বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবি

মুন্সীগঞ্জে বাড়ি বাড়ি শোকের মাতম

  আরিফ উল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টার, মুন্সীগঞ্জ ০১ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার বুড়িগঙ্গায় সোমবার লঞ্চডুবিতে মুন্সীগঞ্জের ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। লাশগুলো একের পর এক বাড়িতে পৌঁছার পর হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। বাড়িতে বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। এভাবে এত মৃত্যু মুন্সীগঞ্জবাসী মেনে নিতে পারছেন না।

লঞ্চডুবিতে মীরকাদিম পৌরসভার কাঠপট্টি, রামসিং, রিকাবীবাজার, পশ্চিমপাড়া, গোয়ালগোনি, বজ যোগিনী ও রামপালের যাত্রী ছিলেন বেশি। স্বজনহারাদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। বাড়িতে বাড়িতে কান্নার রোল। কেউ হারিয়েছেন স্বামী, কেউ স্ত্রী, কেউ ভাই, কেউ বোন আবার কেউবা মা-বাবা। স্বজন হারিয়ে কেউ কাঁদছেন হাউমাউ করে; আবার কেউবা বোবা কান্নায় নির্বাক তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে।

রিকাবীবাজারের পশ্চিমপাড়ার মৃত আবদুল রহিমের ছেলে দিদার হোসেন (৪৫) ঢাকার রহমতগঞ্জে ডালের ব্যবসায়ী ছিলেন। সোমবার সকালে বড় বোনের অসুস্থ স্বামীকে দেখতে আরেক বোন রুমা বেগমকে (৪০) নিয়ে লঞ্চে রওনা দেন। লঞ্চডুবিতে বোনসহ তিনি মারা যান। স্বজনরা জানান, সাত মাস আগে বিয়ে করেছিলেন দিদার।

এ মৃত্যুর মিছিলে যমুনা ব্যাংকের দুই স্টাফ রয়েছেন। তারা হলেন- মীরকাদিম পৌরসভার গোয়ালঘুন্নী গ্রামের কাঁলাচান তালুকদারের ছেলে সুমন তালুকদার (৩৩) এবং কাজি কসবা গ্রামের ঘুঘুবাড়ির রহিম উদ্দিনের ছেলে শাহাদাত (৪৪)। ইসলামপুর যমুনা ব্যাংকে সুমন কর্মরত ছিলেন। তার ছোট ভাই মো. সোহেল তালুকদার জানান, সুমনের মৃতদেহ ঢাকা থেকে বাড়িতে আনা হয়। রাতে জানাজা শেষে কাজি কসবা কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়েছে। সুমন স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান রেখে গেছেন। ঢাকার চকবাজার শাখার যমুনা ব্যাংকে শাহাদাত কর্মরত ছিলেন। তিনি স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান রেখে গেছেন।

রামপাল ইউনিয়নের শাখারীবাজার গ্রামের গোলাপ হোসেন ভূঁইয়া (৫২) ঢাকার লালকুঠি এলাকায় ব্যবসা করতেন। তিনি স্ত্রী ও তিনটি মেয়ে রেখে গেছেন। একই ইউনিয়নের সুজানগর গ্রামের জাকির হোসেনের স্ত্রী সুবর্ণা (৩৬) ও ছেলে তামিম (৮) মারা গেছেন। ঢাকায় চিকিৎসক দেখাতে যাচ্ছিলেন তারা। রামপাল ইউনিয়নের পানাম গ্রামের ময়না (৩৬) ও তার মেয়ে মুক্তা (১৬) মারা গেছেন। আবদুল্লাহপুর ছলিমাবাদ এলাকার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনির (৪৫) ঢাকার ইসলামপুরে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে লঞ্চডুবিতে মারা গেছেন। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। চরকেওয়ার ইউনিয়নের উত্তর গুহেরকান্দি গ্রামের আবদুর রব মাদবরের ছেলে উজ্জ্বল মাদবর এ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।

সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের ধলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা ফারইস্টের অফিসার মো. কনক (৩৬) ঢাকা অফিসে যাওয়ার পথে মারা গেছেন। টঙ্গীবাড়ী থানার আতরকাঠি গ্রামের বেলায়েত হোসেন ওরফে বিল্লাল স্ত্রী মারুফাকে (২৬) গ্যাস্ট্রোলিভার সমস্যার চিকিৎসার জন্য শিশুসন্তান আবু তালহাসহ (২) ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু হাসপাতাল পর্যন্ত তাদের যাওয়া হয়নি। লঞ্চডুবিতে প্রাণ হারিয়েছেন তারা। পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে বোনের লাশ নিয়ে এসেছেন মারুফার ভাই মো. সুমন। কাঁদতে কাঁদতে সুমন জানান, ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে এক চিকিৎসককে দেখানোর জন্য ভাগ্নেকে নিয়ে কাঠপট্টি থেকে লঞ্চে ওঠে তার বোন। সঙ্গে ছিলেন আরেক বোনজামাই আলম বেপারি। সবাই মারা গেছেন।

টঙ্গীবাড়ী উপজেলার আবদুল্লাহপুর গ্রামের আইনজীবী আবদুর রহমান (৪৮), তার স্ত্রী হাসিনা বেগম (৩৫) ও সন্তান সিফাত (৮) ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রী ছিলেন। স্ত্রী ও সন্তানের লাশ উদ্ধার করা হলেও আবদুর রহমানের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আবদুর রহমান ঢাকার জজকোর্টে কর্মরত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাসিনা বেগমের লাশ নদী থেকে উঠানোর সময় শাড়ির আঁচলে পেঁচানো ছিল শিশুপুত্র সিফাতের লাশ। হাসিনা বেগমের ভাই রবিন বলেন, আপার শাড়ির আঁচলে পেটের সঙ্গে বাঁধা ছিল সিফাত। হয়তো আপা বিপদ বুঝে তাকে আঁচলে বেঁধেছিলেন।

ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রী নাজমা আক্তার বলেন, ‘লঞ্চটি যে পাশ দিয়ে ডুবেছিল তার বিপরীত পাশের জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসি। চোখের সামনে পরিচিত মুখগুলো মুহূর্তে লাশ হয়ে যায়।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ছোট একটা লঞ্চে ১০০ থেকে ১১০ জনের বেশি যাত্রী ছিল। এর আগেও লঞ্চটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অব্যবস্থাপনার কারণেই এত বড় ঘটনা ঘটল।’

দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে আসা মীরকাদিম পৌরসভার এনায়েতনগরের জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, আট বছর ধরে কাঠপট্টি থেকে লঞ্চে করে ঢাকায় আসা-যাওয়া করেন তিনি। সোমবার মর্নিং বার্ড লঞ্চে মীরকাদিম পৌর এলাকার প্রায় ১০ জন ছিলেন। ফরাশগঞ্জ ঘাট এলাকার কাছাকাছি গেলে ঢাকা-চাঁদপুর রুটের ময়ূর-২ তাদের লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয়। এতে লঞ্চটি একপাশে কাত হয়ে যায়। পাশের সবাই ছিঁটকে নদীতে পড়তে থাকেন। তিনিও পানিতে পড়ে যান। ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী তীরে উঠতে সক্ষম হন। তিনিও প্রায় ডুবে যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, যাদের সঙ্গে পাঁচ মিনিট আগেও প্রাণবন্ত আড্ডায় ছিলাম। চোখের সামনে তারা ডুবে গেলেন।

বেঁচে ফেরা সুমন বেপারি : টঙ্গীবাড়ীর আবদুল্লাহপুরের সুমন বেপারি প্রতিদিনের মতোই সোমবার সকালে ফজরের নামাজ শেষে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মীরকাদিম লঞ্চঘাটে যান। মর্নিং বার্ড লঞ্চের যাত্রী হয়ে তিনিও দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। সুমন বেপারির ভাতিজা সাকিব বেপারি জানান, সকালে টেলিভিশনে ব্রেকিং নিউজে লঞ্চডুবির সংবাদ পেয়ে চাচার মোবাইল ফোনে কল দেই। তার ফোন বন্ধ পেয়ে ছুটে যাই শ্যামবাজারে বুড়িগঙ্গার তীরে। সারা দিন খোঁজ করে কোনো হদিস না পেয়ে রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাড়ি ফিরে আসি। রাত ১০টায় একটি টিভি চ্যানেলে ১৩ ঘণ্টা পর জীবিত একজনের সংবাদ দেখতে পাই। সংবাদ দেখে নিশ্চিত হই ওই জীবিত ব্যক্তি আমার ছোট চাচা সুমন বেপারি। এখন তিনি মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত