সাভারের ট্যানারি বর্জ্যে দূষিত ছয় নদনদীর পানি

  মনির হোসেন, ঢাকা ও মতিউর রহমান ভাণ্ডারী, সাভার ৩০ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্যে আশপাশের ছয় নদ-নদীর পানি মারাত্মক দূষিত হয়ে পড়ছে। ট্যানারির বর্জ্যে এসব নদ-নদীর পানিতে প্রচুর দুর্গন্ধ সৃষ্টি হচ্ছে। নদী পার ও আশপাশের মানুষজনের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে।

চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্যে বংশী, ধলেশ্বরী, কালীগঙ্গা, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদের পানি দূষিত হচ্ছে। এর মধ্যে বংশী ও ধলেশ্বরীর পানি সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে। এ দুই নদীর সঙ্গে অন্য চার নদ-নদীর সংযোগ থাকায় সেগুলোর পানিও দূষিত হচ্ছে।

এসব নদীতে মাছ নেই বললেই চলে, জলজ উদ্ভিদের অস্তিত্বও বিপন্ন। নদী পারের স্বল্প আয়ের মানুষের জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাতাসেও বর্জ্যরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। চারপাশের পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। দূষিত পানি ব্যবহার করে অনেকে চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হচ্ছেন।

এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমান বলেন, মানুষের সচেতনতা এবং সরকারি সমন্বি^ত উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু নদী দূষণ তথা পরিবেশ বিপর্যয় কমানো সম্ভব। এ বিষয়ে সরকার শিগগিরই উদ্যোগ নেবে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বর্ষা ও বন্যার কারণে পানির দূষণ কম দেখা যাচ্ছে। ট্যানারির বর্জ্য সরাসরি পড়ছে বংশী নদে। এখান থেকে ধলেশ্বরীতে যাচ্ছে। এর সঙ্গে বাকি চার নদ-নদীর সংযোগস্থল পর্যন্ত পানিও ঘোলাটে। ভরা বর্ষায়ও নদীতে কোনো মাছ নেই। মাছ ধরতে কারও দেখা মেলেনি।

আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষার কারণে পানিতে দুর্গন্ধ কম। পানির রংও অনেকটা স্বাভাবিক। তারা জানান, বর্ষার পরই পানি কালো হয়ে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। দুর্গন্ধে অনেকের শ্বাসকষ্ট হয়। চর্মরোগও দেখা দেয়। আগে এগুলোর প্রকোপ ছিল না।

সূত্র জানায়, শিল্পনগরীতে ১৫৫টি কারখানা কার্যক্রম শুরু করেছে। কারখানায় তরল, কঠিন ও বায়বীয় তিন ধরনের বর্জ্য উৎপন্ন হয়। প্রতিদিন যে পরিমাণ তরল বর্জ্য উৎপন্ন হয় সেগুলো পরিশোধনের ব্যবস্থা নেই। এগুলো পরিশোধনের জন্য কমপক্ষে দুটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) স্থাপনের প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু একটি স্থাপন করা হয়েছে। তরল বর্জ্য শোধনাগার সিইটিপি সার্বক্ষণিক সচল থাকে না। এছাড়া নতুন নতুন কারখানা চালু হওয়ায় চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা বেড়েছে। ফলে বর্জ্যরে পরিমাণও বেড়েছে। কিন্তু একটি সিইটিপি দিয়ে সব বর্জ্য পরিশোধন করা সম্ভব হচ্ছে না।

এগুলো কারখানা থেকে বিভিন্ন নালা দিয়ে পাশের ধলেশ্বরীতে গিয়ে পড়ছে। এর মধ্যে আছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ক্রোমিয়াম, ক্লোরিন, নাইট্রিক অক্সসাইড, সালফিউরিক এসিড, কার্বনসহ নানা রাসায়নিক দ্রব্য। যা মানবদেহে শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সার, চর্মরোগের সৃষ্টি করে।

কঠিন বর্জ্যরে মধ্যে রয়েছে- চামড়ার ফেলনা অংশ। এছাড়া পশুর খুর, নখ, কান, লেজ, শিং, হাড়, লোম, মাংসের ঝিল্লি ইত্যাদি। ডাম্পিং ইয়ার্ডে এগুলো ফেলা হয়। মাত্র ছয় একর জমিতে ডাম্পিং ইয়ার্ড করা হয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য।

ফলে ডাম্পিং ইয়ার্ড উপচে কঠিন বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে রাস্তায় ও নদীতে। পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে চারদিকে। এগুলোতে থাকে নানা রাসায়নিক দ্রব্য। চামড়া পরিশোধন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত রাসায়নিক দ্রব্যের কিছু অংশ বায়বীয় পদার্থে রূপ নেয়। এগুলো বাতাসে ছড়িয়ে দুর্গন্ধ সৃষ্টির পাশাপাশি বাতাসকে দূষিত করে।

সরেজমিন চামড়া শিল্পনগরীর পাশে বংশী ও অদূরে ধলেশ্বরীর আশপাশ ঘুরে দেখা গেছে, পোশাক কারখানা ও ট্যানারির বর্জ্যে পানির রং কালো ঘুটঘুটে। বংশী ও ধলেশ্বরী নদ-নদী দূষণের ৮০ শতাংশই হচ্ছে ট্যানারির বর্জ্যে। বাকি ২০ শতাংশ হচ্ছে অন্যান্য শিল্প বর্জ্যে।

স্থানীয়রা জানান, শিল্পনগরী থেকে মাটির নিচ দিয়ে শতাধিক প্লাস্টিকের পাইপের মাধ্যমে বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। নদী তীরের বাসিন্দা তমিজ উদ্দিন (৬০) বলেন, শুধু মাছ ধরা নয়, প্রয়োজনীয় অনেক কাজে ৫ বছর আগেও নদীর পানি ব্যবহার করতেন সবাই।

এখন নদীর পানি কোনো কিছুতেই ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। এমন কি গরুকেও গোসল করানো যায় না। ধলেশ্বরী নদীর পানি আগে কেমন ছিল জানতে চাইলে নদী পারের বাসিন্দা কলিম উদ্দিন শেখের চোখ ঝাপসা হয়ে উঠে। বয়োবৃদ্ধ কলিম শেখ জানান, পানি আগে এতটাই স্বচ্ছ ছিল যে, নদীতলার বালি দেখা যেত।

চিতল ও ফলি মাছ ধরতে নদীর এক মাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত নৌকা নিয়ে ছুটতাম। আগে অগণিত জেলে সারা বছর মাছ ধরেও শেষ করতে পারত না। এখন তো নদীতে মাছও নেই, জেলেপাড়াও নেই। আছে শুধু দখলদারদের বড় বড় কারখানা।

টঙ্গীর তুরাগ নদে অন্য সব শিল্প বর্জ্যরে সঙ্গে ট্যানারির বর্জ্যও আসছে। টঙ্গীর মাজুখান এলাকা দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের পানিতে তীব্র দুর্গন্ধ। খালের পানির দুর্গন্ধে ট্রেন বা বাসযাত্রীদের বমি আসে। মাজুখান হয়ে ট্রেনে প্রায়ই নরসিংদীতে যাতায়াত করেন মো. সোলায়মান।

তিনি জানান, বর্ষার ২ মাস ছাড়া বাকি পুরো বছর খালের পানিতে এত দুর্গন্ধ থাকে যে নাকে রুমাল দিয়ে চলাচল করতে হয়। যারা নতুন যাতায়াত করেন তাদের অনেককেই বমি করতে দেখা যায়।

এ বিষয়ে পরিবেশবাদীরা বলেছেন, বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে সরকার চামড়া শিল্প নগরী সাভারে নিয়েছে। কিন্তু তদারকি ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না করায় এখন সাভার ও আশপাশের ছয়টি নদীর পানি দূষিত হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদফতরও নির্বিকার। মাঝে-মধ্যে শুধু দু-একটি চিঠি ইস্যু করেই দায়িত্ব শেষ করছে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হুমায়ন কবির বলেন, পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষে যতটুকু ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব, তা করা হচ্ছে।

নদী রক্ষায় শিগগিরই প্রকল্প গ্রহণ করা হবে, দূষণে দায়ী এমন প্রমাণ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। দোষী কাউকেও ছাড় দেয়া হবে না।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, শিল্পনগরী স্থাপনের সময়ে পরিকল্পনায় ত্রুটি ছিল। হাজারীবাগের কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে।

কিন্তু নতুন কারখানা হলে উৎপাদন বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। ফলে বর্জ্য বেশি হচ্ছে। এগুলো পরিশোধন করা যাচ্ছে না। ডাম্পিং ওয়ার্ডেও জায়গা হচ্ছে না।

চামড়া শিল্প নগরীর প্রকল্প পরিচালক জিতেন্দ্র নাথ পাল যুগান্তরকে বলেন, রাজধানীর হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্পে যে উৎপাদন ছিল ওই হিসাব অনুযায়ী সাভারের শিল্প নগরীর নকশা করে সিইটিপি স্থাপন করা হয়েছে।

বর্তমানে প্রায় সব কারখানাই আগের তুলনায় উৎপাদন তিন থেকে পাঁচ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বর্জ্য বেশি উৎপন্ন হচ্ছে। এ কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ সমস্যা সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত