করোনায়ও উৎপাদন বিক্রিতে রেকর্ড
jugantor
মধ্যপাড়া পাথর খনি
করোনায়ও উৎপাদন বিক্রিতে রেকর্ড

  একরাম তালুকদার, দিনাজপুর  

০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বৈশ্বিক করোনা মহামারী পরিস্থিতিতে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চললেও পার্শ্ববর্তী মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) পুরোদমে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দেশের একমাত্র পাথর খনিটিতে রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদনের পাশাপাশি বিক্রিও বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ। করোনা পরিস্থিতিতেও মাত্র সাড়ে ৩ মাসে পাথর তোলা হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টন, আর ৮ মাসে বিক্রি করেছে প্রায় ৯ লাখ টন। এতে রাজস্ব আয় হয়েছে ২২৪ কোটি টাকারও বেশি, যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।

২০০৭ সালে দেশের একমাত্র পাথর খনি দিনাজপুরের মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে। প্রথম অবস্থায় খনি থেকে দৈনিক দেড় হাজার থেকে ১৮০০ টন পাথর তোলা হলেও পরে তা নেমে আসে মাত্র ৫০০ টনে। এমন অবস্থায় উৎপাদন বাড়াতে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৯২ লাখ টন পাথর তোলার চুক্তি করে খনির উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয় বেলারুশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম-জিটিসি’কে। কিন্তু জিটিসি জানুয়ারি পর্যন্ত ৬ বছরে তুলছে মাত্র ৩৭ লাখ টন পাথর। খনি কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ও মতবিরোধের কারণেই খনির উৎপাদন ব্যাহত হয় বলে নিশ্চিত হয় পেট্রোবাংলা।

গত বছরের ৭ নভেম্বর এবিএম কামরুজ্জামান মধ্যপাড়া পাথর খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেয়ার পর খনি কর্তৃপক্ষ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্কের অবনতির কারণ চিহ্নিতকরণের জন্য ৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে পেট্রোবাংলা। পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) শাহনাজ বেগমের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি সম্পর্কের অবনতির কারণ হিসেবে উভয়পক্ষকেই দায়ী করে। কমিটির প্রতিবেদনে খনির উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার জন্য খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঘন ঘন পরিবর্তনকে দায়ী করে। এর মধ্যে ২০ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায় এবং করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে ২৪ মার্চ খনির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন চালু রাখার জন্য ২৯ জুলাই ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথডের ভিত্তিতে জিটিসিকে পাথর তোলার জন্য এক বছরের জন্য মেয়াদ বৃদ্ধি করে পেট্রোবাংলা। চুক্তি অনুযায়ী, ১১.১০ লাখ টন পাথর এবং দুটি খনির দুটি স্টোভ উন্নয়নের কথা বলা হয়। এই চুক্তি আগামী বছরের ১৩ জুলাই শেষ হবে। চুক্তির ভিত্তিতে করোনা মহামারী পরিস্থিতিতেও ১৩ আগস্ট থেকে আবার পাথর তোলা শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসি। জিটিসির অধীনে প্রায় ৮০০ শ্রমিক অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে তিন শিফটে দৈনিক ৫ হাজার টন পাথর তোলা হয়।

খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম কামরুজ্জামান জানান, ১৩ আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৩ লাখ ৬০ হাজার টন পাথর তোলা হয়। আর করোনা পরিস্থিতিতেও এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ টন পাথর বিক্রি করে রাজস্ব আয় হয়েছে ২২৪ কোটি টাকা। উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। এজন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসিকে ধন্যবাদ জানান তিনি। সম্প্রতি যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, দেশের বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহার করছে। এর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বাংলাদেশ রেলওয়ের পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু সেতুর রেল সংযোগ নির্মাণ প্রকল্প। এছাড়া দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প মধ্যপাড়া খনির পাথর ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এতে উৎপাদন ও বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আয়ে খনিটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। খনির ইয়ার্ডে বর্তমানে পাথর মজুদ আছে ২ লাখ টন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসির মহাব্যবস্থাপক জাবেদ সিদ্দিকী জানান, করোনা মহামারী পরিস্থিতিতেও খনির উৎপাদন অব্যাহত রাখা তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। খনি কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় তারা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম হয়েছেন। দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা এই খনিটিকে করোনা পরিস্থিতিতেও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পেরেছেন। এজন্য খনি কর্তৃপক্ষকে সার্বিক সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। বর্তমানে দৈনিক ৫ হাজার টন পাথর তোলা হচ্ছে, অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা এই উৎপাদন আরও বাড়াতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন জাবেদ সিদ্দিকী। করোনা পরিস্থিতিতেও ৮ শতাধিক শ্রমিক কাজ করে পরিবার-পরিজনের আহার জোগাতে পারায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও খনি কর্তৃপক্ষের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন শ্রমিকরা। করোনা পরিস্থিতির কারণে এখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে মধ্যপাড়া পাথর খনির পার্শ্ববর্তী বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে উৎপাদন একেবারেই নেমে এসেছে।

মধ্যপাড়া পাথর খনি

করোনায়ও উৎপাদন বিক্রিতে রেকর্ড

 একরাম তালুকদার, দিনাজপুর 
০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বৈশ্বিক করোনা মহামারী পরিস্থিতিতে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চললেও পার্শ্ববর্তী মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) পুরোদমে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দেশের একমাত্র পাথর খনিটিতে রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদনের পাশাপাশি বিক্রিও বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ। করোনা পরিস্থিতিতেও মাত্র সাড়ে ৩ মাসে পাথর তোলা হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টন, আর ৮ মাসে বিক্রি করেছে প্রায় ৯ লাখ টন। এতে রাজস্ব আয় হয়েছে ২২৪ কোটি টাকারও বেশি, যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।

২০০৭ সালে দেশের একমাত্র পাথর খনি দিনাজপুরের মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে। প্রথম অবস্থায় খনি থেকে দৈনিক দেড় হাজার থেকে ১৮০০ টন পাথর তোলা হলেও পরে তা নেমে আসে মাত্র ৫০০ টনে। এমন অবস্থায় উৎপাদন বাড়াতে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৯২ লাখ টন পাথর তোলার চুক্তি করে খনির উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয় বেলারুশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম-জিটিসি’কে। কিন্তু জিটিসি জানুয়ারি পর্যন্ত ৬ বছরে তুলছে মাত্র ৩৭ লাখ টন পাথর। খনি কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ও মতবিরোধের কারণেই খনির উৎপাদন ব্যাহত হয় বলে নিশ্চিত হয় পেট্রোবাংলা।

গত বছরের ৭ নভেম্বর এবিএম কামরুজ্জামান মধ্যপাড়া পাথর খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেয়ার পর খনি কর্তৃপক্ষ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্কের অবনতির কারণ চিহ্নিতকরণের জন্য ৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে পেট্রোবাংলা। পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) শাহনাজ বেগমের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি সম্পর্কের অবনতির কারণ হিসেবে উভয়পক্ষকেই দায়ী করে। কমিটির প্রতিবেদনে খনির উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার জন্য খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঘন ঘন পরিবর্তনকে দায়ী করে। এর মধ্যে ২০ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায় এবং করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে ২৪ মার্চ খনির উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন চালু রাখার জন্য ২৯ জুলাই ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথডের ভিত্তিতে জিটিসিকে পাথর তোলার জন্য এক বছরের জন্য মেয়াদ বৃদ্ধি করে পেট্রোবাংলা। চুক্তি অনুযায়ী, ১১.১০ লাখ টন পাথর এবং দুটি খনির দুটি স্টোভ উন্নয়নের কথা বলা হয়। এই চুক্তি আগামী বছরের ১৩ জুলাই শেষ হবে। চুক্তির ভিত্তিতে করোনা মহামারী পরিস্থিতিতেও ১৩ আগস্ট থেকে আবার পাথর তোলা শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসি। জিটিসির অধীনে প্রায় ৮০০ শ্রমিক অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে তিন শিফটে দৈনিক ৫ হাজার টন পাথর তোলা হয়।

খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম কামরুজ্জামান জানান, ১৩ আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৩ লাখ ৬০ হাজার টন পাথর তোলা হয়। আর করোনা পরিস্থিতিতেও এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ টন পাথর বিক্রি করে রাজস্ব আয় হয়েছে ২২৪ কোটি টাকা। উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। এজন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসিকে ধন্যবাদ জানান তিনি। সম্প্রতি যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, দেশের বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহার করছে। এর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বাংলাদেশ রেলওয়ের পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু সেতুর রেল সংযোগ নির্মাণ প্রকল্প। এছাড়া দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প মধ্যপাড়া খনির পাথর ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এতে উৎপাদন ও বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আয়ে খনিটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। খনির ইয়ার্ডে বর্তমানে পাথর মজুদ আছে ২ লাখ টন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিটিসির মহাব্যবস্থাপক জাবেদ সিদ্দিকী জানান, করোনা মহামারী পরিস্থিতিতেও খনির উৎপাদন অব্যাহত রাখা তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। খনি কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় তারা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম হয়েছেন। দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা এই খনিটিকে করোনা পরিস্থিতিতেও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পেরেছেন। এজন্য খনি কর্তৃপক্ষকে সার্বিক সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। বর্তমানে দৈনিক ৫ হাজার টন পাথর তোলা হচ্ছে, অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা এই উৎপাদন আরও বাড়াতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন জাবেদ সিদ্দিকী। করোনা পরিস্থিতিতেও ৮ শতাধিক শ্রমিক কাজ করে পরিবার-পরিজনের আহার জোগাতে পারায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও খনি কর্তৃপক্ষের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন শ্রমিকরা। করোনা পরিস্থিতির কারণে এখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে মধ্যপাড়া পাথর খনির পার্শ্ববর্তী বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে উৎপাদন একেবারেই নেমে এসেছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন