২ এপ্রিল এইচএসসি-সমমান পরীক্ষা শুরু

দু’বছরে ঝরল সাড়ে ৬ লাখ শিক্ষার্থী

৫ কারণে ঝরে পড়া বন্ধ হচ্ছে না * প্রশ্নফাঁস হবে না, সে নিশ্চয়তা নেই * সব ধরনের কোচিং বেআইনি

  মুসতাক আহমদ ২৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পরীক্ষা

মাত্র দু’বছরে সাড়ে ৬ লাখের বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। এসব শিক্ষার্থী এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার জন্য নিবন্ধিত হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাঁচ কারণে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। এর মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তা হচ্ছে- ছাত্রীদের ক্ষেত্রে বিয়ে ও দারিদ্র্য। এছাড়া বিদেশ চলে যাওয়া, টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া এবং নবম ও একাদশ শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষায় ফেল করা ঝরে পড়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিভিন্ন বোর্ডের চেয়ারম্যানরা।

এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হবে ২ এপ্রিল। এতে অংশগ্রহণের জন্য দু’বছর আগে একাদশ শ্রেণীতে নিবন্ধন করেছিল ১৩ লাখ ৩ হাজার ৭৮৬ জন। এর মধ্যে ১০ লাখ ১৮ হাজার ৪১১ জন এ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। বাকি ২ লাখ ৮৫ হাজার ৩৭৫ জন ঝরে পড়েছে। অপরদিকে এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৭ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭৩ জন। তাদের সঙ্গে নবম শ্রেণীতে সর্বমোট ২১ লাখ ১৪ হাজার ২২২ জন নিবন্ধন করেছিল। সেই হিসাবে বাকি ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৬৪৯ জন শিক্ষার সে াতধারা থেকে হারিয়ে গেছে। এ দুই স্তরে দু’বছরে ঝরে পড়ার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজার ২৪ জনে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এইচএসসিতে ঝরে পড়ার সংখ্যাও বেড়েছে। গত বছর এইচএসসিতে ঝরে পড়েছিল ২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৮৭ জন। সেখানে এ সংখ্যা এবার ৪১ হাজার বেশি। পরীক্ষা উপলক্ষে বুধবার মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ঝরে পড়ার ঘটনা একটা বাস্তবতা। এদের মধ্যে ছাত্রী সংখ্যা বেশি। এসএসসি পাস করলে অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েদের বিয়ে দেন অভিভাবকরা। দূর-দূরান্তে কলেজ থাকায় চলাচলের সমস্যার কারণে অনেক অভিভাবকই মেয়েদের আর পড়াতে চান না। এখনও দেশে কমবেশি দারিদ্র্যাবস্থা আছে। এ কারণে অনেকেই এসএসসি পাসের পর শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখতে পারে না।

মন্ত্রী বলেন, ‘কোনো শিক্ষার্থী ঝরে পড়ুক, তা আমরা চাই না। এজন্যই বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, মোটের ওপর ৪০ শতাংশ ছাত্রছাত্রীকে উপবৃত্তি প্রদান, মেধাবৃত্তি, অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থাসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এছাড়া ঝরে পড়ার হার আরও কমাতে পদক্ষেপ নেয়া হবে।’ আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষায় সর্বমোট ১৩ লাখ ১১ হাজার ৪৫৭ জন অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ১০ লাখ ১৮ হাজার ৪১১ জন নিয়মিত পরীক্ষার্থী। বাকিরা অনিয়মত পরীক্ষার্থী। এদের কেউ গত বছরের পরীক্ষায় বিভিন্ন বিষয়ে ফেল করা। এছাড়া প্রাইভেট এবং মানোন্নয়ন পরীক্ষার্থী আছে।

এভাবে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া প্রসঙ্গে কয়েকটি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান যুগান্তরকে বলেন, ‘দারিদ্র্যের কারণে কিছু শিক্ষার্থী বিদেশে চলে যায়। অনেকে কাজে ভিড়ে যায়। আবার কিছু শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় বা বার্ষিক পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ থেকে যায়। এভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় নবম বা একাদশ শ্রেণী থেকেই শিক্ষার্থী কমতে থাকে। পরীক্ষার সময়ে মোট হিসাবে তা বড় আকার ধারণ করে।’

উল্লেখ্য, এবারের মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে এইচএসসিতে আছে ১০ লাখ ৯২ হাজার ৬০৭ জন, মাদ্রাসার আলিমে ১ লাখ ১২৭ জন এবং কারিগরি বোর্ডের এইচএসসি বিএমে ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৪ জন। ঢাকা বোর্ডের অধীন ডিপ্লোমা ইন বিজনেস স্টাডিজে ৯৬৯ জন আছে। সবমিলিয়ে এবার ২ হাজার ৫৪১টি কেন্দ্রে পরীক্ষা হবে। সারা দেশে ৮ হাজার ৯৪৩ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নেবে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪৫১টি কলেজ, ২ হাজার ৭০০টি মাদ্রাসা, ১ হাজার ৭৭৪টি কারিগরি এবং ১৮টি কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট। শিক্ষামন্ত্রী জানান, ১৩ মে পর্যন্ত তত্ত্বীয় পরীক্ষা চলবে। পরদিন থেকে ২৩ মে পর্যন্ত চলবে ব্যবহারিক পরীক্ষা। মোট ৩০ কর্মদিবস লাগছে এবারের পরীক্ষায়। তবে এর ব্যাপ্তিকাল ৪২ দিন। ৮টি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ১টি কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও ১টি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। এ সময় শিক্ষামন্ত্রী পরীক্ষা সংক্রান্ত গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘পরীক্ষার ৩০ মিনিট আগে পরীক্ষার্থীকে সিটে বসতে হবে। পরীক্ষার ২৫ মিনিট আগে প্রশ্নের প্যাকেট খোলা হবে।’ সংবাদ সম্মেলনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন, কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব একেএম জাকির হোসেন ভূঞা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হাসান, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক একেএম ছায়েফউল্যাসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রশ্নফাঁস হবে না, সে নিশ্চয়তা নেই : সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এবারের এসএসসি পরীক্ষার অভিজ্ঞতার আলোকে প্রশ্নফাঁস রোধে যা যা করা দরকার, সব পদক্ষেপই নেয়া হয়েছে। এরপরও আমরা এ নিশ্চয়তা দিতে পারছি না যে, প্রশ্নফাঁস হবে না। কেননা দুষ্কৃতকারীরা যে নতুন নতুন পন্থা বের করবে না, তা তো আমরা বলতে পারছি না। যারা প্রশ্নফাঁস করে, তারা জনগণের কাছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে হেয় করতে এবং সরকারের অর্জন-সাফল্যকে চাপা দেয়ার অসৎ উদ্দেশে করছে। এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমাদের তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়নি। গোয়েন্দা সংস্থা তৎপর আছে। যারা বিকাশ করেছে বা অন্যভাবে লেনদেন করে, সেই সূত্র ধরে আমরা অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছি।

দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার আহ্বান : সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আলাদা বক্তব্যে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার আহ্বান জানান। সচিব বলেন, তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, শুধু এমসিকিউ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হয়েছে। কিন্তু পরীক্ষার সময়ের প্রতিবেদন দেখলে মনে হয়েছে, গোটা প্রশ্নফাঁস হয়েছে। আমরা আপনাদের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের অনুরোধ করছি। আপনাদের প্রতিবেদনে আমরা না হয় অপদস্ত হলাম, কিন্তু সারা দেশের মানুষ ও অভিভাবকরা বিভ্রান্তি হয়।

সব ধরনের কোচিং বেআইনি: সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কোচিং সেন্টার বন্ধ করার ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের হাতে নেই। তবে কোনো ধরনের কোচিং সেন্টারই আইনগত অ্যালাউড না। হাইকোর্টের রায় আছে- কোচিং সেন্টার, গাইড বই, নোট বই- এগুলো বেআইনি। কিন্তু তারপরও আমাদের দেশে অনেক অপরাধ হচ্ছে, বেআইনি কাজ হচ্ছে। ইচ্ছে করলেই সব বন্ধ করে দেয়া যায় না। তারপরও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ: আরেক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এসএসসিতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বিবেচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। এসএসসিতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ৫২টি মামলায় ১৫৭ জনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের মধ্যে যেসব শিক্ষক রয়েছেন, তাদের চাকরি থেকে বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

নজরদারিতে মোবাইল ব্যাংকিং: সংবাদ সম্মেলনের পর দেশে মোবাইল ফোনে ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন। একটি সূত্র জানায়, বৈঠকে দুটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একটি হচ্ছে, এসএসসি পরীক্ষাকালে সারা দেশে সন্দেহজনক লেনদেনকারী ব্যক্তিদের তথ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। অপরটি হচ্ছে- আসন্ন পরীক্ষায় সন্দেহজনক লেনদেনকারীদের তথ্য নিকটস্থ থানায় অবহিত করবেন এজেন্টরা। এ দুই বিষয়ে সিদ্ধান্ত কার্যকরের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নির্দেশনা জারি করবে।

ঘটনাপ্রবাহ : এইচএসসি-২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter