বরিশালে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ইলিশ শিকার
jugantor
বরিশালে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ইলিশ শিকার

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল  

২৩ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না মা ইলিশ নিধন। অন্য বছরের তুলনায় এবার যেন বেশি বেপরোয়া জেলেরা। হিজলা মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা থেকে শুরু করে বরিশাল সদরের কীর্তনখোলা, সর্বত্রই দিন-রাত ইলিশ শিকার করছে বহু জেলে। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বেশ কয়েকটি নৌকা কিংবা ট্রলারে দলবেঁধে এরা নামছে নদীতে।

ইলিশ শিকারে মরিয়া এসব জেলের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে দফায় দফায় হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এসব হামলায় আহত হয়েছেন ৪ পুলিশ সদস্যসহ আরও বেশ কয়েকজন। চলমান পরিস্থিতিতে অভিযান চালানো প্রশ্নে চরম ঝুঁকির মুখে পড়ার কথা বলেছেন মৎস্য কর্মকর্তারা। সবকিছু মিলিয়ে দেশের ষষ্ঠ মৎস্য অভয়াশ্রম বরিশাল অঞ্চলে প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় চলতি মাসের ১৫ তারিখ থেকে নদ-নদী-সমুদ্রে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। প্রতি বছরের মতো এবারও এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে নেমেছে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ, মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। প্রায় প্রতিদিনই আটকের পর অবৈধভাবে মাছ ধরতে নামা জেলেদের জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। ৮ দিনে কেবল বরিশাল জেলাতেই ৭৭০টি অভিযানে ৩৩৬ জন জেলেকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে আটকের পর ধ্বংস করা হয়েছে ২৮ লাখ মিটার জাল। ৩৫০টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব কারাদণ্ডের রায় দেয়া হয়। আপাতদৃষ্টিতে এসব অভিযান সফল বলে মনে হলেও এসবের প্রায় সবগুলোই হয়েছে বরিশাল জেলা শহরের আশপাশে থাকা নদ-নদীগুলোতে। ইলিশের প্রজননের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মেঘনা নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা এবং কীর্তনখোলা নদীর অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকাগুলোর চিত্র এর বিপরীত। এসব এলাকায় একশ্রেণির প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় দেদারসে চলছে ইলিশ শিকার। অভিযান চালাতে গিয়ে দফায় দফায় হামলার শিকার হচ্ছে অভিযানিক দলগুলো।

মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, মেঘনা নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা রয়েছে এ উপজেলার অধীনে। দেশের ষষ্ঠ মৎস্য অভয়াশ্রমের আওতাধীন এ অংশটি ইলিশের প্রজননের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখানে ইলিশ নিধনের চলমান নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে গিয়ে নানা হামলা ও বাধার মুখে পড়ছি। ১৮ অক্টোবর জাঙ্গালিয়া এলাকায় অভিযান চালাতে গেলে দু’জন ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে হামলা চালানো হয়। ২১ অক্টোবরও ঘটে হামলার ঘটনা। এতে ২ পুলিশ সদস্য আহত হয়। জেলেরা সংখ্যায় ৭০-৮০ জন থাকলেও আমাদের অভিযানিক দলে ৮-১০ জনের বেশি থাকে না।

মেঘনা নদী অধ্যুষিত আরেক উপজেলা হিজলার মৎস্য কর্মকর্তা আ. হালিম বলেন, ১৭ অক্টোবর রাতে উপজেলার দেবুয়া এলাকায় অভিযান চলাকালে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে নৌপুলিশের দুই সদস্য আহত হয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর এখানে দুটি টহল টিম পাঠানো হয়। হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জের পাশাপাশি বরিশালের কীর্তনখোলা নদীতেও ঘটেছে হামলার ঘটনা। ২০ অক্টোবর রাতে প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার অংশগ্রহণে পরিচালিত অভিযানে হামলার ঘটনা ঘটে। এ দলে ছিলেন বরিশাল সদর উপজেলার ইউএনও মো. মুনিবুর রহমান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান, অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) জাকারিয়া রহমান ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জিব সন্যামত। পুলিশের ১০ জন সদস্য নিয়ে অভিযানে যাওয়া এ দলের ওপর হামলা চালানো হয়। বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হয় পুলিশ সদস্যসহ ২ জন।

মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে হামলা আর ধাওয়ার ঘটনা আরও বেশি। পরিস্থিতি এমন যে নদ-নদীতে অভিযানে যেতেই এখন ভয় পাচ্ছি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, যারা ইলিশ ধরছে তাদের সিংহভাগই মৌসুমি জেলে। প্রভাবশালীদের নেপথ্য ইন্ধনে এরা অর্থ আয়ের নেশায় নিষেধাজ্ঞার এ মৌসুমে মাছ ধরতে নামছে। নিয়মিত জেলে হলে তাদের অনেককেই আমরা চিনতে পারতাম।

মৎস্য অধিদফতরের উপপরিচালক আনিসুর রহমান তালুকদার বলেন, বিভিন্ন জায়গায় হামলার ঘটনা ঘটছে। পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে গঠিত অভিযানিক দলের ওপর এভাবে হামলার ঘটনা এর আগে আর ঘটেনি। এসব জেলে নৌকা এবং ট্রলারে ইট-পাটকেলের স্তূপ করে রাখে। বরিশাল জেলা নৌপুলিশের এসপি কফিলউদ্দিন বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে লোকবল সংকট। ৮০ বর্গকিলোমিটারের অভয়াশ্রম পাহারা দেয়ার জন্য রয়েছে মাত্র ২৮ জন পুলিশ। তবু আমরা চেষ্টা করছি। তাছাড়া অভিযানকেন্দ্রিক লোকবল বৃদ্ধির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আশা করছি এ রকম ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।

বরিশালে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ইলিশ শিকার

 আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল 
২৩ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না মা ইলিশ নিধন। অন্য বছরের তুলনায় এবার যেন বেশি বেপরোয়া জেলেরা। হিজলা মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা থেকে শুরু করে বরিশাল সদরের কীর্তনখোলা, সর্বত্রই দিন-রাত ইলিশ শিকার করছে বহু জেলে। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বেশ কয়েকটি নৌকা কিংবা ট্রলারে দলবেঁধে এরা নামছে নদীতে।

ইলিশ শিকারে মরিয়া এসব জেলের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে দফায় দফায় হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এসব হামলায় আহত হয়েছেন ৪ পুলিশ সদস্যসহ আরও বেশ কয়েকজন। চলমান পরিস্থিতিতে অভিযান চালানো প্রশ্নে চরম ঝুঁকির মুখে পড়ার কথা বলেছেন মৎস্য কর্মকর্তারা। সবকিছু মিলিয়ে দেশের ষষ্ঠ মৎস্য অভয়াশ্রম বরিশাল অঞ্চলে প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় চলতি মাসের ১৫ তারিখ থেকে নদ-নদী-সমুদ্রে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। প্রতি বছরের মতো এবারও এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে নেমেছে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ, মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। প্রায় প্রতিদিনই আটকের পর অবৈধভাবে মাছ ধরতে নামা জেলেদের জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। ৮ দিনে কেবল বরিশাল জেলাতেই ৭৭০টি অভিযানে ৩৩৬ জন জেলেকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে আটকের পর ধ্বংস করা হয়েছে ২৮ লাখ মিটার জাল। ৩৫০টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব কারাদণ্ডের রায় দেয়া হয়। আপাতদৃষ্টিতে এসব অভিযান সফল বলে মনে হলেও এসবের প্রায় সবগুলোই হয়েছে বরিশাল জেলা শহরের আশপাশে থাকা নদ-নদীগুলোতে। ইলিশের প্রজননের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মেঘনা নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা এবং কীর্তনখোলা নদীর অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকাগুলোর চিত্র এর বিপরীত। এসব এলাকায় একশ্রেণির প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় দেদারসে চলছে ইলিশ শিকার। অভিযান চালাতে গিয়ে দফায় দফায় হামলার শিকার হচ্ছে অভিযানিক দলগুলো।

মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, মেঘনা নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা রয়েছে এ উপজেলার অধীনে। দেশের ষষ্ঠ মৎস্য অভয়াশ্রমের আওতাধীন এ অংশটি ইলিশের প্রজননের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখানে ইলিশ নিধনের চলমান নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে গিয়ে নানা হামলা ও বাধার মুখে পড়ছি। ১৮ অক্টোবর জাঙ্গালিয়া এলাকায় অভিযান চালাতে গেলে দু’জন ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে হামলা চালানো হয়। ২১ অক্টোবরও ঘটে হামলার ঘটনা। এতে ২ পুলিশ সদস্য আহত হয়। জেলেরা সংখ্যায় ৭০-৮০ জন থাকলেও আমাদের অভিযানিক দলে ৮-১০ জনের বেশি থাকে না।

মেঘনা নদী অধ্যুষিত আরেক উপজেলা হিজলার মৎস্য কর্মকর্তা আ. হালিম বলেন, ১৭ অক্টোবর রাতে উপজেলার দেবুয়া এলাকায় অভিযান চলাকালে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে নৌপুলিশের দুই সদস্য আহত হয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর এখানে দুটি টহল টিম পাঠানো হয়। হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জের পাশাপাশি বরিশালের কীর্তনখোলা নদীতেও ঘটেছে হামলার ঘটনা। ২০ অক্টোবর রাতে প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার অংশগ্রহণে পরিচালিত অভিযানে হামলার ঘটনা ঘটে। এ দলে ছিলেন বরিশাল সদর উপজেলার ইউএনও মো. মুনিবুর রহমান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান, অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) জাকারিয়া রহমান ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জিব সন্যামত। পুলিশের ১০ জন সদস্য নিয়ে অভিযানে যাওয়া এ দলের ওপর হামলা চালানো হয়। বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হয় পুলিশ সদস্যসহ ২ জন।

মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে হামলা আর ধাওয়ার ঘটনা আরও বেশি। পরিস্থিতি এমন যে নদ-নদীতে অভিযানে যেতেই এখন ভয় পাচ্ছি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, যারা ইলিশ ধরছে তাদের সিংহভাগই মৌসুমি জেলে। প্রভাবশালীদের নেপথ্য ইন্ধনে এরা অর্থ আয়ের নেশায় নিষেধাজ্ঞার এ মৌসুমে মাছ ধরতে নামছে। নিয়মিত জেলে হলে তাদের অনেককেই আমরা চিনতে পারতাম।

মৎস্য অধিদফতরের উপপরিচালক আনিসুর রহমান তালুকদার বলেন, বিভিন্ন জায়গায় হামলার ঘটনা ঘটছে। পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে গঠিত অভিযানিক দলের ওপর এভাবে হামলার ঘটনা এর আগে আর ঘটেনি। এসব জেলে নৌকা এবং ট্রলারে ইট-পাটকেলের স্তূপ করে রাখে। বরিশাল জেলা নৌপুলিশের এসপি কফিলউদ্দিন বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে লোকবল সংকট। ৮০ বর্গকিলোমিটারের অভয়াশ্রম পাহারা দেয়ার জন্য রয়েছে মাত্র ২৮ জন পুলিশ। তবু আমরা চেষ্টা করছি। তাছাড়া অভিযানকেন্দ্রিক লোকবল বৃদ্ধির জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আশা করছি এ রকম ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।