অর্ধশত বছরের পুরোনো আবাস ছেড়ে গেলেন বাসিন্দারা
jugantor
লালদিয়ার চরের দখল নিল চট্টগ্রাম বন্দর
অর্ধশত বছরের পুরোনো আবাস ছেড়ে গেলেন বাসিন্দারা
পুনর্বাসনের দাবি মিলিয়ে গেল হাওয়ায়

  চট্টগ্রাম ব্যুরো  

০২ মার্চ ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অবশেষে চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা এলাকার লালদিয়া চরের দখল নিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সোমবার সকালে বন্দর ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ উচ্ছেদ অভিযান টিম এই চরে যায়। শান্তিপূর্ণভাবে বাসিন্দারা চলে যেতে থাকায় বলপ্রয়োগ করতে হয়নি। বসতি ছেড়ে যাওয়া ৫২ একর জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ সময় দীর্ঘদিনের আবাসস্থল ছেড়ে যাওয়া নারী ও শিশুদের কান্নাকাটি, আহাজারিতে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে। বন্দরের অনড় অবস্থানের কারণে অর্ধশত বছরের পুরোনো আবাসস্থল লালদিয়ার চর ছেড়ে গেলেও বাসিন্দারা এই চরে ফেলে গেছেন অশ্রু। যে অশ্রু প্রতিবেশীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার। ফুল, পাখি আর চিরচেনা পরিবেশ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কষ্টের। এখানকার বাসিন্দারা উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে এলেও তাদের সেই দাবিও মিলিয়ে গেছে হাওয়ায়। অজানা গন্তব্যের উদ্দেশে লালদিয়ার চর ছেড়েছেন এখানকার প্রায় ১৪ হাজার বাসিন্দা।

সকাল সাড়ে ৯টায় লালদিয়ার চর এলাকা পরিদর্শন করেন বন্দর চেয়ারম্যান কমডোর এম শাহজাহান। পরে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে বোট ক্লাব এলাকায় সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন তিনি। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের লালদিয়া চরের জায়গাটির মালিক বন্দর কর্তৃপক্ষ। এখন জায়গাটা আমাদের প্রয়োজন। পিসিটির (পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল) ব্যাকআপের জন্য। এর আগে ২৬ একর উচ্ছেদ করেছি। এবার ৫২ একর জায়গা পুনরুদ্ধার করা হলো। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সবাই চলে গেছেন। তারা (উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দারা) গরিব হলেও আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। অবৈধ দখল উচ্ছেদ হলে সরকার তৃণমূলদের জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকে। তাদের সহায়তা করার জন্য আমরা তালিকা পাঠিয়েছি। তিনি আরও বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রস্থানের ব্যবস্থা করেছি। এটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। আমাদের এলাকায় বেড়া দিয়ে দেব, যাতে কেউ দখল করতে না পারে। আনসার সদস্যরা এলাকাটি পাহারা দেবেন।

সরেজমিন দেখা যায়, চোখের জলে পাঁচ দশকের বসতি ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে লালদিয়ার চরের ১৪ হাজার মানুষকে। আদালতের নির্দেশ আর প্রশাসনের অনড় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত নিজেরাই নিজেদের মালপত্র নিয়ে সরে যাওয়ার উদ্যোগ নেন তারা। কারও গন্তব্য ভাড়া বাসায়। কেউ কেউ সাময়িকভাবে উঠেছেন আত্মীয়স্বজনের কাছে। তবে অধিকাংশ পরিবারেরই এখনো মাথা গোঁজার ব্যবস্থা হয়নি। চোখে-মুখে ঘোর অমানিশার অন্ধকার।

জানা গেছে, শনিবার থেকেই নিজ উদ্যোগে বসতঘর ছেড়ে চলে যেতে শুরু করেন বাসিন্দারা। এ সময় শ্রমিক সংকটে অনেকে ভাঙাবাড়ি, টিন, আসবাব বিক্রি করে দেন নামমাত্র মূল্যে। সোমবার একযোগে বাসাবাড়ি ছাড়তে হয় সবাইকে। কেউ কেউ রিকশা, ভ্যান ও ট্রাকের অভাবে মালপত্র নিয়ে অসহায় বসে থাকতে দেখা যায়। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে লালদিয়ার চর মসজিদ কমিটির সভাপতি আবদুল কাদের বলেন, দুই হাজার ৩০০ পরিবারের ১৪ হাজার মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। ১৯৭২ সালে বিমানবাহিনীর ঘাঁটি জহুরুল হক তৈরির সময় আমাদের উচ্ছেদ করা হয় বাপ-দাদার ভিটা থেকে। সে সময় এ জায়গা দেওয়া হয়েছিল। ডিসি অফিসে খাজনা দিয়েছি দুবছর। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের একটি দাবি, আমাদের পুনর্বাসন করা হোক। এখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩টি মসজিদ, ২টি কিন্ডারগার্টেনসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক আলমগীর হাসান বলেন, লালদিয়ার চরের অনেক লোকজন শনি ও রোববার এলাকা ছেড়েছেন। সোমবার বন্দর কর্তৃপক্ষের উচ্ছেদ শুরু হয়। এই উচ্ছেদ নিয়ে আমাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তাতে মনে হলো আমরা বাংলাদেশের নাগরিক নই।

তিনি আরও বলেন, আমাদের নিষ্কণ্টক জায়গার বিপরীতে ৪০০ পরিবারকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে লালদিয়ার চরে জায়গা দেওয়া ছিল ১৯৭২ সালে। নদী রক্ষার কথা বলে ৪৯ বছর পর এসে আমাদের আবারও উচ্ছেদ করা হলো। এরপরও আমরা পুনর্বাসনের আশায় থাকব।

লালদিয়ার চরের দখল নিল চট্টগ্রাম বন্দর

অর্ধশত বছরের পুরোনো আবাস ছেড়ে গেলেন বাসিন্দারা

পুনর্বাসনের দাবি মিলিয়ে গেল হাওয়ায়
 চট্টগ্রাম ব্যুরো 
০২ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অবশেষে চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা এলাকার লালদিয়া চরের দখল নিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। সোমবার সকালে বন্দর ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ উচ্ছেদ অভিযান টিম এই চরে যায়। শান্তিপূর্ণভাবে বাসিন্দারা চলে যেতে থাকায় বলপ্রয়োগ করতে হয়নি। বসতি ছেড়ে যাওয়া ৫২ একর জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ সময় দীর্ঘদিনের আবাসস্থল ছেড়ে যাওয়া নারী ও শিশুদের কান্নাকাটি, আহাজারিতে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে। বন্দরের অনড় অবস্থানের কারণে অর্ধশত বছরের পুরোনো আবাসস্থল লালদিয়ার চর ছেড়ে গেলেও বাসিন্দারা এই চরে ফেলে গেছেন অশ্রু। যে অশ্রু প্রতিবেশীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার। ফুল, পাখি আর চিরচেনা পরিবেশ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কষ্টের। এখানকার বাসিন্দারা উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে এলেও তাদের সেই দাবিও মিলিয়ে গেছে হাওয়ায়। অজানা গন্তব্যের উদ্দেশে লালদিয়ার চর ছেড়েছেন এখানকার প্রায় ১৪ হাজার বাসিন্দা।

সকাল সাড়ে ৯টায় লালদিয়ার চর এলাকা পরিদর্শন করেন বন্দর চেয়ারম্যান কমডোর এম শাহজাহান। পরে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে বোট ক্লাব এলাকায় সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন তিনি। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের লালদিয়া চরের জায়গাটির মালিক বন্দর কর্তৃপক্ষ। এখন জায়গাটা আমাদের প্রয়োজন। পিসিটির (পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল) ব্যাকআপের জন্য। এর আগে ২৬ একর উচ্ছেদ করেছি। এবার ৫২ একর জায়গা পুনরুদ্ধার করা হলো। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সবাই চলে গেছেন। তারা (উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দারা) গরিব হলেও আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। অবৈধ দখল উচ্ছেদ হলে সরকার তৃণমূলদের জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকে। তাদের সহায়তা করার জন্য আমরা তালিকা পাঠিয়েছি। তিনি আরও বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রস্থানের ব্যবস্থা করেছি। এটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। আমাদের এলাকায় বেড়া দিয়ে দেব, যাতে কেউ দখল করতে না পারে। আনসার সদস্যরা এলাকাটি পাহারা দেবেন।

সরেজমিন দেখা যায়, চোখের জলে পাঁচ দশকের বসতি ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে লালদিয়ার চরের ১৪ হাজার মানুষকে। আদালতের নির্দেশ আর প্রশাসনের অনড় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত নিজেরাই নিজেদের মালপত্র নিয়ে সরে যাওয়ার উদ্যোগ নেন তারা। কারও গন্তব্য ভাড়া বাসায়। কেউ কেউ সাময়িকভাবে উঠেছেন আত্মীয়স্বজনের কাছে। তবে অধিকাংশ পরিবারেরই এখনো মাথা গোঁজার ব্যবস্থা হয়নি। চোখে-মুখে ঘোর অমানিশার অন্ধকার।

জানা গেছে, শনিবার থেকেই নিজ উদ্যোগে বসতঘর ছেড়ে চলে যেতে শুরু করেন বাসিন্দারা। এ সময় শ্রমিক সংকটে অনেকে ভাঙাবাড়ি, টিন, আসবাব বিক্রি করে দেন নামমাত্র মূল্যে। সোমবার একযোগে বাসাবাড়ি ছাড়তে হয় সবাইকে। কেউ কেউ রিকশা, ভ্যান ও ট্রাকের অভাবে মালপত্র নিয়ে অসহায় বসে থাকতে দেখা যায়। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে লালদিয়ার চর মসজিদ কমিটির সভাপতি আবদুল কাদের বলেন, দুই হাজার ৩০০ পরিবারের ১৪ হাজার মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। ১৯৭২ সালে বিমানবাহিনীর ঘাঁটি জহুরুল হক তৈরির সময় আমাদের উচ্ছেদ করা হয় বাপ-দাদার ভিটা থেকে। সে সময় এ জায়গা দেওয়া হয়েছিল। ডিসি অফিসে খাজনা দিয়েছি দুবছর। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের একটি দাবি, আমাদের পুনর্বাসন করা হোক। এখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩টি মসজিদ, ২টি কিন্ডারগার্টেনসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক আলমগীর হাসান বলেন, লালদিয়ার চরের অনেক লোকজন শনি ও রোববার এলাকা ছেড়েছেন। সোমবার বন্দর কর্তৃপক্ষের উচ্ছেদ শুরু হয়। এই উচ্ছেদ নিয়ে আমাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তাতে মনে হলো আমরা বাংলাদেশের নাগরিক নই।

তিনি আরও বলেন, আমাদের নিষ্কণ্টক জায়গার বিপরীতে ৪০০ পরিবারকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে লালদিয়ার চরে জায়গা দেওয়া ছিল ১৯৭২ সালে। নদী রক্ষার কথা বলে ৪৯ বছর পর এসে আমাদের আবারও উচ্ছেদ করা হলো। এরপরও আমরা পুনর্বাসনের আশায় থাকব।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন