এমপি-মেয়র গ্রুপ সংঘর্ষ

বাউফলে যুবলীগ কর্মী তাপস নিহত

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো ২৯ মে ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শুরুতেই বিতর্কের মুখে পড়েছে পটুয়াখালীর বাউফলে যুবলীগ কর্মী তাপস চন্দ্র দাস হত্যায় দায়ের হওয়া মামলা। ঈদুল ফিতরের আগের দিন সাবেক চিফ হুইপ সংসদ সদস্য আসম ফিরোজ ও বাউফলের পৌর মেয়র জিয়াউল হক জুয়েলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হয় তাপস। ২৯ বছর বয়সী তাপসের অকালমৃত্যুতে যখন শোকাতুর বাউফল ঠিক সেই মুহূর্তে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা জন্ম দিয়েছে বিতর্কের। মামলার আসামি আর সাক্ষীরা সবাই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। আসামিরা যেমন জুয়েলের সমর্থক, তেমনি সাক্ষীরা ফিরোজের অনুসারী। সংঘর্ষের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনরত একটি জাতীয় দৈনিকের এক সংবাদকর্মীকে পর্যন্ত করা হয়েছে আসামি। তাই শেষ পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার পাওয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। আসামি ও সাক্ষীদের তালিকা প্রমাণ করছে সঠিক বিচার নয়, এখানে প্রাধান্য পেয়েছে প্রতিপক্ষ দমনের রাজনীতি।

ঘটনার সূত্রপাত বাউফল পৌর শহরের একটি তোরণ নিয়ে। এমপি ফিরোজের অনুসারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইউপি চেয়ারম্যান ইব্রাহিম ফারুক ওই তোরণের দেখভাল করতেন। পর্ব অনুযায়ী সেখানে ঝুলত এমপি ফিরোজের শুভেচ্ছা সংবলিত ব্যানার। ২০ মে রাতে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে তোরণটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি খুলে নেন ফারুক। শূন্যস্থানে নতুন তোরণ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় মেয়র জুয়েলের অনুসারীরা। ২৪ মে দুপুরে তোরণ নির্মাণ চলাকালে লোকজন নিয়ে বাধা দেন ফারুক। খবর পেয়ে জুয়েলও যান সেখানে। একপর্যায়ে সংঘর্ষে জড়ায় দু’পক্ষের সমর্থক। জটিলতা এড়াতে পরে বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষে বসে মীমাংসা বৈঠক। সহকারী পুলিশ সুপার ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ অনেকের উপস্থিতিতে বৈঠকে মেয়র জুয়েল ও চেয়ারম্যান ফারুকও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক চলাকালে থানার বাইরে আবারও সংঘর্ষে লিপ্ত হয় দুই নেতার সমর্থকরা। এই সংঘর্ষের সময় ছুরিকাহত হন তাপস। গুরুতর অবস্থায় বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মারা যায়। এ ঘটনায় তার ভাই পঙ্কজ চন্দ্র ৩৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন বাউফল থানায়। সাক্ষী করা হয় ২০ জনকে। আসামিরা যেমন মেয়র জুয়েলের অনুসারী, তেমনি সাক্ষী সবাই এমপি ফিরোজের সমর্থক। আসামির তালিকায় ১ নম্বরে রয়েছেন মেয়র জুয়েল। তাকে করা হয়েছে হত্যাকাণ্ডের হুকুমের আসামি।

অন্য আসামিদের মধ্যে সাইফুর রহমান উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, মাহমুদ রাহাত একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া রয়েছেন ছাত্রলীগের পৌর, কলেজ শাখা, উপজেলা ছাত্রলীগ, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ, উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। অপরদিকে সাক্ষীর তালিকায় থাকা ইয়ার খান এমপি আসম ফিরোজ গ্রুপের যুবলীগ নেতা, ইমাম হোসেন এমপি ফিরোজ অনুসারী যুবলীগ কর্মী, এসএম ফয়সাল আহম্মেদ (মনির মোল্লা) হলেন এমপি ফিরোজের ভাতিজা এবং উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও কালাইয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মো. ইব্রাহিম ফারুক উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, আবদুল মোতালেব হাওলাদার সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান, শাহজাহান সিরাজ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি, ইব্রাহিম খলিল উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, এনায়েত খান সানা পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ সাক্ষীরা সবাই এমপি ফিরোজের একান্ত অনুসারী।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বাউফল উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, ‘তাপস হত্যার ঘটনায় এ রকম কিছু যে হবে তা আগেই আশঙ্কা করেছিলাম। এখানে এমপি ফিরোজ ও মেয়র জুয়েলের বিরোধ দীর্ঘদিনের। এ হত্যাকাণ্ড প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হবে সেটাই স্বাভাবিক। যেহেতু খুন হওয়া তাপস এমপি ফিরোজের অনুসারী তাই সুবিধার পাল্লাটাও সেদিকেই ভারি। মামলায়ও এটি প্রমাণিত হয়েছে। তবে প্রতিপক্ষ দমনের রাজনীতিতে পড়ে অনিশ্চিত হয়ে গেল হত্যাকাণ্ডের বিচার।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাউফলের একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ‘প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার না বানিয়ে মামলাটিকে নিজের গতিতে চলতে দিলে বিচার পেত তাপসের পরিবার। কিন্তু সেটি হল না।’ মামলার বাদী পঙ্কজ চন্দ্র এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। ১নং আসামি মেয়র জুয়েল বলেন, ‘আমিও চাই প্রকৃত খুনির সাজা হোক। কিন্তু প্রতিপক্ষ দমনের টার্গেটে মামলায় আমিসহ যাদের আসামি করা হয়েছে তাতে সঠিক ঘটনা উন্মোচিত হবে কিনা সেটাই শঙ্কা।’ বাউফল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাদী একটি অভিযোগ দিয়েছে। তবে এটাই চূড়ান্ত নয়। সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব আমরা। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি করা হবে না।’ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইব্রাহিম ফারুক বলেন, ‘সবকিছু সবাই দেখেছে। আমার আলাদা করে কিছু বলার নেই।’

আসম ফিরোজ এমপি বলেন, যিনি নিহত হয়েছেন তার ভাই মামলা করেছেন, এখানে তিনি কাকে আসামি আর কাকে সাক্ষী করবেন সেটা তার ব্যাপার। এর মধ্যে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

বাউফলে আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ। এখানে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। তারপরও যারা দ্বন্দ্ব ছড়ানোর চেষ্টা করছে তারা আওয়ামী লীগে নবাগত, আওয়ামী লীগে তাদের অতীত ইতিহাস নেই।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত