয়ামের একটু সামনে দেখা গেছে, প্রায় ১ কিলোমিটারজুড়ে রাস্তার দুই পাশে কয়েকশ’ টন ময়লা ফেলে ভাগার সৃষ্টি করা হয়েছে। সেখানে আস্ত মরা গরু ফেলে রাখা হয়েছে। কুকুরের দল মরা গরু খাবলে খাচ্ছে। মুখে মাস্ক ও রুমাল দিয়েও মানুষের প্রাণ যায়যায় অবস্থা। স্টেডিয়ামের সামনে বেশ কয়েকজন পথচারীকে জিজ্ঞাসা করতেই তারা বলেন, ‘আমরা দম বন্ধ করে কোনোমতে এ রাস্তায় চলি’। ময়লার ভাড়ারের পাশেই কয়েকটি চায়ের দোকান, রিকশা-গ্যারেজসহ নানা রকমের দোকানপাট। সেখানে যেতে এলাকাবাসীরা জানান, আট বছর ধরে এনায়েতনগর ইউনিয়ন ও সিটি কর্পোরেশনের জায়গায় শহরের সব ময়লা এনে ফেলা হচ্ছে। সিদ্ধিরগঞ্জের কয়েকটি ওয়ার্ডের ময়লাও এখানে ফেলা গয়। ৪/৫ বছর আগে এলাকাবাসীর বাধার মুখে ময়লা ফেলা বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু আবার ফেলা হচ্ছে। ভ্যানগাড়িতে করে ময়লা বহনকারীদের জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন, এগুলো শহরের ময়লা। এছাড়া বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। লাখ লাখ ময়লার পোকা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। ময়লার ভাগারে আবর্জনা ফেলতে আসা যুবক ইমন জানায়, আমরা প্রতিদিন শহরের ময়লা এখানে ফেলি। কে বা কার নির্দেশে ফেলা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভ্যানের মালিক মাসে ১০ হাজার টাকা বেতন দেন, এর চেয়ে বেশি কিছু জানি না।

জানা গেছে, স্থানীয় কয়েকটি এনজিও ও ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠানের তরফ থেকে এসব ময়লা এখানে ফেলা হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে এসব এনজিওর চুক্তি রয়েছে বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে সেখানে গড়ে উঠা নাসিম ওসমান মেমোরিয়াল পার্কের স্বত্বাধিকারী ও মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক শাহ নিজাম বলেন, সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে কিছু আছে বলে মনে হয় না। কয়েক বছর আগে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট চলাকালে এখানে ময়লার ভাগার ঢাকতে সিটি কর্পোরেশন লাল সবুজের পতাকাসদৃশ কাপড় ব্যবহার করেছিল, যা নিয়ে চরম সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছিল।

শাহ নিজাম আরও জানান, নারায়ণগঞ্জবাসীর বাধার মুখে ময়লা ফেলা বন্ধ হয়েছিল এবং স্থানীয় এমপি শামীম ওসমানের সহযোগিতায় ময়লার ভাগারের পরিবর্তে কয়েক বছরের চেষ্টায় সেখানে ফুলের বাগান ও পার্ক করেছি। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন ময়লা ফেলছেই।

এ ব্যাপারে স্থানীয় এমপি শামীম ওসমান বলেন, দায়িত্বটা আসলে সিটি কর্পোরেশনের। এখানে জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আমার কিছুই বলার নেই। তবে লিংক রোডে ময়লা ফেলার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা আলমগীর হিরন। গণমাধ্যমকে তিনি জানান, আমরা লিংক রোডে কোনো ময়লা ফেলি না। নাসিকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ কোনো এনজিও সেখানে ময়লা ফেললে তা বাতিল হয়ে যাবে। আমাদের শহর এলাকার ময়লা ফেলার জন্য ১৮নং ওয়ার্ডে নির্দিষ্ট জায়গা আছে। হিরন দাবি করেন, বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আনা ময়লা লিংক রোডে ফেলা হচ্ছে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত