কর্মীদের বিরুদ্ধে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ মালিকদের
jugantor
সাটুরিয়ায় আরএস-২ জরিপ
কর্মীদের বিরুদ্ধে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ মালিকদের

  মতিউর রহমান, মানিকগঞ্জ  

২৮ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জেলার সাটুরিয়া উপজেলার চরতিল্লী গ্রামের মিনহাজ উদ্দিন (৫৫)। বাড়ির পাশের কালীগঙ্গা নদীতে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে স্ত্রীসহ ৫ জনের সংসারে অন্ন জোগাড় করতে যখন হিমশিম খাচ্ছেন ঠিক তখন পৈতৃক ৩২ শতক জমির আরএস-২ রেকর্ড করতে তাকে গুণতে হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। এর মধ্যে জরিপ সহায়ক নজরুল ইসলামকে ১৮ হাজার এবং এলাকার কয়েকজন দালালকে দিতে হয়েছে আরও ১২ হাজার টাকা। ভুক্তভোগী মিনহাজ উদ্দিন জানালেন, স্থানীয় এক সুদ কারবারির কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে পৈতৃক ভিটে রক্ষার্থে আরএস-২ রেকর্ড জরিপকারীদের দিতে হয়েছে।

কথা হয়, এলাকার ভুক্তভোগী আবদুল লতিফ বেপারীর সঙ্গে। চরতিল্লী মৌজায় ১নং ও ৭নং সিটে তার বাবা মোন্তাজ উদ্দিন বেপারীর নামে আরএস রেকর্ডীয় প্রায় আড়াইশ’ শতাংশ জমি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২শ’ শতাংশ জমি আরএস-২ রেকর্ডভুক্ত করাতে তাকে গুণতে হয়েছে সোয়া লাখ টাকা। আর এই টাকা দিয়েছেন জরিপকারী নজরুল হোসেনের কাছে। এছাড়া চরতিল্লী মৌজার ১নং সিটে ৪১ শতাংশ জমির রেকর্ড করাতে আরও ৫০ হাজার টাকার দেনদরবার চলছে। কিন্তু জরিপকারীদের দাবি আরও লাখ টাকা। কারণ জমিটি অপেক্ষাকৃত মূল্যবান। এজন্য বাড়তি টাকা দাবি তাদের। এ রকমভাবে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলায় আরএস-২ জরিপের নামে জমির মালিকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে জরিপ কর্মীদের বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে জরিপ অধিদফতরের জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মোমিনুর রশীদ জানান, এ ধরনের অভিযোগ তিনি শুনেছেন। এ ঘটনায় জরিপকারী সবার কার্যক্রম সাময়িক স্থগিতসহ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, আরএস-২ জরিপের নামে উপজেলার তিল্লী, চরতিল্লী ও গোপালপুর মৌজায় জমির মালিকদের কাছ থেকে নানা অজুহাতে দালালদের মাধ্যমে শতাংশ প্রতি দুই হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেছেন জরিপ কর্মীরা। জমির মালিকদের অভিযোগ, টাকা না দিলে অন্যের নামে রেকর্ড করা হয়। এজন্য তাদের কেউ কেউ ৩০ ধারায় রেকর্ড সংশোধনী মামলা করেছেন। জমির পরিমাণ, দাগ-খতিয়ান ঠিক রাখতে ও ভুলত্রুটি সংশোধন করতে জরিপ কর্মীদের চাহিদা মোতাবেক টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন জমির মালিকরা। এ নিয়ে অধিকাংশ জমির মালিকের মধ্যে চাপা ক্ষোভ থাকলেও পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষায় নীরবে টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে, করোনাভাইরাসের প্রকোপে প্রায় পাঁচ মাস জরিপ কাজ সাময়িক বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি আবার তা শুরু হয়। সম্প্রতি চরতিল্লী গ্রামে আরএস-২ জরিপের অস্থায়ী কার্যালয়ে তিল্লী ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের (সাধুর বাড়ি) কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, জরিপকারী ও জরিপ সহায়ক তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা দিতে বাধ্য করান। এছাড়া বরাইদ ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে আরএস-২ জরিপের অস্থায়ী কার্যালয় খানের বাড়ি গিয়েও বেশ কয়েকজন জমির মালিককে দেখা যায়। তাদের কেউ জমি রেকর্ড করাতে, কেউ জমির পর্চার জন্য এসেছেন। সেখানে স্থানীয় বরাইদ ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন নিজেই দালালের ভূমিকায় আছেন। অভিযোগ রয়েছে, জমির মালিকদের কাছ থেকে তার মাধ্যমে টাকা নেয়া হয়। আর সেই টাকার কিছু অংশ তিনি রেখে বাকি টাকা দেন জরিপকারী দলের সদস্যদের। এ ব্যাপারে জরিপ কার্যালয়ে কথা হয় যুবলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, এলাকার কারও কারও জমি নিয়ে সমস্যা রয়েছে। সমস্যা সমাধানে তিনি সহযোগিতা করেন মাত্র।

গোপালপুর গ্রামের শাজাহান মোল্লার (৬৫) অভিযোগ, দাদা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া তার ৪৫ শতক জমি চাচাতো ভাই শরীফুল ইসলামের নামে রেকর্ড করে দেয় জরিপকারীরা। এ জন্য তার চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে তারা ৮০ হাজার টাকা নিয়েছেন। ভুক্তভোগী সাজাহান জানালেন, যে বাড়িতে জরিপের অফিস বসেছে তিনিই হচ্ছেন বড় দালাল। অভিযোগ অস্বীকার করে গোপালপুরের সার্ভেয়ার রফিকুল ইসলাম বলেন, জরিপে কারও কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা নেয়া হয়নি। কাজ করার পর কেউ খুশি হয়ে দিলেও তা নেয়া হয় না। এসব অভিযোগের বিষয়ে মঙ্গলবার দুপুরে সাটুরিয়া উপজেলা সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা এএসএম শাহীনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

সাটুরিয়ায় আরএস-২ জরিপ

কর্মীদের বিরুদ্ধে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ মালিকদের

 মতিউর রহমান, মানিকগঞ্জ 
২৮ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জেলার সাটুরিয়া উপজেলার চরতিল্লী গ্রামের মিনহাজ উদ্দিন (৫৫)। বাড়ির পাশের কালীগঙ্গা নদীতে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে স্ত্রীসহ ৫ জনের সংসারে অন্ন জোগাড় করতে যখন হিমশিম খাচ্ছেন ঠিক তখন পৈতৃক ৩২ শতক জমির আরএস-২ রেকর্ড করতে তাকে গুণতে হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। এর মধ্যে জরিপ সহায়ক নজরুল ইসলামকে ১৮ হাজার এবং এলাকার কয়েকজন দালালকে দিতে হয়েছে আরও ১২ হাজার টাকা। ভুক্তভোগী মিনহাজ উদ্দিন জানালেন, স্থানীয় এক সুদ কারবারির কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে পৈতৃক ভিটে রক্ষার্থে আরএস-২ রেকর্ড জরিপকারীদের দিতে হয়েছে।

কথা হয়, এলাকার ভুক্তভোগী আবদুল লতিফ বেপারীর সঙ্গে। চরতিল্লী মৌজায় ১নং ও ৭নং সিটে তার বাবা মোন্তাজ উদ্দিন বেপারীর নামে আরএস রেকর্ডীয় প্রায় আড়াইশ’ শতাংশ জমি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২শ’ শতাংশ জমি আরএস-২ রেকর্ডভুক্ত করাতে তাকে গুণতে হয়েছে সোয়া লাখ টাকা। আর এই টাকা দিয়েছেন জরিপকারী নজরুল হোসেনের কাছে। এছাড়া চরতিল্লী মৌজার ১নং সিটে ৪১ শতাংশ জমির রেকর্ড করাতে আরও ৫০ হাজার টাকার দেনদরবার চলছে। কিন্তু জরিপকারীদের দাবি আরও লাখ টাকা। কারণ জমিটি অপেক্ষাকৃত মূল্যবান। এজন্য বাড়তি টাকা দাবি তাদের। এ রকমভাবে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলায় আরএস-২ জরিপের নামে জমির মালিকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে জরিপ কর্মীদের বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে জরিপ অধিদফতরের জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মোমিনুর রশীদ জানান, এ ধরনের অভিযোগ তিনি শুনেছেন। এ ঘটনায় জরিপকারী সবার কার্যক্রম সাময়িক স্থগিতসহ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, আরএস-২ জরিপের নামে উপজেলার তিল্লী, চরতিল্লী ও গোপালপুর মৌজায় জমির মালিকদের কাছ থেকে নানা অজুহাতে দালালদের মাধ্যমে শতাংশ প্রতি দুই হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেছেন জরিপ কর্মীরা। জমির মালিকদের অভিযোগ, টাকা না দিলে অন্যের নামে রেকর্ড করা হয়। এজন্য তাদের কেউ কেউ ৩০ ধারায় রেকর্ড সংশোধনী মামলা করেছেন। জমির পরিমাণ, দাগ-খতিয়ান ঠিক রাখতে ও ভুলত্রুটি সংশোধন করতে জরিপ কর্মীদের চাহিদা মোতাবেক টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন জমির মালিকরা। এ নিয়ে অধিকাংশ জমির মালিকের মধ্যে চাপা ক্ষোভ থাকলেও পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষায় নীরবে টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে, করোনাভাইরাসের প্রকোপে প্রায় পাঁচ মাস জরিপ কাজ সাময়িক বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি আবার তা শুরু হয়। সম্প্রতি চরতিল্লী গ্রামে আরএস-২ জরিপের অস্থায়ী কার্যালয়ে তিল্লী ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের (সাধুর বাড়ি) কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, জরিপকারী ও জরিপ সহায়ক তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা দিতে বাধ্য করান। এছাড়া বরাইদ ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে আরএস-২ জরিপের অস্থায়ী কার্যালয় খানের বাড়ি গিয়েও বেশ কয়েকজন জমির মালিককে দেখা যায়। তাদের কেউ জমি রেকর্ড করাতে, কেউ জমির পর্চার জন্য এসেছেন। সেখানে স্থানীয় বরাইদ ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন নিজেই দালালের ভূমিকায় আছেন। অভিযোগ রয়েছে, জমির মালিকদের কাছ থেকে তার মাধ্যমে টাকা নেয়া হয়। আর সেই টাকার কিছু অংশ তিনি রেখে বাকি টাকা দেন জরিপকারী দলের সদস্যদের। এ ব্যাপারে জরিপ কার্যালয়ে কথা হয় যুবলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, এলাকার কারও কারও জমি নিয়ে সমস্যা রয়েছে। সমস্যা সমাধানে তিনি সহযোগিতা করেন মাত্র।

গোপালপুর গ্রামের শাজাহান মোল্লার (৬৫) অভিযোগ, দাদা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া তার ৪৫ শতক জমি চাচাতো ভাই শরীফুল ইসলামের নামে রেকর্ড করে দেয় জরিপকারীরা। এ জন্য তার চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে তারা ৮০ হাজার টাকা নিয়েছেন। ভুক্তভোগী সাজাহান জানালেন, যে বাড়িতে জরিপের অফিস বসেছে তিনিই হচ্ছেন বড় দালাল। অভিযোগ অস্বীকার করে গোপালপুরের সার্ভেয়ার রফিকুল ইসলাম বলেন, জরিপে কারও কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা নেয়া হয়নি। কাজ করার পর কেউ খুশি হয়ে দিলেও তা নেয়া হয় না। এসব অভিযোগের বিষয়ে মঙ্গলবার দুপুরে সাটুরিয়া উপজেলা সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা এএসএম শাহীনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।