করোনায় উধাও সঞ্চয়পত্রের ক্রেতা

বিক্রির লক্ষ্য থেকে কাটছাঁট ১৫ হাজার কোটি টাকা

সংশোধিত লক্ষ্য ১১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা * অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বিক্রি ৭ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা

  মিজান চৌধুরী ১৭ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার প্রাদুর্ভাবে চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করেছে সরকার। অর্থ বিভাগ শুরুতে ২৭ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্য নির্ধারণ করে।

কিন্তু সংশোধিত বাজেটে তা ১১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। বিগত বছরগুলোতে সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও এ বছর উল্টো চিত্র এ খাতে। এর কারণ লকডাউনে মানুষের আয় কমেছে। এখন আর সঞ্চয়মুখী হচ্ছে না কেউ। পাশাপাশি সরকারও এ খাত থেকে ঋণ কম নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যে কারণে বছরের শেষ দিকে বেচা-বিক্রির লক্ষ্য প্রায় ৫৬ শতাংশ কমানো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএস’র সাবেক ডিজি এমকে মুজেরী যুগান্তরকে বলেন, করোনার কারণে মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। কারণ মধ্যবিত্ত অনেক পরিবারের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে কোনো মানুষ সঞ্চয়মুখী হচ্ছে না। সরকার বিক্রি করতে চাইলেও আগামী জুন পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র বিক্রি হবে না। এ কারণে সরকার এখন এ খাত থেকে বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘লকডাউন’ ঘোষণার পর ব্যাংকে নগদ টাকা উত্তোলন ও জমা দেয়া ছাড়া অন্যসব কার্যক্রম খুব বেশি হচ্ছে না। আর সঞ্চয়পত্র বিভাগে সঞ্চয়পত্র কেনার মতো লোকসমাগমও হচ্ছে না। কারণ মানুষ এই মুহূর্তে সঞ্চয়মুখী নয়। যদিও তফসিলি ব্যাংকের শাখায় সাধারণ ছুটির মধ্যে সঞ্চয়পত্র কেনা, ভাঙানোসহ সব ধরনের সেবা পাওয়া যাবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনছে না।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ দুটি উৎস থেকে সরকার ঋণ করে থাকে। এর একটি হচ্ছে সঞ্চপত্র। সাধারণ মানুষের কাছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে এই টাকায় সরকার তার প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটায়। অপরটি হচ্ছে ব্যাংকিং খাত। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে সরকার। সঞ্চয়পত্র অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, অর্থবছরের প্রথম সাত মাস (জুলাই-জানুয়ারি) নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৭ হাজার ৬৭৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা- যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৫ শতাংশ কম।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাওয়ার বিষয়ে জানা গেছে, করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে ২৬ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছে লকডাউন। এর আগে ৮ ডিসেম্বর প্রথম করোনা শনাক্ত হয় দেশে। এরপর মানুষের ভেতর এ নিয়ে আতঙ্ক শুরু হয়। লকডাউন অবস্থায় আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে পড়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর। চাকরিজীবীরা অনিশ্চয়তায় পড়ে যান।

মানুষের কাছে অলস অর্থ পড়ে থাকলেও সেটি ব্যাংক থেকে উত্তোলন বন্ধ রাখে। অনেকে আবার তা ভেঙে খাওয়া শুরু করে। এ সময় পেনশনভোগীরা বের হতে পারেনি। ব্যাংকে ছিল সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ। সবমিলিয়ে মার্চ থেকে শুরু হয় সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ধস। সাধারণ মধ্যবিত্ত যারা আগে সঞ্চয়পত্র কেনার পরিকল্পনা করেছিলেন এমন পরিস্থিতিতে তারাও সিদ্ধান্ত বদল করেন। ফলে বিক্রির চিত্রে হতাশাজনক অবস্থা ফুটে উঠে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, করোনার কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হ্রাস পাওয়ার আরও একটি উদাহরণ হচ্ছে ব্যাংক খাতে সুদের হার এখন সঞ্চয়পত্র থেকে কম। পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার (সুদ) হারও ভালো। মেয়াদ শেষে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। আর পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এই হিসেবে এখন ব্যাংক থেকে তারল্য সঞ্চয়পত্রমুখী হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন চিত্র।

জানা গেছে, গত অর্থবছর (২০১৮-১৯) প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ছিল ৩০ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা। এ সময় চাহিদা এতটাই বেশি ছিল যে, সঞ্চয়পত্র থেকে যে পরিমাণ অর্থ নেয়ার লক্ষ্য ছিল তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ঋণ নেয়া হয়। অস্বাভাবিক বিক্রি বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত ওই বছর সংশোধিত বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এরপরও অর্থবছর শেষে নিট বিক্রি দাঁড়ায় ৪৯ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। কিন্তু এ বছর একেবারেই উল্টো চিত্র।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বছরের শুরুতে এবার সঞ্চয়পত্র নিয়ে সরকার একটি ভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। মূলত এ বছর সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার পরিমাণ কমানোর পরিকল্পনার পথে হাঁটে সরকার। এ জন্য নানা ধরনের শর্ত জুড়ে দেয়া হয় সঞ্চয়পত্র কেনার ক্ষেত্রে। বিশেষ করে বর্তমানে পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ নির্ধারণ, এক লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়। এছাড়া সঞ্চয়পত্রের সব লেনদেন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে করতে হচ্ছে ক্রেতাদের।

দুর্নীতি কিংবা অপ্রদর্শিত আয়ে সঞ্চয়পত্র কেনা বন্ধ করতে ক্রেতার তথ্য একটি ডাটাবেসে সংরক্ষণের লক্ষ্যে অভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিক্রি কার্যক্রম শুরু করা হয়। পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রে বড় বিনিয়োগ কঠোর করেছে সরকার।

চাইলেই ভবিষ্যৎ তহবিল বা প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থে সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ নেই। এখন প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ দিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনতে হলে কর কমিশনারের প্রত্যয়ন লাগে। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক ফার্মের নামে সঞ্চয়পত্র কিনতে লাগছে উপকর কমিশনারের প্রত্যয়ন। এসব কড়াকড়ির কারণে গত ডিসেম্বর থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে। এর সঙ্গে অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে করোনাভাইরাসের কারণে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়।

 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত