জাতীয় গ্রন্থনীতির সংশোধন এখনও খসড়াতেই
jugantor
জাতীয় গ্রন্থনীতির সংশোধন এখনও খসড়াতেই
দিকনির্দেশনা না থাকায় কাজেও নেই সমন্বয়

  হক ফারুক আহমেদ  

১৯ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় গ্রন্থনীতির সংশোধন এখনও খসড়াতেই পড়ে আছে। এটি কবে আলোর মুখ দেখবে তাও কেউ বলতে পারছেন না। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ অবশ্য জানিয়েছেন গ্রন্থনীতি যুগোপযোগী করতে কাজ চলছে। এদিকে গ্রন্থ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো ‘গাইডলাইন’ না থাকায় বই এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজ যে যার মতো করে করছেন।

দেশে গ্রন্থের প্রকাশ ও ব্যবহার সর্বোতভাবে উৎসাহিত করতে ১৯৯৪ সালে জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণীত ও তা মন্ত্রিসভায় গৃহীত হয়। কিন্তু নীতিসমূহ বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব নির্ধারণ ও সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা না থাকায় এবং দেশে গ্রন্থ উন্নয়নের জন্য কোনো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান না থাকায় গ্রন্থনীতি বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর কেটে যায় প্রায় দেড় দশক। এর মধ্যে এসেছে ই-বুকস, অনলাইন বুকস, ডিজিটাল বুকসের মতো বিষয়। এ অবস্থায় নীতিটি যুগোপযোগী করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে পুনর্গঠন করে শক্তিশালী বাংলাদেশ গ্রন্থ উন্নয়ন পরিষদ গঠনের কথাও ওঠে। সব বিবেচনায় ২০১১ সালে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী জাতীয় গ্রন্থনীতি সংশোধনের কথা বলা হয়। ইতিহাসবিদ প্রফেসর ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। পরে একটি উপকমিটি করা হয় যেখানে আহ্বায়ক ছিলেন মফিদুল হক, সদস্য মহিউদ্দিন আহমেদ, মো. মনজুরুর রহমান, কাজী আবদুল মাজেদ ও মো. রেজাউল করিম।

প্রস্তাবিত এ নীতিমালায় গ্রন্থ ও জাতীয় গ্রন্থনীতির সংজ্ঞা, এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, ১৬টি ক্ষেত্র এবং মোট ২৯টি নীতিনির্ধারণ এবং প্রতিটি নীতির উদ্দেশ্য এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত কর্মকৌশল প্রদান করা হয়। নীতিগুলোর মধ্যে গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রস্তুতকরণ, প্রকাশনা শিল্পের সব পর্যায়ে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, মুদ্রণসামগ্রী, শিশু-কিশোরদের জন্য উপযুক্ত ভাষায় ও গঠনমূলক বিষয়বস্তু নিয়ে বই, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে প্রয়োজন অনুযায়ী বই, প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ও জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, গণসাক্ষরতার প্রকাশ ও নব্য সাক্ষরদের পাঠভ্যাস বজায় রেখে গ্রন্থ প্রণয়ন, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর আত্মবিকাশে অনুকূল গ্রন্থ প্রণয়ন, বিদেশি ক্ল্যাসিকের অনুবাদ, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরতে বিদেশি ভাষায় সাধারণ পাঠ্য ও গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশ; সর্বসাধারণের নৈতিকতাবিরোধী অশ্লীল-কুরুচিপূর্ণ গ্রন্থের প্রকাশ ও প্রচার নিষিদ্ধ করা; আন্তর্জাতিক বাজারে অংশগ্রহণের জন্য উপযুক্তমানের গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশকে উৎসাহিত করে গ্রন্থ রফতানির সুযোগ ও পরিমাণ বৃদ্ধি, বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়ায় গ্রন্থের মূল্য নির্ধারণ, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে পুনর্গঠন করে ইউনেস্কোর প্রস্তাবের আলোকে ‘বাংলাদেশ গ্রন্থ উন্নয়ন পরিষদ’ নামে একটি উপযোগী স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপদানসহ নানা বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও কর্মকৌশল উল্লেখ করা হয়। ২০১৫ সালে গ্রন্থনীতির সংশোধনের পরও কেটে গেছে প্রায় পাঁচ বছর। কিন্তু এখনও আলোর মুখ দেখেনি গ্রন্থনীতির এই সংশোধন।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি সূত্র বলছে, গ্রন্থনীতি সংশোধন ও প্রকাশের কাজটি এখনও হিমায়িত অবস্থাতেই আছে। এ বিষয়ে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সেই সময়ে সংশোধিত জাতীয় গ্রন্থনীতি উপ-কমিটির আহ্বায়ক মফিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, এটি আসলে একটি গাইডলাইন। গ্রন্থ নিয়ে যারাই কাজ করবেন তাদের জন্য এটি প্রয়োজন। আসলে যে সংশোধনটি করা হয়েছিল সেটিও পুরোপুরি কার্যকর হবে কিনা তা খতিয়ে দেখার জন্য তৃতীয় কোনো পক্ষকে সংযুক্ত করা উচিত। কারণ গ্রন্থের বিষয়গুলো সবসময়ই পরিবর্তিত হচ্ছে।

এদিকে কয়েকজন লেখক ও প্রকাশক এই প্রতিবেদককে বলেন, জাতীয় গ্রন্থনীতি সে অর্থে নেই বলে যে যার মতো কাজ করছেন। বইয়ের মান, উৎকর্ষ, বিপণন, বইবিষয়ক নানা উপকরণ আমদানি-রফতানি কোনো কিছুই নিয়মতান্ত্রিকভাবে হচ্ছে না। সমন্বয় নেই বলে দেখা যায়, নজরুল রচনাবলী প্রকাশ করছে সরকারি দুই প্রতিষ্ঠান। যেটা হওয়ার কথা ছিল একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই। বই কেনার ক্ষেত্রেও নেই সুস্পষ্ট কোনো নীতিমালা। এরকম হাজারো রকম সমস্যা রয়ে গেছে। এ ব্যাপারে প্রকাশনা বিশেষজ্ঞ খান মাহবুব বলেন, এটি একটি বেসিক গাইডলাইন অব অ্যাকশন হতে পারত। কিন্তু জাতীয় গ্রন্থনীতি সত্যিকার অর্থে নেই বলে এই বিষয়ে নীতি, আদর্শ আসলে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কার কী দায়িত্ব, কতটুকু দায়িত্ব, কী করা যাবে- কী করা যাবে না তা আজও সুস্পষ্ট নয়।

জাতীয় গ্রন্থনীতির সংশোধন এখনও খসড়াতেই

দিকনির্দেশনা না থাকায় কাজেও নেই সমন্বয়
 হক ফারুক আহমেদ 
১৯ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় গ্রন্থনীতির সংশোধন এখনও খসড়াতেই পড়ে আছে। এটি কবে আলোর মুখ দেখবে তাও কেউ বলতে পারছেন না। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ অবশ্য জানিয়েছেন গ্রন্থনীতি যুগোপযোগী করতে কাজ চলছে। এদিকে গ্রন্থ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো ‘গাইডলাইন’ না থাকায় বই এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজ যে যার মতো করে করছেন।

দেশে গ্রন্থের প্রকাশ ও ব্যবহার সর্বোতভাবে উৎসাহিত করতে ১৯৯৪ সালে জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণীত ও তা মন্ত্রিসভায় গৃহীত হয়। কিন্তু নীতিসমূহ বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব নির্ধারণ ও সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা না থাকায় এবং দেশে গ্রন্থ উন্নয়নের জন্য কোনো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান না থাকায় গ্রন্থনীতি বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর কেটে যায় প্রায় দেড় দশক। এর মধ্যে এসেছে ই-বুকস, অনলাইন বুকস, ডিজিটাল বুকসের মতো বিষয়। এ অবস্থায় নীতিটি যুগোপযোগী করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে পুনর্গঠন করে শক্তিশালী বাংলাদেশ গ্রন্থ উন্নয়ন পরিষদ গঠনের কথাও ওঠে। সব বিবেচনায় ২০১১ সালে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী জাতীয় গ্রন্থনীতি সংশোধনের কথা বলা হয়। ইতিহাসবিদ প্রফেসর ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। পরে একটি উপকমিটি করা হয় যেখানে আহ্বায়ক ছিলেন মফিদুল হক, সদস্য মহিউদ্দিন আহমেদ, মো. মনজুরুর রহমান, কাজী আবদুল মাজেদ ও মো. রেজাউল করিম।

প্রস্তাবিত এ নীতিমালায় গ্রন্থ ও জাতীয় গ্রন্থনীতির সংজ্ঞা, এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, ১৬টি ক্ষেত্র এবং মোট ২৯টি নীতিনির্ধারণ এবং প্রতিটি নীতির উদ্দেশ্য এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত কর্মকৌশল প্রদান করা হয়। নীতিগুলোর মধ্যে গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রস্তুতকরণ, প্রকাশনা শিল্পের সব পর্যায়ে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, মুদ্রণসামগ্রী, শিশু-কিশোরদের জন্য উপযুক্ত ভাষায় ও গঠনমূলক বিষয়বস্তু নিয়ে বই, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে প্রয়োজন অনুযায়ী বই, প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ও জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, গণসাক্ষরতার প্রকাশ ও নব্য সাক্ষরদের পাঠভ্যাস বজায় রেখে গ্রন্থ প্রণয়ন, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর আত্মবিকাশে অনুকূল গ্রন্থ প্রণয়ন, বিদেশি ক্ল্যাসিকের অনুবাদ, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরতে বিদেশি ভাষায় সাধারণ পাঠ্য ও গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রকাশ; সর্বসাধারণের নৈতিকতাবিরোধী অশ্লীল-কুরুচিপূর্ণ গ্রন্থের প্রকাশ ও প্রচার নিষিদ্ধ করা; আন্তর্জাতিক বাজারে অংশগ্রহণের জন্য উপযুক্তমানের গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশকে উৎসাহিত করে গ্রন্থ রফতানির সুযোগ ও পরিমাণ বৃদ্ধি, বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়ায় গ্রন্থের মূল্য নির্ধারণ, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে পুনর্গঠন করে ইউনেস্কোর প্রস্তাবের আলোকে ‘বাংলাদেশ গ্রন্থ উন্নয়ন পরিষদ’ নামে একটি উপযোগী স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপদানসহ নানা বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও কর্মকৌশল উল্লেখ করা হয়। ২০১৫ সালে গ্রন্থনীতির সংশোধনের পরও কেটে গেছে প্রায় পাঁচ বছর। কিন্তু এখনও আলোর মুখ দেখেনি গ্রন্থনীতির এই সংশোধন।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কয়েকটি সূত্র বলছে, গ্রন্থনীতি সংশোধন ও প্রকাশের কাজটি এখনও হিমায়িত অবস্থাতেই আছে। এ বিষয়ে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সেই সময়ে সংশোধিত জাতীয় গ্রন্থনীতি উপ-কমিটির আহ্বায়ক মফিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, এটি আসলে একটি গাইডলাইন। গ্রন্থ নিয়ে যারাই কাজ করবেন তাদের জন্য এটি প্রয়োজন। আসলে যে সংশোধনটি করা হয়েছিল সেটিও পুরোপুরি কার্যকর হবে কিনা তা খতিয়ে দেখার জন্য তৃতীয় কোনো পক্ষকে সংযুক্ত করা উচিত। কারণ গ্রন্থের বিষয়গুলো সবসময়ই পরিবর্তিত হচ্ছে।

এদিকে কয়েকজন লেখক ও প্রকাশক এই প্রতিবেদককে বলেন, জাতীয় গ্রন্থনীতি সে অর্থে নেই বলে যে যার মতো কাজ করছেন। বইয়ের মান, উৎকর্ষ, বিপণন, বইবিষয়ক নানা উপকরণ আমদানি-রফতানি কোনো কিছুই নিয়মতান্ত্রিকভাবে হচ্ছে না। সমন্বয় নেই বলে দেখা যায়, নজরুল রচনাবলী প্রকাশ করছে সরকারি দুই প্রতিষ্ঠান। যেটা হওয়ার কথা ছিল একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই। বই কেনার ক্ষেত্রেও নেই সুস্পষ্ট কোনো নীতিমালা। এরকম হাজারো রকম সমস্যা রয়ে গেছে। এ ব্যাপারে প্রকাশনা বিশেষজ্ঞ খান মাহবুব বলেন, এটি একটি বেসিক গাইডলাইন অব অ্যাকশন হতে পারত। কিন্তু জাতীয় গ্রন্থনীতি সত্যিকার অর্থে নেই বলে এই বিষয়ে নীতি, আদর্শ আসলে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কার কী দায়িত্ব, কতটুকু দায়িত্ব, কী করা যাবে- কী করা যাবে না তা আজও সুস্পষ্ট নয়।