মোংলা বন্দরে সাধারণ শ্রমিক থেকে কোটিপতি সাগর
jugantor
মোংলা বন্দরে সাধারণ শ্রমিক থেকে কোটিপতি সাগর

  আমির হোসেন আমু, মোংলা  

০১ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মোংলার বটতলার সাগর শেখ (৪৮)। পেশায় সাধারণ শ্রমিক। মোংলা বন্দরে কন্টেইনারে আসা আমদানি-রফতানি পণ্য চুরি করেই ভাগ্য বদলেছে তার। তিনি এখন কোটিপতি। সাগর শেখের নামে-বেনামে সম্পত্তি ছাড়াও নগদ কয়েক কোটি টাকা রয়েছে। আলাউদ্দিনের চেরাগেই যেন তার এ উত্থান। রাতকে দিন আর দিনকে রাত মনে করেন তিনি। তার অবৈধ টাকাই ম্যানেজ হয় সব কিছু, আর টাকার জোরেই প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের কব্জায় রাখার দাম্ভিকতা রয়েছে তার। নগদ টাকা আর সম্পত্তি ছাড়াও সাগরের রয়েছে একাধিক স্ত্রী। এছাড়াও বান্ধবীও রয়েছে অসংখ্য। এসব বান্ধবীদের মনোরঞ্জন ছাড়াও ব্যবহৃত হয় আমদানি-রফতানিকারক ব্যবসায়ী ও দাফতরিক কাজে।

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে খোলস বদলেও নানা চরিত্রে নিজেকে বদলেছেন তিনি। তবে ২০ বছরে ধরে মোংলা পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিবেশী ও পরিচিতজনের কাছে এ সাগর এখনও যেন রূপকথার গল্প। মোংলা পৌর এলাকায় মিয়াপাড়া ও বটতলায়সহ একাধিক বাড়ি রয়েছে সাগরের নামে। এর মধ্যে বটতলায় বিলাসবহুল ৫ তলা ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে। এছাড়া উপজেলার বুরবুড়িয়া, পার্শ্ববর্তী উপজেলা মোড়েলগঞ্জ ও খুলনার দাকোপসহ বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি সাগর নামে-বেনামে ক্রয় করেছেন অন্তত ৩০ একর জমি।

এ সাগর শেখ কখনও স্টীভিডরর্স, সিএ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারক হিসেবে বিভিন্ন মহলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। সম্প্রতি মোংলা বন্দর থেকে আমদানি করা সাড়ে ৩ কোটি টাকার চুরি হওয়া পণ্য (কাপড়) উদ্ধার হওয়ার পর সাগরকে নিয়ে বেরিয়ে আসছে নানা অজানা তথ্য। আর এ নিয়ে রীতিমতো বিস্মিত কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

জানা যায়, পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ ভিত্তিতে এক সময় শ্রমিক হিসেবে কাজ করত সাগর শেখ। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার-পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মোংলা বন্দর ডক শ্রমিক পরিচালনা বোর্ড বিলুপ্ত হলে বন্দর জেটিতে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের অধীনে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। কন্টেইনারের আমদানি-রফতানি পণ্য খালাস বোঝাইয়ে শ্রমিকের কাজ করতেই ভাগ্য বদলাতে শুরু করে। সু-চতুর সাগর অল্প সময়ের মধেই সিঅ্যান্ডএফ এজন্টেদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। আর বন্দর জেটিতে শ্রমিক সরদারের তালিকায় নাম লেখান। ভাগিয়ে নেন ২৫ থেকে ৩০টি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কন্টেইনার পণ্য খালাস-বোঝাই কাজ। বন্দর জেটির কন্টেইনার ইয়ার্ডে শ্রমিকের কাজের বছরখানেক যেতে না যেতেই গড়ে তোলেন বিদেশ থেকে আমদানি পণ্য চোরাই পথে পাচারের বিশাল সিন্ডিকেট। বিদেশ থেকে আসা কন্টেইনার থেকে প্যান্ট পিস, টি-শার্ট, জুতা, দামি মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও ইলেকট্রিক পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য চুরি ও পাচার করে আসছিল সাগর নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

কন্টেইনারের সিলগালা করা তালা খুলে পণ্য বের করে ঠিকঠাক লেবেলে বেশ দক্ষ সাগর নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট সদস্যরা। এ কাজে ব্যবহৃত সব কিছুই রয়েছে তাদের কাছে। কোন কন্টেইনারে কী আছে তাও আগ থেকেই খোঁজ রাখেন তারা। কন্টেইনার ইয়ার্ডের নিরাপত্তায় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কাস্টমস নানা উদ্যোগ নিলেও অধরা থেকে যায় এ চক্রের সদস্যরা। আমদানিকারকদের আনা কোটি কোটি টাকার পণ্য চুরিতে ফুলেফেঁপে উঠেছেন তারা। এতে অনেক আমদানিকারক নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছেন। বন্দর জেটিকেন্দ্রিক এ পণ্য চুরি ও পাচারকাজে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মচারী, সিঅ্যান্ডএফ শ্রমিক সরদার ও তাদের সহযোগী শ্রমিক, ট্রাক ড্রাইভার, কতিপয় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ অন্তত ২৬ সদস্যের টিম রয়েছে। এ চক্রের সদস্যরা সবাই লাখোপতি। সম্প্রতি রাজধানীর ইসলামপুর থেকে চোরাই কাপড় উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় লালবাগ গোয়েন্দা পুলিশ এখন পর্যন্ত সাগরসহ ৫ জনকে আটক করেছে। আটক ব্যক্তির দেয়া তথ্য অনুযায়ী বেরিয়ে আসছে থলের বিড়াল। এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা লালবাগ গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মনিরুল ইসলাম বলেন, পণ্য চুরির মামলার নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সিন্ডিকেট চক্রের সদস্যদের ওপর নজরদারি রয়েছে। এ চক্রের লিংক রয়েছে মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকা পর্যন্ত। তবে পণ্য চুরি ও লোপাট কাজে জড়িত সিন্ডিকেট চক্রের সদস্যদের মধ্যে কেউ কেউ বন্দর ও সরকারি কর্মচারী রয়েছেন। তাদের আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের অনুমতি চাওয়া হয়েছে।

মোংলা বন্দরে সাধারণ শ্রমিক থেকে কোটিপতি সাগর

 আমির হোসেন আমু, মোংলা 
০১ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মোংলার বটতলার সাগর শেখ (৪৮)। পেশায় সাধারণ শ্রমিক। মোংলা বন্দরে কন্টেইনারে আসা আমদানি-রফতানি পণ্য চুরি করেই ভাগ্য বদলেছে তার। তিনি এখন কোটিপতি। সাগর শেখের নামে-বেনামে সম্পত্তি ছাড়াও নগদ কয়েক কোটি টাকা রয়েছে। আলাউদ্দিনের চেরাগেই যেন তার এ উত্থান। রাতকে দিন আর দিনকে রাত মনে করেন তিনি। তার অবৈধ টাকাই ম্যানেজ হয় সব কিছু, আর টাকার জোরেই প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের কব্জায় রাখার দাম্ভিকতা রয়েছে তার। নগদ টাকা আর সম্পত্তি ছাড়াও সাগরের রয়েছে একাধিক স্ত্রী। এছাড়াও বান্ধবীও রয়েছে অসংখ্য। এসব বান্ধবীদের মনোরঞ্জন ছাড়াও ব্যবহৃত হয় আমদানি-রফতানিকারক ব্যবসায়ী ও দাফতরিক কাজে।

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে খোলস বদলেও নানা চরিত্রে নিজেকে বদলেছেন তিনি। তবে ২০ বছরে ধরে মোংলা পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিবেশী ও পরিচিতজনের কাছে এ সাগর এখনও যেন রূপকথার গল্প। মোংলা পৌর এলাকায় মিয়াপাড়া ও বটতলায়সহ একাধিক বাড়ি রয়েছে সাগরের নামে। এর মধ্যে বটতলায় বিলাসবহুল ৫ তলা ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে। এছাড়া উপজেলার বুরবুড়িয়া, পার্শ্ববর্তী উপজেলা মোড়েলগঞ্জ ও খুলনার দাকোপসহ বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি সাগর নামে-বেনামে ক্রয় করেছেন অন্তত ৩০ একর জমি।

এ সাগর শেখ কখনও স্টীভিডরর্স, সিএ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারক হিসেবে বিভিন্ন মহলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। সম্প্রতি মোংলা বন্দর থেকে আমদানি করা সাড়ে ৩ কোটি টাকার চুরি হওয়া পণ্য (কাপড়) উদ্ধার হওয়ার পর সাগরকে নিয়ে বেরিয়ে আসছে নানা অজানা তথ্য। আর এ নিয়ে রীতিমতো বিস্মিত কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

জানা যায়, পণ্যবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ ভিত্তিতে এক সময় শ্রমিক হিসেবে কাজ করত সাগর শেখ। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার-পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মোংলা বন্দর ডক শ্রমিক পরিচালনা বোর্ড বিলুপ্ত হলে বন্দর জেটিতে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের অধীনে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। কন্টেইনারের আমদানি-রফতানি পণ্য খালাস বোঝাইয়ে শ্রমিকের কাজ করতেই ভাগ্য বদলাতে শুরু করে। সু-চতুর সাগর অল্প সময়ের মধেই সিঅ্যান্ডএফ এজন্টেদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। আর বন্দর জেটিতে শ্রমিক সরদারের তালিকায় নাম লেখান। ভাগিয়ে নেন ২৫ থেকে ৩০টি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কন্টেইনার পণ্য খালাস-বোঝাই কাজ। বন্দর জেটির কন্টেইনার ইয়ার্ডে শ্রমিকের কাজের বছরখানেক যেতে না যেতেই গড়ে তোলেন বিদেশ থেকে আমদানি পণ্য চোরাই পথে পাচারের বিশাল সিন্ডিকেট। বিদেশ থেকে আসা কন্টেইনার থেকে প্যান্ট পিস, টি-শার্ট, জুতা, দামি মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও ইলেকট্রিক পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য চুরি ও পাচার করে আসছিল সাগর নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

কন্টেইনারের সিলগালা করা তালা খুলে পণ্য বের করে ঠিকঠাক লেবেলে বেশ দক্ষ সাগর নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট সদস্যরা। এ কাজে ব্যবহৃত সব কিছুই রয়েছে তাদের কাছে। কোন কন্টেইনারে কী আছে তাও আগ থেকেই খোঁজ রাখেন তারা। কন্টেইনার ইয়ার্ডের নিরাপত্তায় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কাস্টমস নানা উদ্যোগ নিলেও অধরা থেকে যায় এ চক্রের সদস্যরা। আমদানিকারকদের আনা কোটি কোটি টাকার পণ্য চুরিতে ফুলেফেঁপে উঠেছেন তারা। এতে অনেক আমদানিকারক নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছেন। বন্দর জেটিকেন্দ্রিক এ পণ্য চুরি ও পাচারকাজে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মচারী, সিঅ্যান্ডএফ শ্রমিক সরদার ও তাদের সহযোগী শ্রমিক, ট্রাক ড্রাইভার, কতিপয় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ অন্তত ২৬ সদস্যের টিম রয়েছে। এ চক্রের সদস্যরা সবাই লাখোপতি। সম্প্রতি রাজধানীর ইসলামপুর থেকে চোরাই কাপড় উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় লালবাগ গোয়েন্দা পুলিশ এখন পর্যন্ত সাগরসহ ৫ জনকে আটক করেছে। আটক ব্যক্তির দেয়া তথ্য অনুযায়ী বেরিয়ে আসছে থলের বিড়াল। এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা লালবাগ গোয়েন্দা পুলিশের এসআই মনিরুল ইসলাম বলেন, পণ্য চুরির মামলার নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সিন্ডিকেট চক্রের সদস্যদের ওপর নজরদারি রয়েছে। এ চক্রের লিংক রয়েছে মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকা পর্যন্ত। তবে পণ্য চুরি ও লোপাট কাজে জড়িত সিন্ডিকেট চক্রের সদস্যদের মধ্যে কেউ কেউ বন্দর ও সরকারি কর্মচারী রয়েছেন। তাদের আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের অনুমতি চাওয়া হয়েছে।