ভবনে ভবনে ‘টু-লেট’

চট্টগ্রামে কাজ হারিয়ে পরিবার নিয়ে গ্রামে ফিরছে মানুষ

  নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম ব্যুরো ০২ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আবদুস সালাম (৩৫)। চট্টগ্রাম নগরীর ইপিজেডে অবস্থিত ইউনিভোগ গার্মেন্টস কোম্পানিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। মহামারী করোনায় প্রতিষ্ঠানটি লোকসানের কবলে পড়লে ছাঁটাই করা হয় অনেক শ্রমিককে।

যেখানে কাজ হারিয়েছেন আবদুস সালামও। তিনি নগরীর বহদ্দারহাট আরাকান হাউজিং সোসাইটিতে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন। চাকরি হারানোর পর এক মাস বাসায় ছিলেন। নতুন কাজ না পাওয়ায় বাসা ভাড়া এবং পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণে হিমশিম খেতে হচ্ছে আবদুস সালামকে। শেষ পর্যন্ত সোমবার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে নগর ছেড়ে গ্রামের বাড়ি রাউজানে চলে গেলেন। আবদুস সালামের মতো কাজ হারানো অনেকেই প্রতিদিন শহর ছেড়ে গ্রামে পাড়ি জমাচ্ছেন। নগরীর ভবনে ভবনে ঝুলছে ‘টু-লেট’।

চট্টগ্রামের এনজিও সংস্থা ‘ইপসা’ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, করোনা জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে প্রভাব পড়েছে। ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে ঘরে বসে আছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দিনমজুর। তাদের ৬৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবহন শ্রমিক ১২ দশমিক ৬ শতাংশ, ছোট ব্যবসায়ী ১১ দশমিক ৭ শতাংশ, গার্মেন্ট শ্রমিক ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, ছোট পোলট্রি, ডেইরি গরুর খামারের মালিক ১ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর লেখাপড়া ব্যাহত হয়েছে। ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ যুবক। ৪০ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ মনে করে ২৬-৫০ শতাংশ মানুষ খাবারের অভাবে ভুগছে। ইপসা’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার ফারহানা ইদ্রিস যুগান্তরকে বলেন, ‘নগরীর ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া এবং ৩৫ নম্বর বকশিরহাট ওয়ার্ডের বিভিন্ন পরিবারের মাঝে এ জরিপ পরিচালিত হয়। সম্প্রতি জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।’

রিয়াজুদ্দিন বাজার এলাকায় অবস্থিত একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কর্মরত দিদারুল আলম (৪৫)। তিন মাস কর্মহীন থাকার পর গত সপ্তাহে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি হাটহাজারীর নাঙ্গলমোড়া এলাকায় চলে গেছেন। দিদারুল আলম যুগান্তরকে বলেন, তিন মাসের বেশি সময় ধরে ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা বন্ধ। প্রতিমাসে ১২ হাজার টাকা করে বাসা ভাড়া দিতে হতো। অন্যান্য খরচ তো আছেই। নগরীর বহদ্দারহাট সিডিএ আবাসিকের ৬ নম্বর সড়কের একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন নূরজাহান বেগম (৪০)। তিনি দুবাই প্রবাসী আনু আহমেদের স্ত্রী। দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে চট্টগ্রাম শহরে বসবাস করছেন নূরজাহান। সন্তানরাও নগরীর বিভিন্ন স্কুলে লেখাপড়া করছে। করোনার কারণে বিদেশে ৪ মাস ধরে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন স্বামী আনু আহমেদ। নূরজাহান বেগম জানান, ‘জমানো যা টাকা ছিল তাও শেষ হয়ে গেছে। স্বামী বিদেশে বেকার। টাকা পাঠাতে পারছেন না। এ কারণে বাধ্য হয়ে শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মরিয়ম নগর এলাকায় চলে আসি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জরিপ মতে, চট্টগ্রাম নগরীর প্রায় ৫০ শতাংশই ভাড়াটিয়া। জীবিকার তাগিদে থাকতে হয় ভাড়া বাসায়। ক্যাবের চট্টগ্রাম সভাপতি নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, করোনার কারণে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছে। আয় নেই এ কারণে মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে।

নগরীর সড়কগুলোতে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে ট্রাকে করে আসবাবপত্রসহ অন্যান্য মালামাল নিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে পাড়ি জমানোর দৃশ্য। বুধবার নগরীর দক্ষিণ খুলশী এলাকায় অবস্থিত গরীবউল্লাহ শাহ হাউজিং সোসাইটিতে গিয়ে দেখা গেছে প্রায় প্রতিটি ভবনের দরজায় ঝুলছে ‘টু-লেট’। কথা হয় এ আবাসিকের ১ নম্বর সড়কের চার তলা ‘অপু ভবন’ কর্মচারী নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, এ বাসায় ‘১৭টি ফ্ল্যাট আছে। এর মধ্যে ৫টি ফ্ল্যাট দীর্ঘ তিন মাস ধরে খালি আছে। এর মধ্যে কোনো ভাড়াটিয়াই বাড়ি দেখার জন্য আসছে না। একই আবাসিকের ১০ তলাবিশিষ্ট লুসেন্ট পার্ক, ১০ তলাবিশিষ্ট ‘ফিডালা’ এবং ‘এলকে পার্ক’ ভবনের গেটে ঝুলছে অসংখ্য ‘টু-লেট’। এদিকে নগরীর বহদ্দারহাট আরাকান হাউজিং সোসাইটি, আরমান হাউজিং সোসাইটি, বহদ্দারহাট সিডিএ আবাসিক, বাকলিয়া কল্পলোক আবাসিক, কোতোয়ালি হেরিটাইজা আবাসিক, চকবাজার জয়নগর আবাসিক, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক, বায়েজিদে কসমোপলিটন আবাসিক, হিলভিউ আবাসিক, শেরশাহ আবাসিক, খুলশী পূর্ব নাসিরাবাদ আবাসিকসহ সব কটি আবাসিক এলাকায় ঝুলছে অসংখ্য ‘টু-লেট’।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত