কাঠমান্ডু ট্র্যাজেডি

ঢামেক হাসপাতাল থেকে চার জন বাড়ি ফিরছেন আজ

সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন কবিরের ডান পা কেটে ফেলা হয়েছে, সংক্রমণ ছড়াচ্ছে বাম পায়েও * সিঙ্গাপুরে বাবার পাশে থেকে ছেলের আকুতি আপনারা দোয়া করবেন

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৮ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স
ফাইল ছবি

আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে বিমান বিধ্বস্তদের। আহতরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও বারবার আঁতকে উঠছেন। ভর্তি ৫ জনের মধ্যে আজ ৪ জনকে প্রাথমিকভাবে ছুটি দিচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এদিকে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন শাহিন বেপারী সোমবার মারা গেছেন। রাতে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কবির হোসেনের ডান পা কেটে ফেলা হয়েছে। তার বাম পায়েও ইনফেকশন ছড়াচ্ছে। আহত শেহরিন আহমেদ বার্ন ইউনিটে ভর্তি রয়েছে। শেহরিনকে আরও কয়েক সপ্তাহ থাকতে হবে জানিয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বিমান বিধ্বস্ত থেকে জীবন ফিরে পাওয়া আহতদের আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না। বেশ কয়েক মাস তাদের শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক চিকিৎসায় রাখতে হবে।

আহতদের চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, বিমান দুর্ঘটনায় জীবন ফিরে পাওয়া যাত্রীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে কয়েক মাস সময় লাগবে। ঢামেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে ভর্তি শাহিন বেপারী সোমবার মারা গেছেন। কবির হোসেনকে রোববার সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সোমবার তার ডান পা কেটে ফেলা হয়েছে।

এদিকে বার্ন ইউনিটে ভর্তি ৫ জনের মধ্যে ৪ জনকে প্রাথমিকভাবে ছুটি দেয়া হচ্ছে আজ। তবে তাদের মানসিকসহ শারীরিক চিকিৎসা চলমান থাকবে। শেহরিন আহমেদের বেশ কয়েকটি অপারেশন হয়েছে, তাকে আরও কয়েক সপ্তাহ থাকতে হবে। এর আগে কাঠমান্ডু থেকে আহত ডা. রেজওয়ানুল হক ও ইমরানা কবীর হাসিকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কবির হোসেনের সঙ্গে থাকা বড় ছেলে শাওন যুগান্তরের সঙ্গে আলাপ করেছেন।

তিনি যুগান্তরের এই প্রতিবেদকে জানান, সোমবার রাত ৯টার দিকে তার বাবার অপারেশন হয়। বাবার ডান পা কেটে ফেলা হয়েছে। বাম পায়ে ইনফেনশন ছড়াচ্ছে। অপারেশনের পর থেকে তার বাবার জ্ঞান ছিল না জানিয়ে শাওন জানান, মঙ্গলবার সকালে তার বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে। খুব কষ্ট করে কথা বলেছেন তিনি। কথাগুলো বলতে বলতে শাওন কান্নায় ভেঙে পড়েন, ‘আপনারা আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন। আমার বাবার যেন কিছু না হয়। বাবাকে হারাতে চাই না।’

কবির হোসেনের স্ত্রী হেনা কবির জানান, তাদের ২ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে সবাই পড়াশোনা করছে। তার স্বামী কসমিটিকের ব্যবসা করত। ছোটখাটো এ ব্যবসায় যা উপার্জন হতো, তা দিয়েই সংসার চলত। বর্তমানে ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় আছেন সবাই। টাকা-পয়সা না থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।

এদিকে ভয় আর আতঙ্ক নিয়েই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে আহত রাশেদ রুবায়েত, আলমুন নাহার অ্যানি, মেহেদী হাসান ও তার স্ত্রী কামরুন্নাহার স্বর্ণাকে। অ্যানির বাবা সালাহ উদ্দিন জানান, অ্যানি আগের চেয়ে সুস্থ হলেও কিছুক্ষণ পর পর ভয়ে আঁতকে উঠে।

১৯ মার্চ তার স্বামী প্রিয়ক ও মেয়ে প্রিয়ন্ময়ীর লাশ দেখতে বাড়িতে গিয়েছিল অ্যানি। বাড়ি থেকে কিছুতেই হাসপাতালে ফিরতে চাচ্ছিল না সে। একপর্যায়ে জোর করেই তাকে হাসপাতালে আনা হয়। ডাক্তার জানিয়েছেন, আজ অ্যানিকে ছুটি দেয়া হবে। চিকিৎসক, নার্স ও আহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৈদ্যুতিক সুইচ অফ-অন দেখলে কিংবা উড়োজাহাজসহ বিভিন্ন যানের শব্দ শুনলেই আঁতকে উঠছেন নেপালে প্ল্যান দুর্ঘটনায় আহতরা। ঘুমোতে পারছেন না তারা। চোখ বন্ধ করলেই কানের কাছে বাঁচাও, বাঁচাও আর চিৎকারের শব্দে দু’চোখের পাতা এক করতে পারেন না তারা। হাসপাতালের বেডে শুয়ে ক্ষণে ক্ষণেই চিৎকার দিয়ে উঠছেন, অঝোরে কাঁদছেন। হাসপাতালে ফ্লাস্কে থাকা গরম পানির ধোঁয়া দেখেও আঁতকে উঠছেন কেউ কেউ। এখনও ভিডিও ক্যামেরার লাইট কিংবা ক্যামেরার ফ্ল্যাশ চোখে পড়লে ভীষণ ভয় পাচ্ছেন।

ঢামেক হাসপাতাল মানসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, যে কোনো ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সময় লাগে। নানা পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে তাদের চিকিৎসা দিতে হয়। একটি পারিবারিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে তাদের সাহস জোগাতে হয়। তাদের প্রাথমিকভাবে ছুটি দেয়া হলেও সব সময় মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন হবে।

বার্ন ইউনিটে ভর্তি শেহরিন আহমেদের মা ফেরদৌসি মুস্তাক জানান, মেয়ের পুড়ে যাওয়া ক্ষতস্থানে বেশ কয়েকবার অপারেশন হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন আরও কয়েক সপ্তাহ থাকতে হবে। শেহরিন এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে। তার পাশের কেবিনেই ভর্তি আছেন আহত মেহেদি হাসান ও স্ত্রী কামরুন্নাহার স্বর্ণা।

মেহেদি হাসান জানান, তিনি শক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু স্ত্রী ও ফুফুাতো ভাই প্রিয়কের স্ত্রী অ্যানি এখনও প্রচণ্ড ভয় ও আতঙ্কে রয়েছে। কিছুতেই ভুলতে পারছে না এর ভয়াবহতা।

বার্ন ইউনিটের পরিচালক প্রফেসর ডা. আবুল কালাম যুগান্তরকে জানান, চিকিৎসকরা যথাযথ চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। আমাদের মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কবির হোসেনকে বাংলাদেশে রেখেই চিকিৎসা করানোর। সিদ্ধান্ত হয়েছিল তার ডান পা কেটে ফেলে দেয়ার। তার পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী তাকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা রয়েছে, উন্নত চিকিৎসার জন্য আহতদের যে কোনো উন্নত দেশে চিকিৎসা করানোর। আজ যাদের ছুটি দেয়া হচ্ছে তাদের সঙ্গে চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকবে। স্বজনদেরও বলা হয়েছে চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে।

ঘটনাপ্রবাহ : নেপালে ইউএস বাংলা বিধ্বস্ত

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter