দক্ষিণের হাজারও জেলে ছয় দিনেও চাল পাননি
jugantor
ইলিশে নিষেধাজ্ঞা শুরু
দক্ষিণের হাজারও জেলে ছয় দিনেও চাল পাননি

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল  

২১ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে ছয় দিন আগে। অথচ এখন পর্যন্ত সরকারি সহায়তার ২০ কেজি করে চাল পাননি বরিশাল অঞ্চলের হাজারও জেলে। এমনিতেই সহায়তার এ চালের পরিমাণ এবং বহু জেলের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়া নিয়ে ক্ষুব্ধ জেলেরা। ২২ দিনের জন্য জাল গুটিয়ে বসে থাকায় উপার্জনহীন দিনগুলোতে পরিবারপ্রতি ২০ কেজি চালের বরাদ্দ নিয়েও অসন্তুষ্ট তারা। তার ওপর আবার নিষেধাজ্ঞার ছয় দিন পরও সেই ২০ কেজি চাল না পাওয়ায় কষ্টে দিন কাটছে জেলেদের। অভাবের তাড়নায় আড়তদার আর ট্রলার মালিকদের কাছে হাত পাতছে তারা। কেউ কেউ আবার অনভিজ্ঞ হাতে ধরেছে রিকশা-ভ্যানের হ্যান্ডেল।

প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ১৫ অক্টোবর থেকে টানা ২২ দিনের জন্য নদী-সমুদ্রে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে সরকার। বরিশাল অঞ্চলের ৬ জেলায় প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ নদ-নদীতে কার্যকর হয়েছে এ নিষেধাজ্ঞা। এ সময়ে কেবল ইলিশ জেলেই নয়, অন্যান্য মাছ শিকারে নিয়োজিত জেলেরাও জাল ফেলতে পারবে না। ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া জেলেদের পরিবারপ্রতি ২০ কেজি চাল দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত থাকলেও অধিকাংশ এলাকায় এখন পর্যন্ত তা দেয়া হয়নি। তাছাড়া মোট জেলের একটি বড় অংশ বাদ পড়েছে সহায়তার এ তালিকা থেকে। মৎস্য শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের বরিশাল প্রতিনিধি শহিদুল ইসলাম বলেন, বরিশাল জেলার ১০ উপজেলায় জেলের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। অথচ ২০ কেজি করে চাল পাচ্ছে ৪৭ হাজার জেলে। বাকিদের কী হবে।

বরগুনা জেলা ফিশিং বোট ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল মান্নান মাঝি বলেন, জেলায় ৩৭ হাজার জেলের তালিকা করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী এরা প্রত্যেকে পাবে ২০ কেজি করে চাল। কিন্তু আমাদের হিসাবে জেলায় মৎস্যজীবী জেলের সংখ্যা ৫৫-৬০ হাজার। তালিকার বাইরে যে জেলেরা রইল তাদের কী হবে। জেলার পাথরঘাটা উপজেলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে আগের তালিকায় জেলের সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার। যাচাই-বাছাইয়ের নামে তা কমিয়ে ১১ হাজার করা হয়েছে। যে ৩ হাজার জেলের নাম কেটে বাদ দেয়া হয়েছে তারা একদিকে যেমন মাছ ধরতে যেতে পারবে না তেমনি আবার সরকারের দেয়া ২০ কেজি চালও পাবে না। বরিশাল ও বরগুনার মতোই পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ভোলা ও ঝালকাঠি থেকেও পাওয়া গেছে জেলেদের প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় অনেক কম সংখ্যকের তালিকাভুক্ত হওয়ার খবর। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী এ সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি। পুরোপুরি না হলেও আংশিকভাবে এর সত্যতা স্বীকার করেছেন মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারাও। বরিশালের মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাস বলেন, সরকারি হিসাবে বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় মোট জেলের সংখ্যা ৩ লাখ ৫২ হাজার। এ বছর ২২ দিনের এ নিষেধাজ্ঞা চলাকালে আমরা সহায়তা দিচ্ছি ২ লাখ ৮২ হাজার ৫শ’ জনকে।’ বাকি প্রায় ৭০ হাজার জেলেকে কেন সহায়তার বাইরে রাখা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রধানত ইলিশ জেলেদের গুরুত্ব দিয়েছি আমরা। তাছাড়া এবার সরকারিভাবে যে বরাদ্দ এসেছে তাতে মাথাপিছু ২০ কেজির হিসাবে এর বেশি জেলেকে সহায়তা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামীতে সব জেলে যাতে সহায়তা পায় সেই চেষ্টা করব আমরা।

বরিশালের ১০ উপজেলার সরকারি হিসাবে ৪৭ হাজার জেলের চাল পাওয়ার কথা। কিছু এলাকায় বিতরণ হলেও গৌরনদী-আগৈলঝাড়াসহ বেশিরভাগ উপজেলায় একজন জেলেও পায়নি সহায়তা। বরিশালের পাশাপাশি অন্য জেলাগুলোতেও একই পরিস্থিতি। বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলায় সরকারি সহায়তা পাওয়ার তালিকায় রয়েছে ১১ হাজার ৪৩৮ জেলের নাম। এদের কেউই এখন পর্যন্ত পায়নি সহায়তা। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার দাস বলেন, বরাদ্দ এসেছে তবে বিতরণ শুরু হয়নি। উপজেলা প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ৫ অক্টোবর এখানকার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বদলি হয়ে গেছেন। নতুন কর্মকর্তা না আসা পর্যন্ত কিছুই করতে পারছি না।’ পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় ১৮ হাজার জেলের মধ্যে চাল পাওয়ার কথা ১৩ হাজার ৬শ’ জনের। বিতরণ শুরু না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, বরাদ্দ পেতে খানিকটা দেরি হয়েছে। আশা করছি খুব শিগগিরই বিতরণ শুরু করতে পারব। কলাপাড়া উপজেলায় ১৮ হাজার ৩শ’ জেলের চাল না পাওয়ার কারণ সম্পর্কে সেখানকার মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুন নবী বলেন, ‘এখানে একটি ইউনিয়নে নির্বাচন চলছে। চেয়ারম্যানরা সবাই সেই নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। যে কারণে চাল বিতরণ শুরু হয়নি। ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ২০টি ইউনিয়নের মধ্যে চাল বিতরণ করা হয়েছে মাত্র দুটি ইউনিয়নে। এখানে ২৫ হাজার ৬০ জন জেলের মধ্যে চাল পাবে ১৬ হাজার ১ জন। দেরি হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহেব হোসেন মিনার বলেন, আমরা ২৫ তারিখের মধ্যে বিতরণ শেষ কর। একইভাবে পটুয়াখালীর বাউফল, পিরোজপুর, ঝালকাঠিসহ বহু এলাকা থেকেই পাওয়া গেছে জেলেদের চাল না পাওয়ার খবর।

বরিশাল বিভাগের মৎস্য অধিদফতরের উপপরিচালক আনিসুর রহমান তালুকদার বলেন, বহু এলাকায় এখনও সরকারি সহায়তার চাল বিতরণ শুরু হয়নি। স্থানীয় নানা জটিলতার কারণেই মূলত এমনটা হচ্ছে। তবে আমাদের টার্গেট ৩০ অক্টোবরের মধ্যে চাল বিতরণ শেষ করা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেটা করব আমরা।

ইলিশে নিষেধাজ্ঞা শুরু

দক্ষিণের হাজারও জেলে ছয় দিনেও চাল পাননি

 আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল 
২১ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে ছয় দিন আগে। অথচ এখন পর্যন্ত সরকারি সহায়তার ২০ কেজি করে চাল পাননি বরিশাল অঞ্চলের হাজারও জেলে। এমনিতেই সহায়তার এ চালের পরিমাণ এবং বহু জেলের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়া নিয়ে ক্ষুব্ধ জেলেরা। ২২ দিনের জন্য জাল গুটিয়ে বসে থাকায় উপার্জনহীন দিনগুলোতে পরিবারপ্রতি ২০ কেজি চালের বরাদ্দ নিয়েও অসন্তুষ্ট তারা। তার ওপর আবার নিষেধাজ্ঞার ছয় দিন পরও সেই ২০ কেজি চাল না পাওয়ায় কষ্টে দিন কাটছে জেলেদের। অভাবের তাড়নায় আড়তদার আর ট্রলার মালিকদের কাছে হাত পাতছে তারা। কেউ কেউ আবার অনভিজ্ঞ হাতে ধরেছে রিকশা-ভ্যানের হ্যান্ডেল।

প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ১৫ অক্টোবর থেকে টানা ২২ দিনের জন্য নদী-সমুদ্রে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে সরকার। বরিশাল অঞ্চলের ৬ জেলায় প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ নদ-নদীতে কার্যকর হয়েছে এ নিষেধাজ্ঞা। এ সময়ে কেবল ইলিশ জেলেই নয়, অন্যান্য মাছ শিকারে নিয়োজিত জেলেরাও জাল ফেলতে পারবে না। ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া জেলেদের পরিবারপ্রতি ২০ কেজি চাল দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত থাকলেও অধিকাংশ এলাকায় এখন পর্যন্ত তা দেয়া হয়নি। তাছাড়া মোট জেলের একটি বড় অংশ বাদ পড়েছে সহায়তার এ তালিকা থেকে। মৎস্য শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের বরিশাল প্রতিনিধি শহিদুল ইসলাম বলেন, বরিশাল জেলার ১০ উপজেলায় জেলের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। অথচ ২০ কেজি করে চাল পাচ্ছে ৪৭ হাজার জেলে। বাকিদের কী হবে।

বরগুনা জেলা ফিশিং বোট ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল মান্নান মাঝি বলেন, জেলায় ৩৭ হাজার জেলের তালিকা করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী এরা প্রত্যেকে পাবে ২০ কেজি করে চাল। কিন্তু আমাদের হিসাবে জেলায় মৎস্যজীবী জেলের সংখ্যা ৫৫-৬০ হাজার। তালিকার বাইরে যে জেলেরা রইল তাদের কী হবে। জেলার পাথরঘাটা উপজেলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে আগের তালিকায় জেলের সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার। যাচাই-বাছাইয়ের নামে তা কমিয়ে ১১ হাজার করা হয়েছে। যে ৩ হাজার জেলের নাম কেটে বাদ দেয়া হয়েছে তারা একদিকে যেমন মাছ ধরতে যেতে পারবে না তেমনি আবার সরকারের দেয়া ২০ কেজি চালও পাবে না। বরিশাল ও বরগুনার মতোই পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ভোলা ও ঝালকাঠি থেকেও পাওয়া গেছে জেলেদের প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় অনেক কম সংখ্যকের তালিকাভুক্ত হওয়ার খবর। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী এ সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি। পুরোপুরি না হলেও আংশিকভাবে এর সত্যতা স্বীকার করেছেন মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারাও। বরিশালের মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাস বলেন, সরকারি হিসাবে বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় মোট জেলের সংখ্যা ৩ লাখ ৫২ হাজার। এ বছর ২২ দিনের এ নিষেধাজ্ঞা চলাকালে আমরা সহায়তা দিচ্ছি ২ লাখ ৮২ হাজার ৫শ’ জনকে।’ বাকি প্রায় ৭০ হাজার জেলেকে কেন সহায়তার বাইরে রাখা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রধানত ইলিশ জেলেদের গুরুত্ব দিয়েছি আমরা। তাছাড়া এবার সরকারিভাবে যে বরাদ্দ এসেছে তাতে মাথাপিছু ২০ কেজির হিসাবে এর বেশি জেলেকে সহায়তা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামীতে সব জেলে যাতে সহায়তা পায় সেই চেষ্টা করব আমরা।

বরিশালের ১০ উপজেলার সরকারি হিসাবে ৪৭ হাজার জেলের চাল পাওয়ার কথা। কিছু এলাকায় বিতরণ হলেও গৌরনদী-আগৈলঝাড়াসহ বেশিরভাগ উপজেলায় একজন জেলেও পায়নি সহায়তা। বরিশালের পাশাপাশি অন্য জেলাগুলোতেও একই পরিস্থিতি। বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলায় সরকারি সহায়তা পাওয়ার তালিকায় রয়েছে ১১ হাজার ৪৩৮ জেলের নাম। এদের কেউই এখন পর্যন্ত পায়নি সহায়তা। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার দাস বলেন, বরাদ্দ এসেছে তবে বিতরণ শুরু হয়নি। উপজেলা প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ৫ অক্টোবর এখানকার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বদলি হয়ে গেছেন। নতুন কর্মকর্তা না আসা পর্যন্ত কিছুই করতে পারছি না।’ পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় ১৮ হাজার জেলের মধ্যে চাল পাওয়ার কথা ১৩ হাজার ৬শ’ জনের। বিতরণ শুরু না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, বরাদ্দ পেতে খানিকটা দেরি হয়েছে। আশা করছি খুব শিগগিরই বিতরণ শুরু করতে পারব। কলাপাড়া উপজেলায় ১৮ হাজার ৩শ’ জেলের চাল না পাওয়ার কারণ সম্পর্কে সেখানকার মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুন নবী বলেন, ‘এখানে একটি ইউনিয়নে নির্বাচন চলছে। চেয়ারম্যানরা সবাই সেই নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। যে কারণে চাল বিতরণ শুরু হয়নি। ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ২০টি ইউনিয়নের মধ্যে চাল বিতরণ করা হয়েছে মাত্র দুটি ইউনিয়নে। এখানে ২৫ হাজার ৬০ জন জেলের মধ্যে চাল পাবে ১৬ হাজার ১ জন। দেরি হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহেব হোসেন মিনার বলেন, আমরা ২৫ তারিখের মধ্যে বিতরণ শেষ কর। একইভাবে পটুয়াখালীর বাউফল, পিরোজপুর, ঝালকাঠিসহ বহু এলাকা থেকেই পাওয়া গেছে জেলেদের চাল না পাওয়ার খবর।

বরিশাল বিভাগের মৎস্য অধিদফতরের উপপরিচালক আনিসুর রহমান তালুকদার বলেন, বহু এলাকায় এখনও সরকারি সহায়তার চাল বিতরণ শুরু হয়নি। স্থানীয় নানা জটিলতার কারণেই মূলত এমনটা হচ্ছে। তবে আমাদের টার্গেট ৩০ অক্টোবরের মধ্যে চাল বিতরণ শেষ করা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেটা করব আমরা।