গোদাগাড়ীতে নারীকে নির্যাতন

এসপির নির্দেশের পরও মামলা নেয়নি ওসি

  রাজশাহী ব্যুরো ১৫ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ মিনা খাতুন (৩৩) রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানায় মামলা করতে গেলেও ওসি খাইরুল ইসলাম তা নেননি। তাই ন্যায়বিচারের আশায় ছুটে যান রাজশাহীর এসপির কাছে। মিনার সারা শরীরে নির্যাতনের ক্ষত-চিহ্ন দেখে এসপি তাৎক্ষণিকভাবে মামলা রেকর্ডের নির্দেশ দেন গোদাগাড়ী থানার ওসিকে। কিন্তু ওসি খাইরুল মামলা রেকর্ডের বদলে ওই নারীকে তুলে দেন নির্যাতনকারীর সহযোগীদের হাতে। ভয়ভীতি দেখিয়ে মিনাকে থানা থেকে একরকম জোর করে তুলে নিয়ে যান গোদাগাড়ীর পৌর মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মনিরুল ইসলাম বাবু ও তার চার কাউন্সিলর।

৮ মে পৌরসভায় বসে সালিশ করেন মেয়র বাবু ও তার সহযোগীরা। সালিশে নির্যাতনকারী ২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোফাজ্জল হোসেন মোফাকে ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে ৪৫ হাজার টাকা মিনাকে দিয়ে বাকি টাকা আর দেয়া হয়নি। নির্যাতিত দুই সন্তানের জননী মিনার আহাজারি এখনও থামেনি। মিনা বলেন, আমি টাকা চাই না, নির্যাতনের বিচার চাই। আবার পুলিশের কাছে গেলে দুই সন্তানসহ প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে চলেছে মোফা। আতঙ্কে মিনা খাতুন দুই সন্তানকে নিয়ে ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। ৩ মে দুপুরের পর গোদাগাড়ীর মহিষালবাড়ী মহল্লার শহিদুল ইসলাম ভোদলের স্ত্রী মিনা খাতুনের সঙ্গে তার শাশুড়ি ডলি বেগমের কথা কাটাকাটি হয়। মোবাইল ফোনে মিনা খাতুন বলেন, শাশুড়ি ডলি বেগম বিচার দিতে ছুটে যান ২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোফাজ্জল হোসেন মোফার কাছে। মোফা, তার ছেলে রবিউল ইসলাম রবি ও মেয়ে জান্নাতকে সঙ্গে নিয়ে মিনার বাড়িতে আসেন। মোফা, মিনাকে টেনেহিঁচড়ে চুলের মুঠি ধরে ঘর থেকে বের করে বাড়ির আঙ্গিনায় ফেলে লাঠি ও লোহার রড দিয়ে নির্দয়ভাবে পেটাতে থাকেন। রবি ও জান্নাতও মিনাকে লাথি-কিল চড়-ঘুষি মারতে থাকেন। পাড়াপ্রতিবেশীরা ভিড় করলেও প্রভাবশালী হওয়ায় মোফার বিরুদ্ধে কেউ টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেনি। প্রায় আধা ঘণ্টার নির্যাতনে মিনা অচেতন হয়ে পড়ে। মোফা ঘটনাস্থল ত্যাগ করলে কয়েকজন প্রতিবেশী মিনাকে উদ্ধার করে গোদাগাড়ী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসায় সন্ধ্যার পর মিনার জ্ঞান ফেরে।

মিনা ও তার কয়েকজন প্রতিবেশী জানান, কিছুটা সুস্থ হয়ে পরদিন ৪ মে সন্ধ্যার পর মিনা নির্যাতনকারী মোফা ও তার ছেলে-মেয়ের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ নিয়ে গোদাগাড়ী থানায় যান। কিন্তু ওসি খাইরুল ইসলাম, তার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় মোফার বিরুদ্ধে মামলা না নিয়ে ফিরিয়ে দেন। অভিযোগটি ওসি নিজের কাছে রেখে দেন।

এ ঘটনার পর রাজশাহীর দুইজন সাংবাদিকের সহায়তায় মিনা রাজশাহীর এসপির কাছে যান। রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শহীদুল্লাহ গোদাগাড়ী থানার ওসিকে দ্রুত মামলা রেকর্ড করে আসামিদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন।

মিনার অভিযোগ, এসপির কাছ থেকে ফিরে ৭ মে মিনা আবার অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে মোফার পক্ষে সেখানে হাজির হন গোদাগাড়ী পৌর মেয়র মনিরুল ইসলাম বাবু, ওয়ার্ড কাউন্সিলর বিপ্লব, তোফাজ্জল ও আকমল। তারা সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করবেন বলে ওসিকে জানান। মেয়র ও কাউন্সিলররা ওসির সামনেই তাকে বলেন, মোফা হচ্ছে পুলিশের ঘনিষ্ঠ লোক। তার বিরুদ্ধে মামলা করলে তুমি মহল্লায় থাকতে পারবে না। বরং আপোস করে নাও। তোমাকে চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা নিয়ে দেব। মিনা খাতুন আরও বলেন, তারা হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে আমাকে থানা থেকে বের করে আনে। আমি মামলা করব না এবং স্বেচ্ছায় থানা থেকে অভিযোগ তুলে নিয়ে যাচ্ছি-এই মর্মে জোর করে আমার জবানবন্দি ভিডিও করেন ওসি নিজের মোবাইল ফোনে।

জানা গেছে, ৮ মে পৌর কার্যালয়ে মেয়র বাবু, চার কাউন্সিলর, মোফা, স্থানীয় দুই সাংবাদিকসহ ৮ জন মিলে সালিশ করেন। সেখানে মোফাকে ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে ৪৫ হাজার টাকা মিনাকে দেয়া হয়। বাকি টাকা সালিশকারীদের মধ্যে ভাগ বণ্টন হয়।

গোদাগাড়ী পৌর মেয়র মনিরুল ইসলাম বাবু যুগান্তরকে বলেন, মেয়েটির ওপর গুরুতর নির্যাতন হয়েছে। সবার অনুরোধে আমি আপোসরফা করেছি। কিন্তু পরে বুঝতে পেরেছি কাজটা করা আমাদের ঠিক হয়নি। জরিমানার সব টাকা মোফা দেয়নি।

গোদাগাড়ী থানার ওসি খাইরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, পৌর মেয়র ও কয়েকজন কাউন্সিলর মিনাকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেবে বলে থানা থেকে নিয়ে যায়। মেয়েটিও মামলা করবে না বলে জানায়। মিনার ওপর হওয়া নির্যাতন গুরুতরই বলতে হবে। মোফার প্রতি পুলিশের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি বলেন, চাইলে এখনও মামলা করতে পারে। অভিযোগ পেলে আমি মামলা রেকর্ড করব।

অভিযুক্ত মোফা বলেন, মেয়েটি রোডে পড়ে গিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থান কেটে গেছে। আমি নির্যাতন করিনি। ‘তাহলে সালিশে ৯০ হাজার টাকা জরিমানা কেন দিলেন’- এ প্রশ্নের জবাবে মোফা বলেন, আমি এখন এসব বিষয়ে কথা বলব না।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত