ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা
jugantor
দফায় দফায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমি
ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা

  মাহবুব রহমান, রংপুর  

২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এবার বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কৃষিজমির। বারবার চেষ্টা করেও এ ক্ষতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা। এ নিয়ে চতুর্থ দফায় বন্যার শিকার হলেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।

গত আগস্টে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর অনেক কৃষক তাদের জেগে ওঠা জমিতে ধান, তিল, বাদাম, মাসকলাই, শাকসবজি আবাদ করেছেন। তবে গত ৩-৪ দিন ধরে ধরলা, বহ্মপুত্র, তিস্তা, ঘাঘট, দুধকুমার, করতোয়াসহ বিভিন্ন নদীতে পানি বাড়তে থাকে। ফলে ফের ডুবেছে কৃষকের ফসল। একের পর এক বন্যায় ফসল হারিয়ে চরাঞ্চলের কৃষক এখন সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে।

জানা গেছে, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারীসহ রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার নদনদীতে পানি বেড়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদীর কূল উপচে চরের জমিতে সদ্য রোপণকৃত আমন ধানের ক্ষেত তলিয়ে গেছে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দফা বন্যায় রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তালিকাভুক্ত কৃষকের সংখ্যা ১ লাখ ৭২ হাজার ৭৯ জন। পানিতে তলিয়ে যাওয়া ২৫ হাজার ৭৫৯ হেক্টর জমির মধ্যে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে ১৪ হাজার ৪৪৬ হেক্টর জমির আবাদ। আর আংশিক ক্ষতি হয়েছে ৯ হাজার ৫০৫ হেক্টরের ফসল।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাট। এ অঞ্চলের ৬ হাজার ৪৪২ দশমিক ৭৭ হেক্টর জমির পাট নষ্ট হয়ে গেছে। ৩৬ হাজার ১৮৩ জন কৃষকের ৪ হাজার ৫৯৭ দশমিক ৬৩ হেক্টর জমির আউশ আবাদ ও ১ হাজার ২৪৪ দশমিক ২ হেক্টর জমির শাকসবজি নষ্ট হয়ে গেছে।

এ ছাড়া আমনের ১ হাজার ২৬৫ দশমিক ৭৮ হেক্টর জমির বীজতলা, ১১০ দশমিক ৭৪ হেক্টর জমির রোপা আমন, ২৮ দশমিক ৫ হেক্টর জমির ভুট্টা, ২০৫ হেক্টর জমির মরিচ, ৩৭৮ দশমিক ৫ হেক্টর জমির তিল, ৩০ দশমিক ৬ হেক্টর জমির চীনাবাদাম এবং ২০ হেক্টর জমির ১৮ লাখ টাকার কাউনের ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।

এদিকে এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলার কৃষকরা। বিস্তীর্ণ মাঠে এখন বন্যার দগদগে ক্ষত। নষ্ট হওয়া আমন লাগানো নিয়ে দুশ্চিন্তা সবচেয়ে বেশি। চড়া সুদে টাকা লগ্নি নিলেও মিলছে না বীজ, পেলেও দাম লাগামহীন। হতাশ কৃষকের সামনে এখন ঘনঘোর অন্ধকার। কীভাবে চলবে জীবন, চোখেমুখে অনিশ্চিত জীবন-জীবিকার ছাপ তাদের।

রংপুরের গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারীর মহিপুরের কৃষক আনারুল ইসলাম জানান, চার বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছিলাম। কিন্তু বন্যায় সব শেষ। ১ হাজার টাকা সুদের ওপর নিয়ে কিছু চারা কিনে খোসা দেয়ার চেষ্টা করছি। আরও আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা লাগবে চারা কিনতে। সুদের ওপর টাকা খুঁজছি। কিন্তু এখনও পাইনি। টাকা পেলেও বাজারে চারা পাওয়া যাচ্ছে না। যদি ধান লাগাতে না পারি, তাহলে খাবার নিয়ে খুব সমস্যায় পড়তে হবে।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার হরিশ্বর গনাই গ্রামের মহসীন আলী বলেন, ‘গত জুলাই-আগস্টের বন্যায় ২ বিঘা জমির ধান তলিয়ে যাওয়ায় আমার অনেক ক্ষতি হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার পর এক সপ্তাহ হল ঋণ করে টাকা এনে ওই জমিতে আবার ধান রোপণ করেছিলাম। আরও এক বিঘা জমিতে বেগুন গাছ লাগিয়েছিলাম। কিন্তু তিন দিনে পানি বেড়ে জমিতে সদ্য লাগানো ধানগাছ তলিয়ে গেছে।’

গঙ্গাচড়ার মহিপুর এসকেএস এলাকার কৃষক সাব্বির আলী জানান, মহাজনরাও সুদ দিতে চাইছেন না। কারণ, শোধ করতে পারব না। আবাদ শেষ। জমি এবার শুকনায় পড়ে থাকবে।

পীরগাছার তাম্বুলপুরের চরের কৃষক আমজাদ আলী জানান, আমরা জানি না সরকার চারা কিংবা টাকা দিতেছে। বন্যায় সব আবাদ শেষ হয়ে গেল। কৃষি বিভাগের লোকজন কোনো দিন আমাদের কাছে আসেনি। খোঁজও নেয়নি।

লারমনিরহাটের আদিতমারীর কমলাবাড়ি গ্রামের আহমদ আলী বলেন, বন্যায় ফসল সব নষ্ট হলেও এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো লোক আমাদের খোঁজ নেয়নি। বীজ বা অন্যান্য জিনিস দেয়া তো দূরের কথা।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান, এবারের বন্যায় দুই দফায় ১ লাখ ৭২ হাজার কৃষক এবং ১৭৩ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনের। প্রণোদনার মাধ্যমে কৃষকদের ক্ষতি পোষানোর। আমরা নাভি জাতের আমনের চারা করেছি ১২১ হেক্টর জমিতে। ৫০০টি ভাসমান চারা করেছি। সাড়ে ১০ হাজার কৃষককে শাকসবজির প্যাকেজ দিয়েছি।

মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কোনো গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দফায় দফায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমি

ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা

 মাহবুব রহমান, রংপুর 
২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এবার বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কৃষিজমির। বারবার চেষ্টা করেও এ ক্ষতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা। এ নিয়ে চতুর্থ দফায় বন্যার শিকার হলেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।

গত আগস্টে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর অনেক কৃষক তাদের জেগে ওঠা জমিতে ধান, তিল, বাদাম, মাসকলাই, শাকসবজি আবাদ করেছেন। তবে গত ৩-৪ দিন ধরে ধরলা, বহ্মপুত্র, তিস্তা, ঘাঘট, দুধকুমার, করতোয়াসহ বিভিন্ন নদীতে পানি বাড়তে থাকে। ফলে ফের ডুবেছে কৃষকের ফসল। একের পর এক বন্যায় ফসল হারিয়ে চরাঞ্চলের কৃষক এখন সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে।

জানা গেছে, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারীসহ রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার নদনদীতে পানি বেড়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদীর কূল উপচে চরের জমিতে সদ্য রোপণকৃত আমন ধানের ক্ষেত তলিয়ে গেছে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দফা বন্যায় রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তালিকাভুক্ত কৃষকের সংখ্যা ১ লাখ ৭২ হাজার ৭৯ জন। পানিতে তলিয়ে যাওয়া ২৫ হাজার ৭৫৯ হেক্টর জমির মধ্যে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে ১৪ হাজার ৪৪৬ হেক্টর জমির আবাদ। আর আংশিক ক্ষতি হয়েছে ৯ হাজার ৫০৫ হেক্টরের ফসল।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাট। এ অঞ্চলের ৬ হাজার ৪৪২ দশমিক ৭৭ হেক্টর জমির পাট নষ্ট হয়ে গেছে। ৩৬ হাজার ১৮৩ জন কৃষকের ৪ হাজার ৫৯৭ দশমিক ৬৩ হেক্টর জমির আউশ আবাদ ও ১ হাজার ২৪৪ দশমিক ২ হেক্টর জমির শাকসবজি নষ্ট হয়ে গেছে।

এ ছাড়া আমনের ১ হাজার ২৬৫ দশমিক ৭৮ হেক্টর জমির বীজতলা, ১১০ দশমিক ৭৪ হেক্টর জমির রোপা আমন, ২৮ দশমিক ৫ হেক্টর জমির ভুট্টা, ২০৫ হেক্টর জমির মরিচ, ৩৭৮ দশমিক ৫ হেক্টর জমির তিল, ৩০ দশমিক ৬ হেক্টর জমির চীনাবাদাম এবং ২০ হেক্টর জমির ১৮ লাখ টাকার কাউনের ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।

এদিকে এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলার কৃষকরা। বিস্তীর্ণ মাঠে এখন বন্যার দগদগে ক্ষত। নষ্ট হওয়া আমন লাগানো নিয়ে দুশ্চিন্তা সবচেয়ে বেশি। চড়া সুদে টাকা লগ্নি নিলেও মিলছে না বীজ, পেলেও দাম লাগামহীন। হতাশ কৃষকের সামনে এখন ঘনঘোর অন্ধকার। কীভাবে চলবে জীবন, চোখেমুখে অনিশ্চিত জীবন-জীবিকার ছাপ তাদের।

রংপুরের গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারীর মহিপুরের কৃষক আনারুল ইসলাম জানান, চার বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছিলাম। কিন্তু বন্যায় সব শেষ। ১ হাজার টাকা সুদের ওপর নিয়ে কিছু চারা কিনে খোসা দেয়ার চেষ্টা করছি। আরও আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা লাগবে চারা কিনতে। সুদের ওপর টাকা খুঁজছি। কিন্তু এখনও পাইনি। টাকা পেলেও বাজারে চারা পাওয়া যাচ্ছে না। যদি ধান লাগাতে না পারি, তাহলে খাবার নিয়ে খুব সমস্যায় পড়তে হবে।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার হরিশ্বর গনাই গ্রামের মহসীন আলী বলেন, ‘গত জুলাই-আগস্টের বন্যায় ২ বিঘা জমির ধান তলিয়ে যাওয়ায় আমার অনেক ক্ষতি হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার পর এক সপ্তাহ হল ঋণ করে টাকা এনে ওই জমিতে আবার ধান রোপণ করেছিলাম। আরও এক বিঘা জমিতে বেগুন গাছ লাগিয়েছিলাম। কিন্তু তিন দিনে পানি বেড়ে জমিতে সদ্য লাগানো ধানগাছ তলিয়ে গেছে।’

গঙ্গাচড়ার মহিপুর এসকেএস এলাকার কৃষক সাব্বির আলী জানান, মহাজনরাও সুদ দিতে চাইছেন না। কারণ, শোধ করতে পারব না। আবাদ শেষ। জমি এবার শুকনায় পড়ে থাকবে।

পীরগাছার তাম্বুলপুরের চরের কৃষক আমজাদ আলী জানান, আমরা জানি না সরকার চারা কিংবা টাকা দিতেছে। বন্যায় সব আবাদ শেষ হয়ে গেল। কৃষি বিভাগের লোকজন কোনো দিন আমাদের কাছে আসেনি। খোঁজও নেয়নি।

লারমনিরহাটের আদিতমারীর কমলাবাড়ি গ্রামের আহমদ আলী বলেন, বন্যায় ফসল সব নষ্ট হলেও এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো লোক আমাদের খোঁজ নেয়নি। বীজ বা অন্যান্য জিনিস দেয়া তো দূরের কথা।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান, এবারের বন্যায় দুই দফায় ১ লাখ ৭২ হাজার কৃষক এবং ১৭৩ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনের। প্রণোদনার মাধ্যমে কৃষকদের ক্ষতি পোষানোর। আমরা নাভি জাতের আমনের চারা করেছি ১২১ হেক্টর জমিতে। ৫০০টি ভাসমান চারা করেছি। সাড়ে ১০ হাজার কৃষককে শাকসবজির প্যাকেজ দিয়েছি।

মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কোনো গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।