বান্দরবানে সিক্স মার্ডার

খুনোখুনির নেপথ্যে স্বার্থ ও আধিপত্যের লড়াই

  আলাউদ্দিন শাহরিয়ার, বান্দরবান ১০ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাহাড়ে সম্প্রতি সিক্স মার্ডারের নেপথ্যে রয়েছে স্বার্থ আর আধিপত্যের লড়াই। আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আদর্শের মূল জায়গা থেকে সরে এসে চাঁদাবাজির জন্য আধিপত্য বিস্তারের খেলায় মেতে উঠেছে। আর এ কারণেই একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে। পার্বত্যবাসীর অধিকার আদায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা), জেএসএস সংস্কার (এমএন লারমা), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রট (ইউপিডিএফ), ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক, মগ লিবারেশন পার্টি বা মগ বাহিনী (এমএলপি)- সংগঠনগুলোর সশস্ত্র ক্যাডাররা পাহাড়ে এখন রক্তের হোলি খেলায় মেতেছে। এসব সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন! বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ৩ জেলায়ই এখন সশস্ত্র ক্যাডারদের দাপট।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেএসএস মূল সংগঠনের একজন শীর্ষ নেতা বলেছেন, হত্যা-পাল্টা হত্যা এগুলো রাজনীতি নয়। সিক্স মার্ডারও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়। এগুলো স্বার্থ আর আধিপত্যের লড়াইয়ের ফল। বান্দরবান হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জেলা। এখানকার শান্তিপ্রিয় মানুষগুলো এতদিন শান্তিতেই ছিল। কিন্তু গত বছর থেকে পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠেছে। হতাশ কণ্ঠে শীর্ষস্থানীয় এক নেতা বলেছেন, এখানেই আমার শৈশব, কৈশোর কেটেছে। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি করে আসছি। সর্বাত্মক ছাড় দিয়ে অধিকার আদায়ের রাজনীতি করেছি। পাহাড়ে এখন রাজনীতি, রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। খুনোখুনি ভালো লাগে না, বিরক্ত হয়ে গেছি। পরিস্থিতি এমন হলে হয়তো ছেড়ে দেব আঞ্চলিক রাজনীতিও।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য সাধুরাম ত্রিপুরা মিল্টন বলেন, সিক্স মার্ডার স্বার্থ, আধিপত্য এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফসল। মতাদর্শ থেকে অনেকটাই সরে গেছে পাহাড়ের রাজনীতি। পাহাড়ে রক্তের খেলা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না। জেলায় দায়িত্বশীল কোনো পদে আমি নেই। জেএসএস কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পদে আছি এখনও।

রাজবিলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ক্যঅংপ্রু মারমা বলেন, সিক্স মার্ডারে নিহতরা নিরস্ত্র ছিল। আগের দিন বাঘমারায় রতন তঞ্চঙ্গ্যার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল শুনেছি। সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা খাওয়ার প্রস্তুতি নেয়ার সময় ৭-৮ জন অস্ত্রধারী হামলাকারীর ব্রাশ ফায়ারে তাদের মৃত্যু হয়। গুলিবিদ্ধ ৩ জনের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা একজন কলেজছাত্রীও রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক জনপ্রতিনিধি অভিযোগ করেছেন, পাহাড়ের মূল সংগঠন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস) কোণঠাসা করতে ক্ষমতাসীনদের মদদে পাহাড়ে জেএসএস এমএন লারমা, ইউপিডিএফ (প্রসীত খীসা), ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক, মগ বাহিনী (মগ লিবারেশন পার্টি) আরও ৪টি সংগঠনের জন্ম হয়েছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাঁচটি সংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা জড়িয়ে পড়েছেন পাল্টাপাল্টি খুনোখুনিতে। আধিপত্যের দ্বন্দ্বের চেয়েও সশস্ত্র ক্যাডারদের কাছে প্রাধান্য পাচ্ছে এখন অবৈধ চাঁদাবাজির অর্থ। মূলত চাঁদাবাজির অর্থ আদায় নিয়েই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে সশস্ত্র ক্যাডাররা। একাধিক সশস্ত্র সংগঠন তৈরির জন্য ক্ষমতাসীন দলকে দায়ী করে টার্গেট কিলিংয়ে নেমেছে সশস্ত্র ক্যাডাররা। আতঙ্কে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাকর্মীরা এখন গ্রাম ছেড়ে শহরে আত্মগোপনে আছে।

বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইসলাম বেবী বলেন, আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করার কোনো সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ কাউকেই প্রশ্রয় দেয় না। সশস্ত্র প্রতিটি আঞ্চলিক সংগঠনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির পরিপন্থী। পাহাড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জন্য এখানকার আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর আধিপত্যের লড়াই দায়ী। এগুলোর মূলে হচ্ছে পাহাড়ে চাঁদাবাজির বিস্তারের স্বার্থ এবং দাপট। জেএসএস সংস্কার বান্দরবানের বাঘমারায় অফিস নেয়ায় বিপক্ষের আধিপত্যে আঘাত হানায় সিক্স মার্ডার।

জনসংহতি সমিতি এমএন লারমা (সংস্কার) কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেছেন, বান্দরবান জেলার বাঘমারায় নতুন অফিস নেয়া হয়েছিল। নিহত জেলার সমন্বয়ক রতন তঞ্চঙ্গ্যা অফিস গোছানোর কাজটি করছিলেন। সিক্স মার্ডারে নিহতরা সাংগঠনিক সফরেই গিয়েছিল বান্দরবান। এটি হয়তো প্রতিপক্ষের পছন্দ হয়নি। ২০১০ সালে এমএন লারমা (সংস্কার) প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সন্তু লারমা বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাডাররা এ পর্যন্ত ৮৫ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। বান্দরবানের পুলিশ সুপার জেরীন আক্তার জানান, সিক্স মার্ডারের ঘটনার পর মামলা হয়েছে। সংগঠনের জেলা সেক্রেটারি উবামং মারমা বাদী হয়ে ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত