উত্তর সীমান্তে মাদক চোরাচালান বেড়েছে
jugantor
উত্তর সীমান্তে মাদক চোরাচালান বেড়েছে

  আনু মোস্তফা, রাজশাহী  

২২ নভেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে গবাদি পশুর পাচার ঠেকাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) মরিয়া। দেখামাত্রই গুলি করে মানুষ হত্যা করে। কিন্তু মাদক পাচার ঠেকাতে বিএসএফের গা-ছাড়া ভাব। এ কারণে রাজশাহীসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্তে মাদক চোরাচালান উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

গবাদি পশুর পাচার বন্ধের পর থেকে কর্মহীন রাখালরা জীবিকার তাগিদে মাদক পাচার ও বহনে সম্পৃক্ত হয়েছে। করোনাকালে সীমান্ত লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বসবাসকারী কর্মহীন পরিযায়ী শ্রমিকদের (যারা অন্য রাজ্যে গিয়ে কাজ করতেন) একাংশ সীমান্তে মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়েছে। এগুলো রাজশাহী সীমান্তে মাদক চোরাচালান বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।

রাজশাহী সীমান্তের বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গের লালগোলার বাসিন্দা সেখ নুরুজ্জামান মণ্ডলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বাংলাদেশে গরু পাচারকারীদের কাছ থেকে বিএসএফ আগে যে টাকা পেত, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নীতির কারণে আড়াই বছর ধরে তা পুরোপুরি বন্ধ আছে। এ কারণে তারা মাদক পাচার থেকে সেটা এখন পুষিয়ে নিচ্ছে। নুরুজ্জামানের মতোই মুর্শিদাবাদের সীমান্ত গ্রাম বিলবোরা কোপরার বাসিন্দা জহুরুল মণ্ডল বলেন, বিএসএফও কিছু কিছু মাদক আটক করছে। তবে যে পরিমাণ পাচার হচ্ছে সে তুলনায় আটক হচ্ছে বেশ কম। জহুরুলের মতে, বিএসএফ চাইলে সীমান্তে গরু পাচার বন্ধের মতো মাদক পাচারও শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ গ্রামের একাধিক জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করে বলেন, করোনাকালে বিজিবির টহল কিছুটা কমেছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সীমান্তে মাদক পাচারকারীরা তৎপর হয়েছে।

রাজশাহী বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তুহিন মাসুদ বলেন, একটা সময় বাংলাদেশে মাদক পাচার প্রতিরোধে বিএসএফ বেশ নিষ্ক্রিয় ছিল। তবে বিভিন্ন সময় বিজিবি-বিএসএফ পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনে মাদক পাচার বন্ধে বিএসএফকে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে। ফলে সম্প্রতি বিএসএফ সীমান্তে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছে। কর্নেল তুহিন আরও বলেন, বিএসএফ চাইলেই মাদক পাচার পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে। প্রতিটি সীমান্তে তাদের ঘনঘন ফাঁড়ি আছে। ভালো সড়ক নেটওয়ার্ক ও যানবাহন আছে। অপরদিকে, সীমান্ত এলাকায় বিজিবিকে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এক ফাঁড়ি থেকে আরেক ফাঁড়ির দূরত্ব অনেক। সড়ক নেটওয়ার্ক ও যানবাহন বলতেও তেমন কিছু নেই। নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া বিজিবির পক্ষে পাচারকারীদের গতিবিধি জানা কঠিন। এরপরও রাজশাহী সেক্টরের অধীন উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৪০০ কিলোমিটার সীমান্তে মাদক চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবি সতর্ক রয়েছে।

জানা গেছে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট ও বৃহত্তর দিনাজপুর সীমান্তপথে সম্প্রতি মাদক, বিশেষ করে ফেনসিডিল ও ইয়াবা পাচার বেড়েছে। বিজিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সীমান্তপথে চার ধরনের মাদক পাচার হয়ে আসছে। আগে যেসব সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে গরু-মহিষ পাচার হতো, এখন সেসব পয়েন্ট মাদক পাচারের হটস্পট হয়ে উঠেছে। বিজিবির তথ্যমতে, গোদাগাড়ী সীমান্তের ওপারে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলায় হেরোইন তৈরির অর্ধশতাধিক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা সম্পর্কে বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। সেখানে জন্ম নিরোধক বড়িকে রং করে মাদকের মিশ্রণ দিয়ে নকল ইয়াবাও তৈরি করা হচ্ছে। এ তিন ধরনের মাদকের পাশাপাশি ও বিভিন্ন নামে তৈরি নেশার ট্যাবলেটও পাচার হয়ে আসছে। মাঝেমধ্যে গাঁজার চালানও ধরা পড়ে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বহুমুখী তৎপরতার পরও মাদক পাচার না কমার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল বাতেন বলেন, বিভিন্ন থানায় প্রতিদিন যে সংখ্যক মামলা হচ্ছে তার ৯০ ভাগই মাদকের মামলা। দৈনিক বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার হচ্ছে। পাচারকারী ও ব্যবসায়ী আটক হচ্ছে। মাদক পাচার ও বিক্রি রোধে পুলিশ সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।

উত্তর সীমান্তে মাদক চোরাচালান বেড়েছে

 আনু মোস্তফা, রাজশাহী 
২২ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে গবাদি পশুর পাচার ঠেকাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) মরিয়া। দেখামাত্রই গুলি করে মানুষ হত্যা করে। কিন্তু মাদক পাচার ঠেকাতে বিএসএফের গা-ছাড়া ভাব। এ কারণে রাজশাহীসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্তে মাদক চোরাচালান উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

গবাদি পশুর পাচার বন্ধের পর থেকে কর্মহীন রাখালরা জীবিকার তাগিদে মাদক পাচার ও বহনে সম্পৃক্ত হয়েছে। করোনাকালে সীমান্ত লাগোয়া পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বসবাসকারী কর্মহীন পরিযায়ী শ্রমিকদের (যারা অন্য রাজ্যে গিয়ে কাজ করতেন) একাংশ সীমান্তে মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়েছে। এগুলো রাজশাহী সীমান্তে মাদক চোরাচালান বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।

রাজশাহী সীমান্তের বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গের লালগোলার বাসিন্দা সেখ নুরুজ্জামান মণ্ডলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বাংলাদেশে গরু পাচারকারীদের কাছ থেকে বিএসএফ আগে যে টাকা পেত, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নীতির কারণে আড়াই বছর ধরে তা পুরোপুরি বন্ধ আছে। এ কারণে তারা মাদক পাচার থেকে সেটা এখন পুষিয়ে নিচ্ছে। নুরুজ্জামানের মতোই মুর্শিদাবাদের সীমান্ত গ্রাম বিলবোরা কোপরার বাসিন্দা জহুরুল মণ্ডল বলেন, বিএসএফও কিছু কিছু মাদক আটক করছে। তবে যে পরিমাণ পাচার হচ্ছে সে তুলনায় আটক হচ্ছে বেশ কম। জহুরুলের মতে, বিএসএফ চাইলে সীমান্তে গরু পাচার বন্ধের মতো মাদক পাচারও শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পারে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ গ্রামের একাধিক জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করে বলেন, করোনাকালে বিজিবির টহল কিছুটা কমেছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সীমান্তে মাদক পাচারকারীরা তৎপর হয়েছে।

রাজশাহী বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তুহিন মাসুদ বলেন, একটা সময় বাংলাদেশে মাদক পাচার প্রতিরোধে বিএসএফ বেশ নিষ্ক্রিয় ছিল। তবে বিভিন্ন সময় বিজিবি-বিএসএফ পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলনে মাদক পাচার বন্ধে বিএসএফকে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে। ফলে সম্প্রতি বিএসএফ সীমান্তে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছে। কর্নেল তুহিন আরও বলেন, বিএসএফ চাইলেই মাদক পাচার পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে। প্রতিটি সীমান্তে তাদের ঘনঘন ফাঁড়ি আছে। ভালো সড়ক নেটওয়ার্ক ও যানবাহন আছে। অপরদিকে, সীমান্ত এলাকায় বিজিবিকে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এক ফাঁড়ি থেকে আরেক ফাঁড়ির দূরত্ব অনেক। সড়ক নেটওয়ার্ক ও যানবাহন বলতেও তেমন কিছু নেই। নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া বিজিবির পক্ষে পাচারকারীদের গতিবিধি জানা কঠিন। এরপরও রাজশাহী সেক্টরের অধীন উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৪০০ কিলোমিটার সীমান্তে মাদক চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবি সতর্ক রয়েছে।

জানা গেছে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট ও বৃহত্তর দিনাজপুর সীমান্তপথে সম্প্রতি মাদক, বিশেষ করে ফেনসিডিল ও ইয়াবা পাচার বেড়েছে। বিজিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সীমান্তপথে চার ধরনের মাদক পাচার হয়ে আসছে। আগে যেসব সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে গরু-মহিষ পাচার হতো, এখন সেসব পয়েন্ট মাদক পাচারের হটস্পট হয়ে উঠেছে। বিজিবির তথ্যমতে, গোদাগাড়ী সীমান্তের ওপারে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলায় হেরোইন তৈরির অর্ধশতাধিক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা সম্পর্কে বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। সেখানে জন্ম নিরোধক বড়িকে রং করে মাদকের মিশ্রণ দিয়ে নকল ইয়াবাও তৈরি করা হচ্ছে। এ তিন ধরনের মাদকের পাশাপাশি ও বিভিন্ন নামে তৈরি নেশার ট্যাবলেটও পাচার হয়ে আসছে। মাঝেমধ্যে গাঁজার চালানও ধরা পড়ে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বহুমুখী তৎপরতার পরও মাদক পাচার না কমার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল বাতেন বলেন, বিভিন্ন থানায় প্রতিদিন যে সংখ্যক মামলা হচ্ছে তার ৯০ ভাগই মাদকের মামলা। দৈনিক বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার হচ্ছে। পাচারকারী ও ব্যবসায়ী আটক হচ্ছে। মাদক পাচার ও বিক্রি রোধে পুলিশ সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।