অস্তিত্ব সংকটে তাঁতশিল্প
jugantor
করোনা ও বন্যার থাবা
অস্তিত্ব সংকটে তাঁতশিল্প
চার মাসে টাঙ্গাইল শাড়ির ক্ষতি ৩০০ কোটি টাকা

  জাফর আহমেদ, টাঙ্গাইল  

১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস ও সাম্প্রতিক বন্যায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। গত ২৬ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত করোনায় এ শিল্পে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে নয়া দুর্যোগ বন্যা তাঁতশিল্পে হানা দিয়েছে। বন্যায় তাঁত, কাপড়, তানা ও সরঞ্জামাদিসহ সব কিছু ভাসিয়ে দিয়েছে। প্রায় দেড় মাস জলাবদ্ধতা থাকায় এ শিল্পের কাঁচামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাঁত বোর্ডের ক্ষুদ্রঋণ তাঁতিদের ভাগ্য উন্নয়নে তেমন প্রভাব ফেলছে না। ফলে জীবিকার প্রয়োজনে তাঁতিরা পৈতৃক পেশা বদলাতে গিয়েও খাপ খাইয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ শিল্প রক্ষায় সুদমুক্ত ঋণ ও বাজার সৃষ্টিতে সরকারের জোরালো ভূমিকার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঈদুল ফিতর থেকে টাঙ্গাইল শাড়ির মন্দাভাব শুরু হয়েছে। তাঁত ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ছিল রোজার ঈদের ক্ষতি কোরবানে পুষিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হয়নি। করোনার কারণে টাঙ্গাইল শাড়ি বিদেশে রফতানি গত চার মাস ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া লকডাউনের কারণে ঢাকাসহ দোকানপাট, শপিংমল দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকায় তাঁতের শাড়ির বাজার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। কিন্তু লকডাউন তুলে নেয়ার পরেও কেনাকাটায় ক্রেতাদের তেমন আগ্রহ না থাকায় ব্যবসা আর আগের পর্যায়ে যেতে পারছে না। ফলে অনেক টাঙ্গাইল শাড়ির ব্যবসায়ীদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।

জানা গেছে, বাতাঁবো’র বাজিতপুর ও বল্লা এ দুটি বেসিক সেন্টারের ৪৯টি প্রাথমিক তাঁতি সমিতি এবং চারটি মাধ্যমিক তাঁতি সমিতি রয়েছে। এসব সমিতির চার হাজার ৩৯১টি তাঁত কারখানা মালিকের ২৭ হাজার ৯৩১টি তাঁত চালু এবং দুই হাজার ৬৭৩টি তাঁত আগে থেকেই বন্ধ রয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে গত ২৬ মার্চ থেকে চালু তাঁত কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে জেলার তাঁতশিল্পে প্রতিদিন গড়ে এক কোটি ৮৭ লাখ ৫৬ হাজার ৪০০ টাকা ক্ষতি হয়। এ পর্যন্ত ২৫০ কোটি ৭১ লাখ ১৩ হাজার ২০০ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া টাঙ্গাইল শাড়ি বিদেশে রফতানি করতে না পারায় আরও প্রায় ৫০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে টাঙ্গাইল শাড়ির ব্যবসায়ীদের।

করোনা মহামারীর সঙ্গে বন্যার করাল থাবা জেলার তাঁতশিল্পকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে। করোনায় বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাতে তাঁত মালিকদের পুঁজি নষ্ট হচ্ছে। এর সঙ্গে বন্যার পানি এসে কারখানাতে চালু তাঁত, তাঁতে থাকা সুতার ভিম, কাপড় ও সরঞ্জামাদি প্রায় সবই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাঁতশিল্পের ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।

টাঙ্গাইল শাড়ির রাজধানী পাথরাইলের শাড়ি প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ী নীল কমল বসাক জানান, করোনা ও বন্যায় তাঁতশিল্পের মহাক্ষতি হয়েছে। সরকারি প্রণোদনার পাশাপাশি তাঁত শাড়ির বাজার তৈরিতেও সরকারের ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তিনি।

টাঙ্গাইল জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খান আহমেদ শুভ জানান, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ শিল্প আদৌ থাকবে কি-না সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকার ঘোষিত প্রণোদনা না পেলে তাঁতিরা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোংয়ের মালিক রঘুনাথ বসাক জানান, করোনা মহামারী ও বন্যার ভয়াবহ দুর্যোগে জেলার তাঁতশিল্পে স্থবিরতা নেমে এসেছে। সুদমুক্ত ঋণ, প্রণোদনা, নতুন বাজার তৈরি, বিদেশ থেকে শাড়ি আমদানি বন্ধের দাবি জানান তিনি।

টাঙ্গাইল সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মোফাখখারুল ইসলাম জানান, তাঁত মালিক ও এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় দেড় লাখ মানুষ কর্মহীন অবস্থায় সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। যারা একসময় দান-অনুদান বিতরণ করেছে, তারাও এখন নিজেদের পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।

করোনা ও বন্যার থাবা

অস্তিত্ব সংকটে তাঁতশিল্প

চার মাসে টাঙ্গাইল শাড়ির ক্ষতি ৩০০ কোটি টাকা
 জাফর আহমেদ, টাঙ্গাইল 
১০ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাস ও সাম্প্রতিক বন্যায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। গত ২৬ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত করোনায় এ শিল্পে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে নয়া দুর্যোগ বন্যা তাঁতশিল্পে হানা দিয়েছে। বন্যায় তাঁত, কাপড়, তানা ও সরঞ্জামাদিসহ সব কিছু ভাসিয়ে দিয়েছে। প্রায় দেড় মাস জলাবদ্ধতা থাকায় এ শিল্পের কাঁচামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাঁত বোর্ডের ক্ষুদ্রঋণ তাঁতিদের ভাগ্য উন্নয়নে তেমন প্রভাব ফেলছে না। ফলে জীবিকার প্রয়োজনে তাঁতিরা পৈতৃক পেশা বদলাতে গিয়েও খাপ খাইয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ শিল্প রক্ষায় সুদমুক্ত ঋণ ও বাজার সৃষ্টিতে সরকারের জোরালো ভূমিকার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঈদুল ফিতর থেকে টাঙ্গাইল শাড়ির মন্দাভাব শুরু হয়েছে। তাঁত ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ছিল রোজার ঈদের ক্ষতি কোরবানে পুষিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হয়নি। করোনার কারণে টাঙ্গাইল শাড়ি বিদেশে রফতানি গত চার মাস ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া লকডাউনের কারণে ঢাকাসহ দোকানপাট, শপিংমল দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকায় তাঁতের শাড়ির বাজার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। কিন্তু লকডাউন তুলে নেয়ার পরেও কেনাকাটায় ক্রেতাদের তেমন আগ্রহ না থাকায় ব্যবসা আর আগের পর্যায়ে যেতে পারছে না। ফলে অনেক টাঙ্গাইল শাড়ির ব্যবসায়ীদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।

জানা গেছে, বাতাঁবো’র বাজিতপুর ও বল্লা এ দুটি বেসিক সেন্টারের ৪৯টি প্রাথমিক তাঁতি সমিতি এবং চারটি মাধ্যমিক তাঁতি সমিতি রয়েছে। এসব সমিতির চার হাজার ৩৯১টি তাঁত কারখানা মালিকের ২৭ হাজার ৯৩১টি তাঁত চালু এবং দুই হাজার ৬৭৩টি তাঁত আগে থেকেই বন্ধ রয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে গত ২৬ মার্চ থেকে চালু তাঁত কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে জেলার তাঁতশিল্পে প্রতিদিন গড়ে এক কোটি ৮৭ লাখ ৫৬ হাজার ৪০০ টাকা ক্ষতি হয়। এ পর্যন্ত ২৫০ কোটি ৭১ লাখ ১৩ হাজার ২০০ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া টাঙ্গাইল শাড়ি বিদেশে রফতানি করতে না পারায় আরও প্রায় ৫০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে টাঙ্গাইল শাড়ির ব্যবসায়ীদের।

করোনা মহামারীর সঙ্গে বন্যার করাল থাবা জেলার তাঁতশিল্পকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে। করোনায় বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাতে তাঁত মালিকদের পুঁজি নষ্ট হচ্ছে। এর সঙ্গে বন্যার পানি এসে কারখানাতে চালু তাঁত, তাঁতে থাকা সুতার ভিম, কাপড় ও সরঞ্জামাদি প্রায় সবই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাঁতশিল্পের ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।

টাঙ্গাইল শাড়ির রাজধানী পাথরাইলের শাড়ি প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ী নীল কমল বসাক জানান, করোনা ও বন্যায় তাঁতশিল্পের মহাক্ষতি হয়েছে। সরকারি প্রণোদনার পাশাপাশি তাঁত শাড়ির বাজার তৈরিতেও সরকারের ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তিনি।

টাঙ্গাইল জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খান আহমেদ শুভ জানান, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ শিল্প আদৌ থাকবে কি-না সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকার ঘোষিত প্রণোদনা না পেলে তাঁতিরা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোংয়ের মালিক রঘুনাথ বসাক জানান, করোনা মহামারী ও বন্যার ভয়াবহ দুর্যোগে জেলার তাঁতশিল্পে স্থবিরতা নেমে এসেছে। সুদমুক্ত ঋণ, প্রণোদনা, নতুন বাজার তৈরি, বিদেশ থেকে শাড়ি আমদানি বন্ধের দাবি জানান তিনি।

টাঙ্গাইল সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মোফাখখারুল ইসলাম জানান, তাঁত মালিক ও এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় দেড় লাখ মানুষ কর্মহীন অবস্থায় সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। যারা একসময় দান-অনুদান বিতরণ করেছে, তারাও এখন নিজেদের পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।