নয়া ১৬ খাতে করারোপ করবে ডিএসসিসি

  মতিন আবদুল্লাহ ১১ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে (ডিএসসিসি) স্বনির্ভর করতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। রাজস্ব খাতের সব ফাঁকি বন্ধ এবং নতুন ১৬টি খাতে কর আরোপ করার তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নিজস্ব আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে ডিএসসিসির পরিচালনা ব্যয় মিটিয়ে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করাও সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মেয়র তাপসের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ বা বোর্ডসভা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন-২০০৯ এর ৮২ ধারায় চতুর্থ তফসিলের ২৬টি খাত থেকে কর আদায়ের আইনগত অধিকার রয়েছে ডিএসসিসির। এর মধ্যে ১০টি খাত থেকে কর আদায় করছে ডিএসসিসি। আর বাকি ১৬টি খাত থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রশাসক বা মেয়র রাজস্ব আদায় করেননি। ঋণে জর্জরিত ডিএসসিসির দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বনির্ভর সংস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে মেয়র তাপস প্রথম বোর্ডসভায় আইনগত সুযোগ রয়েছে এমন সব খাত রাজস্ব আদায় করার সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্ত ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন মেয়র।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আইনে ২৬টি খাত থেকে করারোপ করে রাজস্ব আয় করার বিধান থাকলেও অনেক খাতের আয়ের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। এ কারণে এসব খাত থেকে রাজস্ব আদায় করা কঠিন হবে। এজন্য এ ব্যাপারে শক্তিশালী কমিটি গঠন করে কর্মপন্থা নির্ধারণ করে বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। না হলে নতুন খাতে লক্ষ্য অর্জন করা দুরূহ হয়ে পড়বে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, আইনে সিটি কর্পোরেশনের করারোপের যেসব খাতের কথা বলা হয়েছে, সেসব খাত থেকে করারোপ নিশ্চিত করা ভালো উদ্যোগ। এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। তিনি বলেন, ডিএসসিসির দুটি বিষয় আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ডাবল করারোপ হয়ে যাচ্ছে। যেমন- বর্জ্য সংগ্রহ বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে ডিএসসিসি কর আদায় করে। এটা বহু বছর ধরে চলে আসছে। তবে বাসা থেকে আবর্জনা সংগ্রহের মধ্যস্বত্বভোগী একটি শ্রেণি গড়ে উঠেছে- তারা জোর করে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে। এটা পুরোপুরি অবৈধ। কিন্তু তাদের নির্ধারিত টাকার বিনিময়ে বার্ষিক চুক্তিতে এ কাজ করার সুযোগ দেয়ায় এ খাতে ডাবল করারোপ হয়ে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে একটি অবৈধ কার্যক্রমকে বৈধতা দেয়া হচ্ছে। এখান থেকে ডিএসসিসিকে সরে আসতে হবে। এছাড়া বাসাবাড়ির মশা মারতে ফি নির্ধারণও স্বাস্থ্য খাতের ডাবল করারোপ হয়ে যাচ্ছে। এটাও আইনসঙ্গত নয়। প্রয়োজনে ডিএসসিসি বর্জ্য ও স্বাস্থ্যকর বাড়াতে পারে। তবে কোনোভাবেই ডাবল করারোপ করতে পারে না বা অবৈধ কোনো কাজকে বৈধতাও দিতে পারে না। ডিএসসিসি মেয়রকে এটা ভেবে দেখতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস যুগান্তরকে বলেন, ডিএসসিসির আইনে ২৬টি খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের সুযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ৮-১০টি খাত থেকে রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে। ডিএসসিসি অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত, দায়-দেনায় জর্জরিত। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে নিজস্ব আয় বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, আমরা কোনো কর বাড়াব না। এ মুহূর্তে হোল্ডিং ট্যাক্স মূল্যায়নও করব না। প্রথমে গুরুত্ব দিচ্ছি রাজস্ব ফাঁকি ও চুরি বন্ধে। এরপর আইনে যেসব খাত থেকে আমাদের কর আদায়ের সুযোগ রয়েছে, সেসব খাত থেকে কর আদায় করা হবে।

নতুন ১৬ খাতে করারোপ : যে নতুন ১৬টি খাতে ডিএসসিসি করারোপ করতে যাচ্ছে সেগুলো হল- নগরীতে পণ্য আমদানির ওপর কর; জনসেবামূলক কার্যক্রমের ওপর কর; সরকার আরোপিত করের ওপর উপ-কর; ডিএসসিসির জনসেবামূলক কাজ থেকে প্রাপ্ত করের ওপর ফি; বেসরকারি মার্কেটের ওপর ফি; ডিএসসিসির কোনো কাজের জন্য ফি; যে কোনো বিধানের অধীনে অন্য কোনো ফি; আইন বলে আরোপীয় অন্য কোনো কর; টোল জাতীয় কর; জন্ম, বিবাহ, দত্তক ও জিয়াফত বা ভোজের ওপর কর; বিজ্ঞাপনের ওপর কর; পানির কল ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কর; স্কুল ফি; মেলা, প্রদর্শনী, প্রতিযোগিতার ওপর ফি; পেশা বা বৃত্তির ওপর কর; পশুর ওপর কর।

নগরীতে পণ্য আমদানির ওপর কর : এসব কর আদায় করে আমদানি ও রফতানি অধিদফতর। এছাড়া এ সংক্রান্ত সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে ওই সংস্থা। এ কারণে এ খাত থেকে কর আদায় করতে হলে আমদানি ও রফতানি অধিদফতরের অন্য সব ফির সঙ্গে এ খাতের করারোপের খাত যুক্ত করা গেলে সহজে এটা আদায় করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জনসেবামূলক কার্যক্রমের ওপর কর : কী ধরনের জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের ওপর কর বা ভাড়া আদায় করা হবে সেটা পরিষ্কার নয়। এ বিষয়ে শক্তিশালী কমিটি গঠন করে পর্যালোচনা করে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে হবে। না হলে এ খাত থেকে রাজস্ব আদায়ে মাঠে নামলে জটিলতা তৈরি হবে। এটা বাস্তবায়নের আগে ডিএসসিসিকে নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।

সরকার আরোপিত করের ওপর উপ-কর : এ খাতে আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন করারোপ করার উদ্যোগ নিলেও রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে দেন-দরবারে পেরে ওঠেননি। এ কারণে এ খাতে করারোপ করার আগে কী হারে, কীভাবে, কাদের কাছ থেকে করারোপ করা হবে, সেটা নির্ধারণ করতে হবে।

ডিএসসিসির জনসেবামূলক কাজ থেকে প্রাপ্ত করের ওপর ফি : এ খাতের করারোপ করতে হলে কী ধরনের জনসেবামূলক কার্যক্রম থেকে প্রাপ্ত করের ওপর ফি আদায় করা হবে সেটা স্পষ্ট করতে হবে।

বেসরকারি মার্কেটের ওপর ফি : ডিএসসিসির মালিকানাধীন মার্কেটের দোকান থেকে সালামি, ভাড়া ও ট্রেড লাইসেন্স খাতে রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে। তবে ব্যক্তি মালিকানাধীন বা বেসরকারি মার্কেট বা বাজার থেকে রাজস্ব আদায় করা হয় না। এসব খাত থেকেও রাজস্ব আদায় করা হবে।

ডিএসসিসির কোন কাজের জন্য ফি : কোথা থেকে এবং কীভাবে আদায় করা হবে সে ব্যাপারে পরিষ্কার করে কিছু বলা হয়নি। এ কারণে বিষয়টি পরিষ্কার করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

যে কোনো বিধানের অধীনে অন্য কোন ফি : এ ব্যাপারে পরিষ্কার করে কিছু বলা হয়নি। বিষয়টিও পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

আইনবলে আরোপীয় অন্য কোন কর : এ খাতের রাজস্ব আদায় বা করারোপ কীভাবে হবে, সেটা অস্পষ্ট। এটা ঠিক করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

টোল জাতীয় কর : ছয় থেকে সাত বছর ধরে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল ও ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনালের যানবাহনের ওপর টোল আদায় কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানকে এ দুটি টার্মিনাল ইজারা দিয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা সম্ভব।

জন্ম, বিবাহ, দত্তক ও জিয়াফত বা ভোজের ওপর কর : সিটি কর্পোরেশনের আদর্শ কর তফসিল ২০১৬-এর (১০৪) ধারার ক্রমিক নম্বর ১৫২ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জেলা রেজিস্ট্রার অফিস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এ খাতের আয় বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

বিজ্ঞাপনের ওপর কর : সিটি কর্পোরেশনের কর তফসিল অনুযায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন জমি বা ইমারতের ওপর ভিটিএস স্থাপন করা হলে চুক্তিতে ভাড়ার ছয় ভাগের এক ভাগ হোল্ডিং ট্যাক্সের সঙ্গে আদায় করা হবে। এটা কার্যকর করতে আইনগত কোনো অস্পষ্টতা নেই। ডিএসসিসি চাইলে যে কোনো সময় কার্যকর করতে পারে।

পানির কল ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কর : সিটি কর্পোরেশনের কর তফসিল অনুযায়ী, পানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য সেবা সংরক্ষণ ব্যয় বাবদ ইমারত বা জমির বার্ষিক কর মূল্যায়নের ওপর সর্বোচ্চ তিন ভাগ হারে কর আরোপ করা যাবে। তবে কোনো সিটি কর্পোরেশন এলাকায় পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন আইন-১৯৯৬ অনুযায়ী এর অধীনে প্রতিষ্ঠিত পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী পানির ওপর করারোপ করা হলে সিটি কর্পোরেশন সেক্ষেত্রে পানির ওপর করারোপ করতে পারবে না।

স্কুল ফি : সিটি কর্পোরেশনের কর তফসিল অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ট্রেনিং সেন্টারের ওপর করারোপ করা যাবে। এখন পর্যন্ত এ খাতে ডিএসসিসি করারোপ করেনি।

মেলা, প্রদর্শনী, প্রতিযোগিতার ওপর ফি : সিটি কর্পোরেশনের কর তফসিল অনুযায়ী, কর্পোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আয়োজিত কোনো মেলা, কৃষি প্রদর্শনী এবং অনুরূপ কোনো জনসমাবেশের ক্ষেত্রে আয়োজক কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট স্থানে প্রবেশের জন্য নির্ধারিত প্রবেশ মূল্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০ ভাগ হারে ফি আদায় করা যাবে।

পেশা বা বৃত্তির ওপর কর : সিটি কর্পোরেশনের কর তফসিল অনুযায়ী, শহরের সব পেশা বা বৃত্তির ওপর করারোপ করা যাবে। স্বল্প পরিসরে এটার চর্চা থাকলেও সব পেশার ওপর এ করারোপ করা হচ্ছে না। এটাকে কার্যকর করে সব পেশা বা বৃত্তির ওপর করারোপ নিশ্চিত করতে হবে।

পশুর ওপর কর : সিটি কর্পোরেশনের কর তফসিল অনুযায়ী, পশু পালন করলে করারোপের বিধান রয়েছে। ডিএসসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ তৎপর হলে এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করতে পারবে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত