অপরাধী চিনিয়ে দিচ্ছে প্রযুক্তি
jugantor
অপরাধী চিনিয়ে দিচ্ছে প্রযুক্তি
দ্রুত উদ্ঘাটন হচ্ছে ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধের রহস্য * আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে কমেছে সোর্সনির্ভরতা

  ইকবাল হাসান ফরিদ  

০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ডোমের সহযোগী হিসেবে কাজ করত মুন্না ভগত। রাতে লাশ পাহারা দেয়ার সুযোগে তরুণীদের মৃতদেহের সঙ্গে শারীরিক সংসর্গে লিপ্ত হতো সে। একে একে ৬ তরুণীর লাশের ডিএনএ পরীক্ষায় যখন একই অপরাধীর ডিএনএর মিল পাওয়ায় সিআইডি তদন্তে নামে। পরে কৌশলে মুন্নার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষা করলে মিলে যায়। এরপর মুন্নাকে গ্রেফতার করলে সে তার অপরাধ স্বীকার করে।

এভাবে অপরাধী শনাক্ত ও ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঝুঁকছে প্রযুক্তির দিকে। কমেছে সোর্সনির্ভরতা। প্রযুক্তির ব্যবহারে অল্প সময়ে উদ্ঘাটন করা হচ্ছে ক্লুলেস হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপরাধের রহস্য। আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে অপরাধীদের।

অথচ এক যুগ আগেও অপরাধ তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যতম ভরসা ছিল পাবলিক সোর্স। তবে এখন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও সোর্সের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, সোর্সের দেয়া তথ্যে অপরাধ তদন্ত এবং অপরাধী গ্রেফতার যেমন বিলম্ব হয়, তেমনি নিরপরাধ কেউ হয়রানি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে সোর্সরা অনেককে হয়রানির চেষ্টা করে। আবার তারা সুবিধা নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতাও করে। এদিকে সোর্সরা এখন মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটার সঙ্গে সঙ্গে নিহতের নাম্বার কব্জায় নেয়া হয়। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং সেখানে অবস্থানরতদের ফোন নাম্বার যাচাই-বাছাই করে সন্দেহভাজনদের দিয়ে খোলা হয় তদন্তের খাতা। অন্যান্য জটিল অপরাধ শনাক্তেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।

তদন্তে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধ ঘটামাত্রই খোঁজা হয় সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোনো সিসি ক্যামেরা আছে কিনা। এরপর অপরাধ শনাক্তে ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়। কোথাও ক্যামেরা না থাকলেও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী সন্দেহভাজন ব্যক্তির চেহারা এঁকে ফেলার প্রযুক্তিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং বিশেষ কিছু অ্যাপের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে জনগণের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম (সিটি) ইউনিটের অ্যাপ ‘হ্যালো সিটি’ এবং র?্যাবের ‘রিপোর্ট টু র?্যাব’-এর মধ্যেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে তথ্য পেয়ে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের ধরতে সুবিধা পাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এছাড়া ফেসবুক মেসেঞ্জারেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন কর্মকর্তাকে অপরাধ সম্পর্কে তথ্য দিয়ে থাকেন সাধারণ মানুষ।

এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিক্রয়করণ যন্ত্রপাতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক রোবট। দূরনিয়ন্ত্রিত রোবটগুলো বোমা খোঁজা, নিষ্ক্রিয় করার কাজও করছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পিটিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের দিন শেষ। এখন সময় প্রযুক্তির।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট, এন্ট্রি টেরোরিজম ইউনিট, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআইসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা অপরাধ তদন্তে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে। থানা পুলিশের অভিজ্ঞ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) আদলে গড়া পিবিআই ইউনিটে যুক্ত আছে বিশ্বের অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি। প্রযুক্তির ব্যবহারে নির্ভুল তদন্তের নজিরও তৈরি করেছে এ সংস্থাটি।

পিবিআই’র এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অপরাধ সংঘটনের পর মোবাইল ভেঙে ফেললেও প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধীকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। পিবিআইয়ের হাতে সর্বাধুনিক এ প্রযুক্তিও রয়েছে। তাছাড়া হত্যা, সাইবার অপরাধ, প্রতারণাসহ ১৪ ধরনের ক্লুলেস ও ভয়ঙ্কর অপরাধের মামলার তদন্ত করছে পিবিআই। পিবিআই’র ল্যাবে বিভিন্ন ধরনের বিশেষ ডিভাইস ও সফটওয়্যার ব্যবহার করে অপরাধের নাড়িনক্ষত্র বের করে আনা হচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে তদন্তভার পাওয়া মামলার প্রায় ৯৫ শতাংশের তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দিতে পারছেন কর্মকর্তারা। তিনি বলেন, অপরাধ শনাক্তে আরও অনেক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা অতি গোপনীয়। সোর্স নির্ভরতা থেকে প্রযুক্তির ব্যবহারই নিরাপদ। এ ক্ষেত্রে অপরাধ তদন্ত নিরপেক্ষ হয় বলে তিনি জানান।

পিবিআই’র প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অপরাধের তথ্য প্রমাণ উদ্ধার এবং অপরাধীর গতিপথ শনাক্তে অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে। একসময় শুধু সোর্সনির্ভর তদন্ত ছিল। তখন মনে হতো সোর্স কোনো ভিন গ্রহের মানুষ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেয়েও শক্তিশালী। তখন অধিকাংশ মামলাই শনাক্ত হতো সোর্সের দেয়া তথ্যের সূত্র ধরে। আর এখন ৯০ শতাংশের বেশি মামলার তদন্ত এগিয়ে নেয়া হয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা যুগান্তরকে বলেন, প্রযুক্তির উৎকর্ষকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধ দমনে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাচ্ছেন। আমরা সার্বিকভাবে চেষ্টা করি, প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এর সর্বোচ্চ সদব্যবহার করে অপরাধ দমন করতে। তিনি বলেন, তদন্তে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি প্রচলিত যে পরীক্ষিত পন্থাগুলো রয়েছে সেগুলো আমরা ব্যবহার করছি।

সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, নির্ভুল তদন্ত করতে উন্নত দেশগুলো থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে আপডেট প্রযুক্তি আনা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের নিয়মিত বিদেশে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

অধিকাংশ অপরাধে ইলেকট্রনিক নানা ডিভাইস ও মাধ্যম ব্যবহার হচ্ছে। অপরাধীরা সত্য আড়াল করতে ইলেকট্রনিক মাধ্যমের তথ্যগুলো ডিভাইস থেকে দ্রুত মুছে ফেলে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ফরেনসিক ল্যাব সেই তথ্যও উদ্ধার করে আনে। পিবিআই’র ফরেনসিক ল্যাবে ১১টির বেশি প্রযুক্তি সুবিধা ব্যবহার করা হয়।

ফরেনসিক ওয়ার্কস্টেশনে (অত্যাধুনিক ল্যাপটপ) বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে যে কোনো ল্যাপটপ থেকে যে কোনো তথ্য বের করে আনা হয়। ফরেনসিক ইমার্জিং সিস্টেম টিডিথ্রি সরঞ্জাম ব্যবহার করে যে কোনো হার্ডডিস্ক থেকে তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব। পাসওয়ার্ড বা প্যাটার্ন দিয়ে বন্ধ করে রাখা মোবাইলের ওপর বিশেষ ক্যামেরা ধরলেই বেরিয়ে আসে ওই পাসওয়ার্ড বা প্যাটার্ন। সার্ভার ও কম্পিউটারে থাকা অসংখ্য তথ্যের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত তথ্য খুঁজে দেয় ডাটা রিকভারি স্টিক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যদি কেউ অশ্লীল কিছু ছড়িয়ে দেয়, পরে নিজের মোবাইল ফোন থেকে তা মুছেও ফেলে তাহলেও ডিজিটাল ময়নাতদন্তে সেটিও বের করে আনতে পারে ল্যাবটি। পুলিশ বাহিনীতে প্রযুক্তিগত তদন্তে সহায়তায় ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি, সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেন্টার, সাইবার ক্রাইম ট্রেনিং সেন্টারসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। অপরাধী শনাক্তে পুলিশ গড়ে তুলেছে বিশাল তথ্য ভাণ্ডার। প্রায় এক যুগ ধরে কারাগারে যাওয়া সব সন্দেহভাজনেরই আঙুলের ছাপ, ডিএনএ, চোখের আইরিশসহ পাঁচ ধরনের শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য তথ্য ভাণ্ডারে সংগ্রহে রাখা হচ্ছে। এর সঙ্গে অপরাধী বা অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ শনাক্তে ব্যবহৃত হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্রের বিশাল তথ্য ভাণ্ডার। ছদ্মপরিচয়ে থাকা কোনো ব্যক্তি গ্রেফতারের পরে আঙুলের ছাপ দেয়ামাত্রই তার আসল পরিচয় ওঠে আসে জাতীয় তথ্য ভাণ্ডার থেকে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো থানায় তার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা অতি স্বল্প সময়েই জানতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

অপরাধী চিনিয়ে দিচ্ছে প্রযুক্তি

দ্রুত উদ্ঘাটন হচ্ছে ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধের রহস্য * আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে কমেছে সোর্সনির্ভরতা
 ইকবাল হাসান ফরিদ 
০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ডোমের সহযোগী হিসেবে কাজ করত মুন্না ভগত। রাতে লাশ পাহারা দেয়ার সুযোগে তরুণীদের মৃতদেহের সঙ্গে শারীরিক সংসর্গে লিপ্ত হতো সে। একে একে ৬ তরুণীর লাশের ডিএনএ পরীক্ষায় যখন একই অপরাধীর ডিএনএর মিল পাওয়ায় সিআইডি তদন্তে নামে। পরে কৌশলে মুন্নার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষা করলে মিলে যায়। এরপর মুন্নাকে গ্রেফতার করলে সে তার অপরাধ স্বীকার করে।

এভাবে অপরাধী শনাক্ত ও ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঝুঁকছে প্রযুক্তির দিকে। কমেছে সোর্সনির্ভরতা। প্রযুক্তির ব্যবহারে অল্প সময়ে উদ্ঘাটন করা হচ্ছে ক্লুলেস হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপরাধের রহস্য। আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে অপরাধীদের।

অথচ এক যুগ আগেও অপরাধ তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যতম ভরসা ছিল পাবলিক সোর্স। তবে এখন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও সোর্সের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, সোর্সের দেয়া তথ্যে অপরাধ তদন্ত এবং অপরাধী গ্রেফতার যেমন বিলম্ব হয়, তেমনি নিরপরাধ কেউ হয়রানি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে সোর্সরা অনেককে হয়রানির চেষ্টা করে। আবার তারা সুবিধা নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতাও করে। এদিকে সোর্সরা এখন মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটার সঙ্গে সঙ্গে নিহতের নাম্বার কব্জায় নেয়া হয়। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং সেখানে অবস্থানরতদের ফোন নাম্বার যাচাই-বাছাই করে সন্দেহভাজনদের দিয়ে খোলা হয় তদন্তের খাতা। অন্যান্য জটিল অপরাধ শনাক্তেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।

তদন্তে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধ ঘটামাত্রই খোঁজা হয় সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোনো সিসি ক্যামেরা আছে কিনা। এরপর অপরাধ শনাক্তে ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়। কোথাও ক্যামেরা না থাকলেও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী সন্দেহভাজন ব্যক্তির চেহারা এঁকে ফেলার প্রযুক্তিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং বিশেষ কিছু অ্যাপের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে জনগণের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম (সিটি) ইউনিটের অ্যাপ ‘হ্যালো সিটি’ এবং র?্যাবের ‘রিপোর্ট টু র?্যাব’-এর মধ্যেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে তথ্য পেয়ে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের ধরতে সুবিধা পাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এছাড়া ফেসবুক মেসেঞ্জারেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন কর্মকর্তাকে অপরাধ সম্পর্কে তথ্য দিয়ে থাকেন সাধারণ মানুষ।

এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিক্রয়করণ যন্ত্রপাতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক রোবট। দূরনিয়ন্ত্রিত রোবটগুলো বোমা খোঁজা, নিষ্ক্রিয় করার কাজও করছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পিটিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের দিন শেষ। এখন সময় প্রযুক্তির।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট, এন্ট্রি টেরোরিজম ইউনিট, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআইসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা অপরাধ তদন্তে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে। থানা পুলিশের অভিজ্ঞ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) আদলে গড়া পিবিআই ইউনিটে যুক্ত আছে বিশ্বের অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি। প্রযুক্তির ব্যবহারে নির্ভুল তদন্তের নজিরও তৈরি করেছে এ সংস্থাটি।

পিবিআই’র এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অপরাধ সংঘটনের পর মোবাইল ভেঙে ফেললেও প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধীকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। পিবিআইয়ের হাতে সর্বাধুনিক এ প্রযুক্তিও রয়েছে। তাছাড়া হত্যা, সাইবার অপরাধ, প্রতারণাসহ ১৪ ধরনের ক্লুলেস ও ভয়ঙ্কর অপরাধের মামলার তদন্ত করছে পিবিআই। পিবিআই’র ল্যাবে বিভিন্ন ধরনের বিশেষ ডিভাইস ও সফটওয়্যার ব্যবহার করে অপরাধের নাড়িনক্ষত্র বের করে আনা হচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে তদন্তভার পাওয়া মামলার প্রায় ৯৫ শতাংশের তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দিতে পারছেন কর্মকর্তারা। তিনি বলেন, অপরাধ শনাক্তে আরও অনেক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, যা অতি গোপনীয়। সোর্স নির্ভরতা থেকে প্রযুক্তির ব্যবহারই নিরাপদ। এ ক্ষেত্রে অপরাধ তদন্ত নিরপেক্ষ হয় বলে তিনি জানান।

পিবিআই’র প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অপরাধের তথ্য প্রমাণ উদ্ধার এবং অপরাধীর গতিপথ শনাক্তে অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে। একসময় শুধু সোর্সনির্ভর তদন্ত ছিল। তখন মনে হতো সোর্স কোনো ভিন গ্রহের মানুষ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেয়েও শক্তিশালী। তখন অধিকাংশ মামলাই শনাক্ত হতো সোর্সের দেয়া তথ্যের সূত্র ধরে। আর এখন ৯০ শতাংশের বেশি মামলার তদন্ত এগিয়ে নেয়া হয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা যুগান্তরকে বলেন, প্রযুক্তির উৎকর্ষকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধ দমনে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাচ্ছেন। আমরা সার্বিকভাবে চেষ্টা করি, প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে এর সর্বোচ্চ সদব্যবহার করে অপরাধ দমন করতে। তিনি বলেন, তদন্তে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি প্রচলিত যে পরীক্ষিত পন্থাগুলো রয়েছে সেগুলো আমরা ব্যবহার করছি।

সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, নির্ভুল তদন্ত করতে উন্নত দেশগুলো থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে আপডেট প্রযুক্তি আনা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের নিয়মিত বিদেশে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

অধিকাংশ অপরাধে ইলেকট্রনিক নানা ডিভাইস ও মাধ্যম ব্যবহার হচ্ছে। অপরাধীরা সত্য আড়াল করতে ইলেকট্রনিক মাধ্যমের তথ্যগুলো ডিভাইস থেকে দ্রুত মুছে ফেলে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ফরেনসিক ল্যাব সেই তথ্যও উদ্ধার করে আনে। পিবিআই’র ফরেনসিক ল্যাবে ১১টির বেশি প্রযুক্তি সুবিধা ব্যবহার করা হয়।

ফরেনসিক ওয়ার্কস্টেশনে (অত্যাধুনিক ল্যাপটপ) বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে যে কোনো ল্যাপটপ থেকে যে কোনো তথ্য বের করে আনা হয়। ফরেনসিক ইমার্জিং সিস্টেম টিডিথ্রি সরঞ্জাম ব্যবহার করে যে কোনো হার্ডডিস্ক থেকে তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব। পাসওয়ার্ড বা প্যাটার্ন দিয়ে বন্ধ করে রাখা মোবাইলের ওপর বিশেষ ক্যামেরা ধরলেই বেরিয়ে আসে ওই পাসওয়ার্ড বা প্যাটার্ন। সার্ভার ও কম্পিউটারে থাকা অসংখ্য তথ্যের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত তথ্য খুঁজে দেয় ডাটা রিকভারি স্টিক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যদি কেউ অশ্লীল কিছু ছড়িয়ে দেয়, পরে নিজের মোবাইল ফোন থেকে তা মুছেও ফেলে তাহলেও ডিজিটাল ময়নাতদন্তে সেটিও বের করে আনতে পারে ল্যাবটি। পুলিশ বাহিনীতে প্রযুক্তিগত তদন্তে সহায়তায় ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি, সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেন্টার, সাইবার ক্রাইম ট্রেনিং সেন্টারসহ নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। অপরাধী শনাক্তে পুলিশ গড়ে তুলেছে বিশাল তথ্য ভাণ্ডার। প্রায় এক যুগ ধরে কারাগারে যাওয়া সব সন্দেহভাজনেরই আঙুলের ছাপ, ডিএনএ, চোখের আইরিশসহ পাঁচ ধরনের শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য তথ্য ভাণ্ডারে সংগ্রহে রাখা হচ্ছে। এর সঙ্গে অপরাধী বা অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ শনাক্তে ব্যবহৃত হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্রের বিশাল তথ্য ভাণ্ডার। ছদ্মপরিচয়ে থাকা কোনো ব্যক্তি গ্রেফতারের পরে আঙুলের ছাপ দেয়ামাত্রই তার আসল পরিচয় ওঠে আসে জাতীয় তথ্য ভাণ্ডার থেকে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো থানায় তার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা অতি স্বল্প সময়েই জানতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।