বঙ্গবন্ধুকে দাফনকারী সিরাজ প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চান
jugantor
বঙ্গবন্ধুকে দাফনকারী সিরাজ প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চান

  নড়াইল প্রতিনিধি  

১৯ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে ঘাতকের বুলেটে নিহত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দাফনকারী তৎকালীন পুলিশ সদস্য নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার বাসিন্দা কাজী সিরাজুল ইসলাম (৭৪) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। এই সাহসী মানুষটি সেদিন বঙ্গবন্ধুর লাশের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার সামনে বলেছিলেন, ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক মুসলিম রীতিতে বঙ্গবন্ধুকে গোসলসহ দাফনকাফন করতে হবে। সোমবার ইতনা গ্রামের নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের তিনি বঙ্গবন্ধুকে গোসল ও দাফনকাফনের মর্মস্পর্শী ঘটনা তুলে ধরেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ সময় সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আলী আজগর রাজা, শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র বিশ্বাস, কাজী সিরাজুল ইসলামের বাল্যবন্ধু কাজী বাবুল হোসেন, বড় ছেলে শরিফুল ইসলামসহ গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

কাজী সিরাজুল ইসলাম (কনস্টেবল নম্বর-২০৭৩) আরও বলেন, ১৯৭৫ সালের আগস্টে গোপালগঞ্জ তৎকালীন সাব-ডিভিশন পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) আব্দুল মান্নানের দেহরক্ষী ছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে-এ খবর শুনে ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল কাদের, এসডিপিও আব্দুল মান্নান এবং আমি স্পিডবোটে টুঙ্গিপাড়ায় যাই। এরই মধ্যে জানতে পারি বঙ্গবন্ধুর জন্য কবর খোঁড়ার কাজ চলছে। বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ হেলিকপ্টারে নিয়ে আসা হয় টুঙ্গিপাড়ায়। মরদেহের সঙ্গে সেনাবাহিনীর একজন মেজর ও সিপাহিকে দেখা যায়। হাসপাতাল ও পুলিশের লোকজন মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসেন। তখন ওই মেজরকে জানানো হলো, মনে হচ্ছে লাশের গোসল হয়নি। মেজর সাহেব রাগান্বিত স্বরে বললেন, কে কার গোসল করাবে? আমি বললাম, ‘মুসলমান হিসেবে তাকে গোসল করাতে হবে। কাফন দিতে হবে। এরপর দাফন করতে হবে।’ তখন তিনি বললেন, ‘আপনার বাড়ি কোথায়?’ বললাম, ‘নড়াইলের লোহাগড়া থানার ইতনা গ্রামে।’ মেজর বললেন, ‘দেরি করলে লাশ ছিনতাই হয়ে যেতে পারে।’ আমি বললাম, ‘১৪৪ ধারা জারি আছে। ফোর্স দিয়ে টুঙ্গিপাড়া ঘেরাও আছে।’ তিনি বললেন, ‘গোসল কে করাবে? কত সময় লাগবে?’ আমি বললাম, ‘গোসল আমি করাব এবং আধা ঘণ্টার মধ্যে হয়ে যাবে।’

এরপর গোসল করানোর অনুমতি দিলেন মেজর। বঙ্গবন্ধুর পরনে ছিল গাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। গোসল করানোর সময় বঙ্গবন্ধুর চাচাতো চাচা আব্দুল মান্নান টিনের দুটি পুরোনো বালতি আর সিলভারের একটি বদনা নিয়ে এলেন। গোসল করানোর জন্য আনা হলো ৫৭০ কাপড় কাচার সাবান। তখন এত খারাপ লাগল এই ভেবে যে, বঙ্গবন্ধুকে গোসল করাতে হচ্ছে ৫৭০ কাপড় কাচা সাবান দিয়ে! এ কথা চিন্তা করে দুচোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। জাতির পিতাকে নিজ হাতে গোসল করালাম। গোসল করাতে গিয়ে দেখা গেল বঙ্গবন্ধুর বুকের বাম পাশে তিনটি গুলির চিহ্ন। আরেকটা গুলি ডান হাতের আঙুলে লেগেছিল। গুলি লেগে আঙুলটি উলটে গেছে। গোসলের পর কাফনের কাপড়ের দরকার। তখন ইতনা গ্রামের বাসিন্দা মোকলেছুর ছিলেন টুঙ্গিপাড়া থানার সেকেন্ড অফিসার। তিনি বললেন, ‘কাফনের কাপড় নিয়ে এসেছি।’ কিন্তু কাফনের জন্য যে কাপড় পাওয়া গেল সেটি রিলিফের কাপড়। ওই কাপড় দিয়ে কাফনের ব্যবস্থা করা হলো। কাফন দেওয়ার সময়ও বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। এরপর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানা যায়, ২০-২৫ জন লোক ছিল। পুলিশ স্টাফ আর হাসপাতালের লোক জানাজায় অংশ নেন। জনসাধারণকে জানাজায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। জানাজা শেষে জাতির পিতার মরদেহ দাফনের জন্য কবরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। মরদেহ আমি নিজ হাতে কবরে রাখি। এমন সময় কয়েকজন মহিলা ওই মেজরের হাত-পা ধরে কান্নাকাটি করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর মুখটা শেষবারের জন্য আমাদের দেখতে দেন। কিন্তু মেজর বললেন, না, এখন দেখানো যাবে না। তখন তাদেরকে বলা হলো, আপনাদের বাড়ি কোথায়? তারা জানালেন কাউলিপাড়া। ১০-১২ মাইল রাস্তা পার করে কষ্ট করে বঙ্গবন্ধুকে চোখের দেখা দেখতে এসেছেন। তখন মেজর তাদেরকে লাশ দেখালেন। বঙ্গবন্ধুর মুখ দেখে ওই মহিলারা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। পরে দোয়া পড়ে কবর থেকে উঠে আসি।

বঙ্গবন্ধুকে দাফনকারী সিরাজ প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চান

 নড়াইল প্রতিনিধি 
১৯ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে ঘাতকের বুলেটে নিহত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দাফনকারী তৎকালীন পুলিশ সদস্য নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার বাসিন্দা কাজী সিরাজুল ইসলাম (৭৪) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। এই সাহসী মানুষটি সেদিন বঙ্গবন্ধুর লাশের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার সামনে বলেছিলেন, ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক মুসলিম রীতিতে বঙ্গবন্ধুকে গোসলসহ দাফনকাফন করতে হবে। সোমবার ইতনা গ্রামের নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের তিনি বঙ্গবন্ধুকে গোসল ও দাফনকাফনের মর্মস্পর্শী ঘটনা তুলে ধরেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ সময় সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আলী আজগর রাজা, শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র বিশ্বাস, কাজী সিরাজুল ইসলামের বাল্যবন্ধু কাজী বাবুল হোসেন, বড় ছেলে শরিফুল ইসলামসহ গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

কাজী সিরাজুল ইসলাম (কনস্টেবল নম্বর-২০৭৩) আরও বলেন, ১৯৭৫ সালের আগস্টে গোপালগঞ্জ তৎকালীন সাব-ডিভিশন পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) আব্দুল মান্নানের দেহরক্ষী ছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে-এ খবর শুনে ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল কাদের, এসডিপিও আব্দুল মান্নান এবং আমি স্পিডবোটে টুঙ্গিপাড়ায় যাই। এরই মধ্যে জানতে পারি বঙ্গবন্ধুর জন্য কবর খোঁড়ার কাজ চলছে। বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ হেলিকপ্টারে নিয়ে আসা হয় টুঙ্গিপাড়ায়। মরদেহের সঙ্গে সেনাবাহিনীর একজন মেজর ও সিপাহিকে দেখা যায়। হাসপাতাল ও পুলিশের লোকজন মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসেন। তখন ওই মেজরকে জানানো হলো, মনে হচ্ছে লাশের গোসল হয়নি। মেজর সাহেব রাগান্বিত স্বরে বললেন, কে কার গোসল করাবে? আমি বললাম, ‘মুসলমান হিসেবে তাকে গোসল করাতে হবে। কাফন দিতে হবে। এরপর দাফন করতে হবে।’ তখন তিনি বললেন, ‘আপনার বাড়ি কোথায়?’ বললাম, ‘নড়াইলের লোহাগড়া থানার ইতনা গ্রামে।’ মেজর বললেন, ‘দেরি করলে লাশ ছিনতাই হয়ে যেতে পারে।’ আমি বললাম, ‘১৪৪ ধারা জারি আছে। ফোর্স দিয়ে টুঙ্গিপাড়া ঘেরাও আছে।’ তিনি বললেন, ‘গোসল কে করাবে? কত সময় লাগবে?’ আমি বললাম, ‘গোসল আমি করাব এবং আধা ঘণ্টার মধ্যে হয়ে যাবে।’

এরপর গোসল করানোর অনুমতি দিলেন মেজর। বঙ্গবন্ধুর পরনে ছিল গাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। গোসল করানোর সময় বঙ্গবন্ধুর চাচাতো চাচা আব্দুল মান্নান টিনের দুটি পুরোনো বালতি আর সিলভারের একটি বদনা নিয়ে এলেন। গোসল করানোর জন্য আনা হলো ৫৭০ কাপড় কাচার সাবান। তখন এত খারাপ লাগল এই ভেবে যে, বঙ্গবন্ধুকে গোসল করাতে হচ্ছে ৫৭০ কাপড় কাচা সাবান দিয়ে! এ কথা চিন্তা করে দুচোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। জাতির পিতাকে নিজ হাতে গোসল করালাম। গোসল করাতে গিয়ে দেখা গেল বঙ্গবন্ধুর বুকের বাম পাশে তিনটি গুলির চিহ্ন। আরেকটা গুলি ডান হাতের আঙুলে লেগেছিল। গুলি লেগে আঙুলটি উলটে গেছে। গোসলের পর কাফনের কাপড়ের দরকার। তখন ইতনা গ্রামের বাসিন্দা মোকলেছুর ছিলেন টুঙ্গিপাড়া থানার সেকেন্ড অফিসার। তিনি বললেন, ‘কাফনের কাপড় নিয়ে এসেছি।’ কিন্তু কাফনের জন্য যে কাপড় পাওয়া গেল সেটি রিলিফের কাপড়। ওই কাপড় দিয়ে কাফনের ব্যবস্থা করা হলো। কাফন দেওয়ার সময়ও বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। এরপর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানা যায়, ২০-২৫ জন লোক ছিল। পুলিশ স্টাফ আর হাসপাতালের লোক জানাজায় অংশ নেন। জনসাধারণকে জানাজায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। জানাজা শেষে জাতির পিতার মরদেহ দাফনের জন্য কবরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। মরদেহ আমি নিজ হাতে কবরে রাখি। এমন সময় কয়েকজন মহিলা ওই মেজরের হাত-পা ধরে কান্নাকাটি করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর মুখটা শেষবারের জন্য আমাদের দেখতে দেন। কিন্তু মেজর বললেন, না, এখন দেখানো যাবে না। তখন তাদেরকে বলা হলো, আপনাদের বাড়ি কোথায়? তারা জানালেন কাউলিপাড়া। ১০-১২ মাইল রাস্তা পার করে কষ্ট করে বঙ্গবন্ধুকে চোখের দেখা দেখতে এসেছেন। তখন মেজর তাদেরকে লাশ দেখালেন। বঙ্গবন্ধুর মুখ দেখে ওই মহিলারা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন। পরে দোয়া পড়ে কবর থেকে উঠে আসি।