শেবাচিম হাসপাতাল

করোনা ইউনিটে বিশৃঙ্খলা

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো ০৯ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বরিশাল শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে করোনা নেই এমন রোগীই বেশি মারা যাচ্ছেন। আর এখানে ভর্তি রোগীদের ৭০ ভাগই করোনা নেগেটিভ। ১৪ মার্চ যাত্রা শুরু করার পর থেকে বুধবার পর্যন্ত চিকিৎসা নেয়া ও মারা যাওয়া রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরা অনেক রোগী বলছেন, শেবাচিমের করোনা ইউনিট সংক্রমণের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। সাধারণ রোগের চিকিৎসা নিতে গেলেও করোনা ইউনিটে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এসব অভিযোগের কিছু স্বীকার করলেও একই সঙ্গে জনবল সংকটসহ নানা কারণে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের অভিশাপ দিতে দিতে মারা যায় অনেক রোগী। তাদের স্বজনরাও অভিশাপ দেন। কিন্তু আমরা যে কতটা অসহায় সেটা কাউকে বোঝাতে পারি না।’

শেবাচিম ক্যাম্পাসের পূর্ব প্রান্তে নতুন একটি ৫ তলা ভবনে চলছে করোনা ইউনিটের কার্যক্রম। গত ৪ মাসে এই ইউনিট থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ৮১২ রোগী। আর এ সময়ে মারা গেছেন ১২১ জন। মারা যাওয়াদের মধ্যে মাত্র ৪৬ জন করোনা পজিটিভ। বাকিরা মারা গেছেন অন্যান্য রোগে। অথচ তাদেরও ভর্তি হতে বাধ্য করা হয়েছিল করোনা ইউনিটে। যে ৮১২ রোগীকে এখানে চিকিৎসা দেয়ার কথা বলছে কর্তৃপক্ষ তাদের মধ্যে করোনা পজিটিভ মাত্র ৩১৫ জন। বাকি প্রায় ৫শ’ রোগীকে এখানে ভর্তি হতে বাধ্য করা হয় কোনোরকম করোনার উপসর্গ ছাড়াই। এমনকি বর্তমানে যে ৯৭ রোগী এখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তার মধ্যেও ১৯ জনের শরীরে পাওয়া যায়নি করোনা পজিটিভ।

চিকিৎসাধীন একাধিক রোগী জানান, শারীরিক নানা সমস্যা নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসার পর দেয়া হয় অনেকগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এরপর তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয় করোনা ইউনিটে। বাধ্য করা হয় করোনা রোগীর সঙ্গে থাকতে। অথচ করোনার কোনো উপসর্গ ছিল না তাদের।

বরিশাল নগরীর বিএম কলেজ সড়কের বাসিন্দা নিখিল দাস (৬১) অনেক আগে থেকেই বুকের ব্যথায় ভুগছেন। ১৮ জুন ব্যথা বাড়লে তাকে শেবাচিম হাসপাতালে নেয়া হয়। আগের চিকিৎসার সব কাগজপত্র জমা দিলেও করোনা সন্দেহে অনেকগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্লিপ ধরিয়ে দেয়ার পাশাপাশি তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় করোনা ইউনিটে। নিখিল দাসের ছেলে তন্ময় দাস বলেন, ‘১৯ জুন করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা নেয়া হয়। ২১ জুন রিপোর্টে নিশ্চিত হই বাবার করোনা হয়নি। এরই মধ্যে অবজারভেশন রুমের অবর্ণনীয় পরিবেশে দু’বার মাইল্ড স্ট্রোকের শিকার হন বাবা। পরবর্তী সময়ে তাকে বাসায় নিয়ে যাই। পরের ঘটনা আরও করুণ। বাবার দেখাশোনা করার জন্য আমরা দু’ভাই বহুবার গিয়েছি করোনা ইউনিটে। বাড়ি ফেরার পর আমাদের শুরু হয় করোনা উপসর্গ। একপর্যায়ে আক্রান্ত হন মা। টানা ২২-২৩ দিন ঘরে থেকে চিকিৎসা নেয়ার পর সুস্থ হই সবাই।’ এক প্রশ্নের জবাবে তন্ময় দাস বলেন, ‘অবজারভেশন রুমে সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের একসঙ্গে রাখা হয়। ফলে যারা করোনা পজিটিভ নয় তাদেরও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যেমনটা হয়েছে আমাদের।’ বুকে ব্যথা নিয়ে টানা ৮ দিন করোনা ইউনিটে থাকা বরিশাল নগরীর ব্যবসায়ী বিশ্বজিৎ ঘোষের (৫৪) শ্যালক অখিল ঘোষ বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই আমার ভগ্নীপতির নানা শারীরিক সমস্যা ছিল। জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে একদিন বুকে ব্যথা উঠলে নিয়ে যাই শেবাচিমে। শুরুতেই একগাদা টেস্ট দেয়ার পাশাপশি পাঠিয়ে দেয়া হয় করোনা ইউনিটে। বহুবার বলেছি যে তার করোনার কোনো উপসর্গ নেই। তারপরও কেউ শোনেনি। টানা ৮ দিন করোনা ইউনিটে থাকার পর রিপোর্ট আসে তার করোনা হয়নি। এরপর নিয়ে আসি বাসায়।’

পুরো বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানান শেবাচিমের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন। তিনি বলেন, ‘৫০০ বেডের জনবলে চলছে ১ হাজার বেডের হাসপাতাল। তাও আবার ২২৪ ডাক্তারের ৯৬টি পদই শূন্য। নতুন যোগ হয়েছে করোনা ইউনিট। করোনা ইউনিটের জন্য একজন আরএমও চেয়েছিলাম। তা তো দেয়া হয়ইনি উপরন্তু এখানকার মেডিসিন বিভাগের একজন দক্ষ চিকিৎসককে বদলি করা হয়েছে। কি করে সব সামাল দেব বলতে পারেন? আমি স্বীকার করছি যে, সব রোগীকে সঠিক চিকিৎসা দিতে পারছি না। কিন্তু কেন সেটা, কেউ কি তা তলিয়ে দেখেছেন? ডাক্তার নেই, নার্স নেই, চিকিৎসার সরঞ্জামাদি নেই, কি করে চিকিৎসা দেব? তারপরও আমরা চেষ্টা করছি।’

করোনা নেই এমন রোগীদের অধিক সংখ্যায় মৃত্যু এবং করোনাবিহীন রোগীদের ভর্তি বিষয়ে তিনি বলেন, ‘উপসর্গ থাকার পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে বোঝা সম্ভব এমন কিছু রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই পাঠানো হয় করোনা ইউনিটে। তারপরও যদি কারও রিপোর্ট নেগেটিভ আসে তাহলে তো কিছু করার নেই। শুধু বরিশাল নয়, পুরো দেশে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই যাতে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করে করোনা আছে কি নেই, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত