রাজধানীতে করোনার মাঝে ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়ছে

নির্মাণাধীন ৮০ শতাংশ ভবনে এডিসের বিস্তার

১৫ মে পর্যন্ত সারা দেশে আক্রান্ত ৩০১ জন, গত বছর এ সংখ্যা ছিল তার অর্ধেক

  মতিন আব্দুল্লাহ ১৬ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর ৮০ শতাংশ নির্মাণাধীন ভবনে এডিস মশার বংশবিস্তার ঘটছে। এ তথ্য উঠে এসেছে এক কীটতত্ত্ববিদের জরিপে।

এতে বলা হয়েছে, এ অবস্থায় নির্মাণাধীন ভবনে এডিসের প্রজনন ধ্বংসে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে ডেঙ্গু ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, করোনা মহামারীর মধ্যে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিদিনই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এক-দু’জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছেন। বর্তমানে ২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে বর্তমানে নির্মাণাধীন ভবন রয়েছে প্রায় ৪ হাজার। কীটতত্ত্ববিদের জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৩ হাজার ২০০ ভবনে এডিসের প্রজনন হচ্ছে।

করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে প্রায় তিন মাস ধরে এসব ভবনের নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এসব ভবন পরিষ্কার রাখতে বলা হলেও এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বা দায়িত্বপ্রাপ্তরা এ বিষয়ে এখনই সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে করোনা এবং ডেঙ্গু নিয়ে খুবই জটিল অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করেছেন কীটতত্ত্ববিদরা।

এ প্রসঙ্গে কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার যুগান্তরকে বলেন, ‘সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার নির্মাণাধীন ভবনের ছাদের পানি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ ভবনের জমে থাকা পানিতে এডিসের লার্ভা রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘করোনা প্রাদুর্ভাবের পর থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমে গেছে। এর কারণ হচ্ছে, সাধারণ জ্বরে আক্রান্তদেরও হাসপাতালে ভর্তি নিচ্ছে না। তাছাড়া জ্বর হলেই করোনা হয়েছে, সামাজিক হেনস্তার ভয়েও অনেকে এ ব্যাপারে মুখ খুলছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুরান ঢাকার আজগর আলী হাসপাতালে বৃহস্পতিবার একজন রোগী ?পাওয়া গেছে। তিনি একই সঙ্গে করোনা এবং ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে পরিস্থিতি খুবই জটিল হয়ে যাবে।’

এ বিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর চারটি শ্রেণি রয়েছে। গতবার যে শ্রেণিরটা হয়েছে, এবার সেটা নাও হতে পারে। গতবারেরটা হলে আক্রান্তের সংখ্যা কম হবে, আর নতুন শ্রেণিরটা হলে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হবে।’ তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাসের সঙ্গে ডেঙ্গু ভয়াবহরূপ ধারণ করলে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়তে পারে। বর্তমান স্বাস্থ্য কাঠামোয় এসব রোগীকে সেবা দেয়া কঠিন হবে। এজন্য এডিসের প্রজনন স্থান ধ্বংস করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতে হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. শাহনীলা ফেরদৌস যুগান্তরকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে ৬৪ জেলা হাসপাতালে ৫৪ হাজার ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট পৌঁছে দেয়া হয়েছে। আমরা ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি।’

তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর বর্ষার মৌসুমের আগে, বর্ষার মৌসুমে এবং পরে ডেঙ্গুর প্রজনন স্থান জরিপ করে থাকি। এবার বর্ষার আগে জরিপ কাজ আমরা শেষ করেছি। জরিপে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেছে গত বছরের চেয়ে কম। তবে এখন থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় এডিসের প্রজননের ঝুঁকি বাড়ছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির মধ্য ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে সেবা দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এজন্য এডিসের প্রজনন নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেককে অনুরোধ জানাব লম্বা জামা পরতে এবং ঘুমানোর সময় মশারি টানিয়ে ঘুমাতে। তাহলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এ বছর গত বছরের চেয়ে সারা দেশেই এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা অনেকাংশে বেশি। চলতি বছরের ১৫ মে পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৩০১ জন। আর গত বছর এ সংখ্যা ছিল এর অর্ধেক।

সংশ্লিষ্টদের মতে, করোনাভাইরাসের কারণে ২৬ মার্চ থেকে টানা বন্ধের কারণে নির্মাণাধীন ভবন, মেগা প্রকল্পের কাজও বন্ধ রয়েছে। এছাড়া সরকারি অফিস, বাস টার্মিনাল, পার্ক-উদ্যানের পরিত্যক্ত পাত্র থেকেও এডিস মশা বংশ বিস্তার ঘটতে পারে। যে সময় থেকে এডিস মশা প্রতিরোধে কার্যক্রম পরিচালনা করা দরকার ছিল, সে সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। এ কারণে ইতোমধ্যেই ডেঙ্গুর বংশ বিস্তার বাড়তে শুরু করেছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শরীফ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা করোনাভাইরাসের এ কঠিন সময়েও মশক নিধন বা এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। এ কাজে আমরা প্রত্যেক নগরবাসীর আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।’

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মোমিনুর রহমান মামুন যুগান্তরকে বলেন, ‘এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছি। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যেও আমরা মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। তবে এ কাজে নগরবাসীকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান মো. সাঈদ নূর আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি অপসারণ করতে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছি। এছাড়া আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট আলমগীর শামসুল আলামিন যুগান্তরকে বলেন, ‘নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে সংশ্লিষ্ট ভবন মালিকদের অনুরোধ করা হয়েছে। আমরা সেসব মনিটরিং করছি। বাস্তবতা হচ্ছে, শ্রমিক সংকটের কারণে এসব কাজ তারা সঠিকভাবে করতে সক্ষম হচ্ছে না।’

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত