সাহেদের ভয়ংকর প্রতারণা

এখনও মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা

  মাহমুদুল হাসান নয়ন ১৪ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভয়ংকর প্রতারক রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ করিমের ভয়ে এখনও মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না অনেক ভুক্তভোগী। নিজের প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অসংখ্য মানুষ ভদ্রবেশী সাহেদের প্রতারণার শিকার হয়েও এখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন। অনেকে আবার সাহেদের কুকর্ম ফাঁস করতে চাইলেও শর্ত দিচ্ছেন নাম গোপন রাখতে।

এদের বড় একটি অংশ শারীরিক ও মানসিকভাবে সাহেদের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেকে আবার আর্থিকভাবে প্রতারিত হয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের ধারণা, সাহেদ যদি ধরাও পড়ে তাহলে আবার বের হয়ে যাবে এবং তাদের ক্ষতি করবে। ‘সাহেদ সব করতে পারেন’ এমন বিশ্বাস তাদের। এদিকে অর্থ আত্মসাতের দুই মামলায় সাহেদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় র‌্যাবের অভিযানের পর থেকেই দেখা গেছে এমন চিত্র। বিভিন্ন সময়ে সাহেদের প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে কাজ করতেন এমন অন্তত ১৭ জনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এদের মধ্যে সাহেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এক তরুণীও রয়েছেন। যারা খুব কাছ থেকে সাহেদের অপকর্মগুলো দেখেছেন। এদের বর্ণনায় উঠে আসে সাহেদের ভয়ংকর সব প্রতারণার তথ্য। তাদের ভাষ্য, নীতিবাক্য ছড়ানো সাহেদ ব্যক্তিগত জীবনে কতটা ভয়াবহ ছিলেন তা কেউ কল্পনাতেও নিতে পারবে না।

তার বিরুদ্ধে কথা বলে বা প্রতিবাদ করে কেউ কখনও প্রতিকার পায়নি। বরং সাহেদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে মামলা, হামলা, নারী নির্যাতনের অপবাদ মাথায় নিয়ে চুপ থাকতে হয়েছে অনেককে। সাহেদের সঙ্গে একাধিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় এক দশক কাজ করেছেন এক তরুণী। যুগান্তরকে তিনি বলেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা সামান্য বেতনে চাকরি করত সাহেদের অফিসে।

এদের বিভিন্নভাবে সাহেদ ব্যবহার করত। কারও প্রতিবাদ করারও সুযোগ ছিল না। দু-একজন প্রতিবাদ করলেও পরবর্তীকালে তাদের ও তাদের পরিবারকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করেছে সে। এমনকি ভুঁইফোড় পত্রিকা ও সাংবাদিক দিয়ে চরিত্র হনন করে নিউজ করারও হুমকি দিয়েছে। উত্তরা পশ্চিম থানায় ফরমালি অভিযোগ করতে চাইলেও পারেনি। তার কাছে অনেক বড় বড় মানুষ আসতেন। তাই ভয়ে কেউ কিছু না বলে অনেক দিনের পাওনা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠান ছেড়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক তরুণী বলেন, শুধু কোম্পানিতে কাজ করতেন এমন তরুণীরাই নয়, সাহেদের অফিসে অনেক উঠতি বয়সী তরুণীদের আসা-যাওয়া ছিল। যাদের বেশির ভাগকেই আমরা চিনতাম না। এসব দেখেও না দেখে থাকতে হতো আমাদের। সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তার স্ত্রীও তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ছিলেন বলে জানান এই তরুণী।

তিনি বলেন, গণমাধ্যমে সাহেদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে অনেক মেয়ের নাম আসছে। এদের অনেকের সঙ্গে আসলেই সাহেদ ঘনিষ্ঠ ছিল। এটা সত্য। তবে তার চেয়েও বড় সত্য হল, তাদের ঘনিষ্ঠ না হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। কারণ সাহেদের জালে কেউ একবার আটকা পড়লে বের হতে পারত না। তাই এখনও তারা চুপ আছেন।

উত্তরায় সাহেদের প্রতিষ্ঠানে ৪ বছর কাজ করেছেন এমন একজন জানান, তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছি। আমরা এমন একটা অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছি বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। কারণ আমরা দেখেছি, সাহেদ কি করতে পারে। সে কতটা ভয়াবহ কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। সে বিভিন্ন সময় নিজেকে একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট বলে হুঙ্কার দিত।

বলত, বাংলাদেশ সরকার চাইলেও তাকে কিছু করতে পারবে না। তার কিছু হলে বাইরে থেকে চাপ আসবে। এছাড়া বিভিন্ন বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি দেখিয়ে বলত, কেউ তার কিছুই করতে পারবে না। থানায় গিয়ে লাভ নেই। সেখানে তিনি যা বলবেন তাই হবে। তাই ভয়েও কেউ কখনও প্রতিবাদ করেনি।

তার প্রতিষ্ঠানের আরেক কর্মকর্তার আশঙ্কা সাহেদ গ্রেফতার হলেও আবার বের হয়ে যাবেন। তার ভাষ্য, ‘সাহেদ সব পারেন।’ তিনি আশঙ্কা করছেন, এখন একটু বিপদে থাকলেও সাহেদ জেল থেকে বের হয়ে যারা তার নামে কথা বলছেন তাদের সবাইকে ধরবেন। তাই এ অবস্থায় তারা কেউ কথা বলতে চাচ্ছেন না। তিনি বলেন, এমন কোনো অপকর্ম নেই সাহেদ করেননি। এরপরও বীরদর্পে চলেছেন। কেউ তাকে কিছু বলতে পারেননি। অনেককে অফিসে নিয়ে নির্যাতন করেছেন। টুঁ শব্দটিও করার সুযোগ ছিল না কারও। এতেই তো বোঝা যায় সে কতটা প্রভাবশালী।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম যুগান্তরকে বলেন, সাহেদের অপকর্ম উদ্ঘাটনের পর অসংখ্য অভিযোগ আমাদের কাছে আসছে। এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ৫৭টি মামলার খবর পেয়েছি। এতটা ভয়ংকর প্রতারক ছিল সে, ভাবাও যায় না। তিনি প্রতারিতদের আশ্বস্ত করে বলেন, আপনাদের অভিযোগ আমাদের জানান। নাম প্রকাশ করতে না চাইলে, গোপন করেই জানান। ভয়ের কিছু নেই। অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। আইনের আওতায় সাহেদকে আসতেই হবে।

প্রযুক্তির বাইরে থেকে গ্রেফতার এড়ানোর চেষ্টা : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, প্রযুক্তির বাইরে থেকে ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করে গ্রেফতার এড়ানোর চেষ্টা করছে এই প্রতারক। মুঠোফোন বন্ধ করে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার থেকেও বিরত আছে। ফলে প্রযুক্তি কাজে লাগিয়েও তাকে গ্রেফতারে বেগ পেতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘তাকে আসলে ট্রেস করা যাচ্ছে না। নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।’ সাহেদের পাসপোর্ট জব্দের বিষয়ে তিনি বলেন, ভারতে প্রবেশের জন্য ‘মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা’ নেয়া ছিল সাহেদের। এছাড়া থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের ভিসাও ছিল তার।

র‌্যাবের মুখপাত্র এবং আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তাকে গ্রেফতারে আমরা প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছি।

সাহেদের দুর্নীতির অনুসন্ধানে দুদক : এদিকে সাহেদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সোমবার কমিশন এ সিদ্ধান্ত নেয় বলে যুগান্তরকে নিশ্চিত করেছেন দুদক পরিচালক প্রণব কুমার ভট্টাচার্য। জানা যায়, আয়কর ফাঁকি, ভুয়া নাম ও পরিচয়ে ব্যাংক ঋণ নিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের বিষয়টি আমলে নিয়েছে দুদক। কমিশনের বিশেষ তদন্ত অনুবিভাগের মাধ্যমে এই অভিযোগটি অনুসন্ধান করা হবে বলে জানা যায়। দুদকের উপপরিচালক মো. আবু বকর সিদ্দিকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম এ কাজ পরিচালনা করবে। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন- সহকারী পরিচালক মো. নেয়ামুল হাসান গাজী ও শেখ মো. গোলাম মাওলা।

চট্টগ্রামে অর্থ আত্মসাৎ মামলা : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, সাহেদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়েছে। সোমবার বিকালে নগরীর ডবলমুরিং থানায় মামলাটি করেন মো. সাইফুদ্দিন নামে এক ব্যক্তি। মামলায় ২ নম্বর আসামি করা হয়েছে শহীদুল্লাহ (৬০) নামে সাহেদের এক সহযোগীকে। পুলিশ জানায়, মামলার এজাহারে চট্টগ্রামের মেগা মোটর্সের মালিক জিয়াউদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ৯১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।

সাহেদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা : সোমবার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. মইনুল ইসলাম অর্থ আত্মসাতের দুই মামলায় সাহেদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকার মাসুদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. সাইফুল্লাহ মাসুদ তিন কোটি ৬৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ওই মামলা দুটি করেন। সাহেদের বিরুদ্ধে জারি করা পরোয়ানা আগামী ১৩ আগস্টের মধ্যে কার্যকর করতে আদালত উত্তরা পশ্চিম থানার ওসিকে আদেশ দিয়েছেন।

ঘটনাপ্রবাহ : রিজেন্ট গ্রুপ চেয়ারম্যান সাহেদ কাণ্ড

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত