২৪ বছর একা প্রবীণ নিবাসে
jugantor
দোষ দেন না ছেলেমেয়েদের
২৪ বছর একা প্রবীণ নিবাসে

  হামিদ-উজ-জামান  

০১ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অধ্যক্ষ মুজিবুল হক (৮১)। এক সময় নিজের পরিবার, দেশ ও এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে কতই না স্বপ্ন বুনতেন তিনি। সেজন্য পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতা। অথচ এখন আর কোনো স্বপ্ন নেই। শুধু তিন বেলা ঠিকমতো খাবার হলেই খুশি। তিনি লালমাটিয়ার বার্ডস প্রি-ক্যাডেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেটিও অনেক দিন আগের কথা। তিনি গত ২৪টি বছর ধরে কাটাচ্ছেন একাকী জীবন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের প্রবীণ নিবাসে বুধবার কথা হয় এই শিক্ষকের সঙ্গে।

তিনি জানান, মাসিক ৮ হাজার টাকার বিনিময়ে থাকছেন এই নিবাসে। স্ত্রী মৃত্যুবরণ করার মধ্য দিয়ে তার একাকী জীবন শুরু। সন্তান রয়েছেন তিনজন। এক ছেলে ও দুই মেয়ে। তারা খোঁজখবর নেন মাঝেমধ্যেই। কিন্তু গত ৯ মাসে একবারও আসেননি কেউ। তবুও আক্ষেপ নেই। বলছেন আমার সন্তানরা সোনার সন্তান। ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় হয়তো আসতে পারছে না। ছুটির দিনে হয়তো নিজেদের কাজ করতেই সময় চলে যায়। তাই আসতে পারছে না।

এখানে কেন থাকেন জানতে চাইলে অধ্যক্ষ মুজিবুল হক বলেন, বড় মেয়ে শিক্ষকতা করেন, মেজো ছেলে চাকরি করেন রবিতে। আর ছোট মেয়ে পড়ালেখা করে। আমার সম্বল বলতে একটি অ্যাপার্টমেন্ট আছে। সেটিতেই থাকছে ওরা। ওরা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। তাই আমাকে বাসায় একাই থাকতে হয়। এ কারণেই এখানে এসেছি। ছেলেমেয়ে কেউ বিয়ে করেননি এখনও। আগে ঘন ঘন আসত। এখন কম আসে। প্রবীণ নিবাসের মাসিক ভাড়া ছোট ভাই দিয়ে দেন। এখানেই ভালো আছি।

কথার ফাঁকে তিনি জানান, ৩ মাস হল মোবাইল ফোন সেটটা নষ্ট হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে কেউ আসে না। তাই বলতেও পারি না। এর মধ্যে কেউ হয়তো একবার ফোনও করেনি। তাই তারা জানেও না আমার মোবাইল নেই। আগে অনেক টাকা আয় করেছি। ইংরেজি প্রাইভেট পড়াতাম। প্রচুর স্টুডেন্ট ছিল। চাকরি করেছি। বিভিন্ন ইংলিশ পত্রিকায় কলাম লিখেও অনেক আয় হতো। আমি কলামিস্ট ছিলাম। এখন আমি শূন্য।

তিনি বলেন, প্রথম যখন এখানে আসি, তখন থাকতে মন চাইত না। প্রতি সপ্তাহে বোনের বাসায় যেতাম। তারপর বোনের সঙ্গে বনাবনি হয়নি। যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। এখন তো কোনোদিন খোঁজও নিতে আসে না। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র ছিলাম। এখনও আর্ট করি। ছোট ভাই মাঝেমধ্যে ক্যানভাস আর রং দিয়ে যায়। সারাদিন ছোট্ট এই গণ্ডির মধ্যে হাঁটাচলা করি। টেলিভিশন দেখি। সময় পেরিয়ে যায়। তবে আল্লাহর রহমতে আমার তেমন কোনো অসুখ নেই। এখনও আমি ৮০ বছরের তরুণ। এই প্রবীণ ভবনটাই এখন ভালো লাগে। মাঝেমধ্যে গ্রামের বাড়ি যশোরের কথা খুব মনে পড়ে। ওই জায়গাটা আমাকে খুব টানে। যেতে মন চায়। যদিও সেখানে এখন কিছুই নেই। বাবা কাস্টমস অফিসার (সৎ) ছিলেন। তেমন কিছুই করতে পারেননি। যশোর শহরে বাড়ি ছিল। জমিজমা ছিল। সবই তার একমাত্র বোনকে রেজিস্ট্রি করে দিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। মায়ের গহনা ও জমানো টাকা দিয়ে ঢাকায় একটি বাড়ি করেছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর মা সেটিও বিক্রি করে দেন। মা অনেক স্বার্থপর ছিলেন। আগে বুঝিনি।

কথার ফাঁকে বলেন, হাত ও পায়ের নখ অনেক বড় হয়েছে। চুল-দাড়িও কাটাতে পারি না। বাড়ির লোকজন কেউ আসে না তো তাই। তারা এলে না হয় বলতাম এগুলো পরিষ্কার করে দিতে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, কত ছাত্র-ছাত্রী পড়িয়েছি। তারা এখন কোথায়? কারও কোনোদিন দেখা হল না। মাঝেমধ্যে জানতে ইচ্ছে করে ওরা (শিক্ষার্থীরা) কোথায় আছে, কেমন আছে, কী করছে। কত আত্মীয়স্বজন ছিল, বন্ধুবান্ধব ছিল। এখন কোনো স্বপ্ন নেই কেন? এর জবাবে তিনি বলেন, স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। স্বপ্ন পূরণ হবে কীভাবে? আমি বাস্তবতায় বিশ্বাস করি। এখন যেখানে আছি সেটিই বড় বাস্তবতা।

তবে একটি জিনিস মনে রাখতে হবে মানুষকে সম্মান দিলে সম্মান পাওয়া যায়। এখানকার অনেকেই প্রবীণদের সম্মান দিতে পারেন না। এতে অনেক কষ্ট পাই।

কথা হয় বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মো. আবদুল মান্নানের সঙ্গে। তিনি জানান, আগারগাঁওয়ের এই প্রবীণ ভবনে ৭০ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এখন মহিলা ও পুরুষ মিলে প্রায় ৪৫ জনের মতো আছেন। আমরা তাদের জন্য অনেক কিছুই করার চেষ্টা করি। কিন্তু ৫০ জনের ৫০ রকমের চাহিদা। সবগুলো তো মেটানো যায় না। কমন সমস্যাগুলোর সমাধান করা হয়। এতে হয়তো অনেকের সমস্যা হতে পারে। ওনারা কেউ কাউকে ছাড় দিতে চান না। পরিবার থেকে কষ্ট পেয়ে এখানে আসেন। তাই ওনারা মানসিকভাবে ক্ষুব্ধ থাকেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগামীকাল (আজ) বিশ্ব প্রবীণ দিবস। করোনাভাইরাসের কারণে এ বছর বড় কোনো আয়োজন নেই। তবে রেডিও-টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান থাকবে।

দোষ দেন না ছেলেমেয়েদের

২৪ বছর একা প্রবীণ নিবাসে

 হামিদ-উজ-জামান 
০১ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অধ্যক্ষ মুজিবুল হক (৮১)। এক সময় নিজের পরিবার, দেশ ও এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে কতই না স্বপ্ন বুনতেন তিনি। সেজন্য পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতা। অথচ এখন আর কোনো স্বপ্ন নেই। শুধু তিন বেলা ঠিকমতো খাবার হলেই খুশি। তিনি লালমাটিয়ার বার্ডস প্রি-ক্যাডেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেটিও অনেক দিন আগের কথা। তিনি গত ২৪টি বছর ধরে কাটাচ্ছেন একাকী জীবন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের প্রবীণ নিবাসে বুধবার কথা হয় এই শিক্ষকের সঙ্গে।

তিনি জানান, মাসিক ৮ হাজার টাকার বিনিময়ে থাকছেন এই নিবাসে। স্ত্রী মৃত্যুবরণ করার মধ্য দিয়ে তার একাকী জীবন শুরু। সন্তান রয়েছেন তিনজন। এক ছেলে ও দুই মেয়ে। তারা খোঁজখবর নেন মাঝেমধ্যেই। কিন্তু গত ৯ মাসে একবারও আসেননি কেউ। তবুও আক্ষেপ নেই। বলছেন আমার সন্তানরা সোনার সন্তান। ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় হয়তো আসতে পারছে না। ছুটির দিনে হয়তো নিজেদের কাজ করতেই সময় চলে যায়। তাই আসতে পারছে না।

এখানে কেন থাকেন জানতে চাইলে অধ্যক্ষ মুজিবুল হক বলেন, বড় মেয়ে শিক্ষকতা করেন, মেজো ছেলে চাকরি করেন রবিতে। আর ছোট মেয়ে পড়ালেখা করে। আমার সম্বল বলতে একটি অ্যাপার্টমেন্ট আছে। সেটিতেই থাকছে ওরা। ওরা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। তাই আমাকে বাসায় একাই থাকতে হয়। এ কারণেই এখানে এসেছি। ছেলেমেয়ে কেউ বিয়ে করেননি এখনও। আগে ঘন ঘন আসত। এখন কম আসে। প্রবীণ নিবাসের মাসিক ভাড়া ছোট ভাই দিয়ে দেন। এখানেই ভালো আছি।

কথার ফাঁকে তিনি জানান, ৩ মাস হল মোবাইল ফোন সেটটা নষ্ট হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে কেউ আসে না। তাই বলতেও পারি না। এর মধ্যে কেউ হয়তো একবার ফোনও করেনি। তাই তারা জানেও না আমার মোবাইল নেই। আগে অনেক টাকা আয় করেছি। ইংরেজি প্রাইভেট পড়াতাম। প্রচুর স্টুডেন্ট ছিল। চাকরি করেছি। বিভিন্ন ইংলিশ পত্রিকায় কলাম লিখেও অনেক আয় হতো। আমি কলামিস্ট ছিলাম। এখন আমি শূন্য।

তিনি বলেন, প্রথম যখন এখানে আসি, তখন থাকতে মন চাইত না। প্রতি সপ্তাহে বোনের বাসায় যেতাম। তারপর বোনের সঙ্গে বনাবনি হয়নি। যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। এখন তো কোনোদিন খোঁজও নিতে আসে না। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্র ছিলাম। এখনও আর্ট করি। ছোট ভাই মাঝেমধ্যে ক্যানভাস আর রং দিয়ে যায়। সারাদিন ছোট্ট এই গণ্ডির মধ্যে হাঁটাচলা করি। টেলিভিশন দেখি। সময় পেরিয়ে যায়। তবে আল্লাহর রহমতে আমার তেমন কোনো অসুখ নেই। এখনও আমি ৮০ বছরের তরুণ। এই প্রবীণ ভবনটাই এখন ভালো লাগে। মাঝেমধ্যে গ্রামের বাড়ি যশোরের কথা খুব মনে পড়ে। ওই জায়গাটা আমাকে খুব টানে। যেতে মন চায়। যদিও সেখানে এখন কিছুই নেই। বাবা কাস্টমস অফিসার (সৎ) ছিলেন। তেমন কিছুই করতে পারেননি। যশোর শহরে বাড়ি ছিল। জমিজমা ছিল। সবই তার একমাত্র বোনকে রেজিস্ট্রি করে দিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। মায়ের গহনা ও জমানো টাকা দিয়ে ঢাকায় একটি বাড়ি করেছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর মা সেটিও বিক্রি করে দেন। মা অনেক স্বার্থপর ছিলেন। আগে বুঝিনি।

কথার ফাঁকে বলেন, হাত ও পায়ের নখ অনেক বড় হয়েছে। চুল-দাড়িও কাটাতে পারি না। বাড়ির লোকজন কেউ আসে না তো তাই। তারা এলে না হয় বলতাম এগুলো পরিষ্কার করে দিতে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, কত ছাত্র-ছাত্রী পড়িয়েছি। তারা এখন কোথায়? কারও কোনোদিন দেখা হল না। মাঝেমধ্যে জানতে ইচ্ছে করে ওরা (শিক্ষার্থীরা) কোথায় আছে, কেমন আছে, কী করছে। কত আত্মীয়স্বজন ছিল, বন্ধুবান্ধব ছিল। এখন কোনো স্বপ্ন নেই কেন? এর জবাবে তিনি বলেন, স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। স্বপ্ন পূরণ হবে কীভাবে? আমি বাস্তবতায় বিশ্বাস করি। এখন যেখানে আছি সেটিই বড় বাস্তবতা।

তবে একটি জিনিস মনে রাখতে হবে মানুষকে সম্মান দিলে সম্মান পাওয়া যায়। এখানকার অনেকেই প্রবীণদের সম্মান দিতে পারেন না। এতে অনেক কষ্ট পাই।

কথা হয় বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মো. আবদুল মান্নানের সঙ্গে। তিনি জানান, আগারগাঁওয়ের এই প্রবীণ ভবনে ৭০ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এখন মহিলা ও পুরুষ মিলে প্রায় ৪৫ জনের মতো আছেন। আমরা তাদের জন্য অনেক কিছুই করার চেষ্টা করি। কিন্তু ৫০ জনের ৫০ রকমের চাহিদা। সবগুলো তো মেটানো যায় না। কমন সমস্যাগুলোর সমাধান করা হয়। এতে হয়তো অনেকের সমস্যা হতে পারে। ওনারা কেউ কাউকে ছাড় দিতে চান না। পরিবার থেকে কষ্ট পেয়ে এখানে আসেন। তাই ওনারা মানসিকভাবে ক্ষুব্ধ থাকেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগামীকাল (আজ) বিশ্ব প্রবীণ দিবস। করোনাভাইরাসের কারণে এ বছর বড় কোনো আয়োজন নেই। তবে রেডিও-টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান থাকবে।