শীতলক্ষ্যা-মেঘনায় মৃত্যুর হাতছানি
jugantor
শীতলক্ষ্যা-মেঘনায় মৃত্যুর হাতছানি
৭ রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চালাচ্ছেন সুকানি-গ্রিজাররা * এখন থেকে নৌ চলাচল আইন কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে -জেলা প্রশাসক

  রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ  

০৯ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মান্ধাতা আমলের লঞ্চ, সুদক্ষ ড্রাইভার আর নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা ছাড়াই শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও মেঘনায় চলছে ছোট বড় শত শত নৌযান। নারায়ণগঞ্জ থেকে ৭ রুটে চলাচলকারী অর্ধশতের বেশি যাত্রীবাহী লঞ্চ চালাচ্ছেন সুকানি আর গ্রিজাররা। এসব নদীতে চলছে ‘গুপ্তঘাতক’ নামে পরিচিত হাজারের ওপর বালুবাহী বাল্কহেড। তার ওপর খেয়া পারাপারের ঘাটগুলোতে অদক্ষ আর শিশুদের দিয়ে চালানো ট্রলারে প্রতিদিন নদী পার হচ্ছেন কয়েক লাখ মানুষ। ফলে সব সময়ই যেন মৃত্যুর হাতছানি দেয় এসব নদীতে। অভিযোগ রয়েছে নারায়ণগঞ্জ রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচলের গোটা বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছে একটি চক্র। কিছু নতুন লঞ্চ এ রুটে নিয়ে আসতে অনেক ব্যবসায়ী আগ্রহী হলেও তা সম্ভব হয় না ওই সিন্ডিকেটে কারণে। এসব বিষয় সামনে রেখে কঠোর হতে যাচ্ছে জেলা প্রশাসন।

নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের ঐতিহ্য আর গৌরব ম্লান হয়েছে আগেই। কলকাতা পর্যন্ত চলাচলকারী স্টিমার, ব্যবসায়ীদের বিশালাকৃতির সাম্পানের ইতিহাস এখন শুধুই স্মৃতি। সেই নারায়ণগঞ্জ থেকে ৭টি রুটে প্রায় ৭০টি লঞ্চ চলছে জোড়াতালি দিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, মালিক সিন্ডিকেটের কারণে এ রুটে নতুন ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন লঞ্চ প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। এর পাশাপাশি বালুবাহী বাল্ক হেড তো আছেই। বালু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কাছে প্রশাসনও একরকম অসহায়। সন্ধ্যার পর বাল্কহেড চলাচলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সেগুলো চলাচল করছে বীরদর্পে। এসব বাল্কহেড সাবমেরিনের মতো চলাচলকালে ঘটছে নানা দুর্ঘটনা।

নিরাপদ নৌপথ চাই ও বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সবুজ শিকদার জানান, নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলোর কোনোটিরই মাস্টার ড্রাইভার নেই। এসব লঞ্চ চালাচ্ছে সুকানি-গ্রিজাররা। সার্ভের সময় মালিকরা চালাকি করে ডিসপেনশন সার্টিফিকেট নিয়ে থাকে। আইএসও ১৯৭৬-এর নিয়ম অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণির নৌযান সূর্যাস্তের পর চলতে পারবে না। কিন্তু এসব লঞ্চ রাত ১০টা পর্যন্ত চলে। ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি যাত্রী নিয়ে চলাচল তো আছেই।

প্রতিটি লঞ্চে বয়া থাকার কথা ১২-১৬টি। আছে অর্ধেকেরও কম। সবুজ শিকদার অভিযোগ করেন, সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে ফিটনেসবিহীন লঞ্চকে সার্ভে সনদ দেওয়া হয়। কয়েকজন সুকানি জানান, কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই ছোট লঞ্চগুলোর চালানোর সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন।

বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্বে থাকা বাবু লাল বৈদ্য জানান, নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জ রুটে সাধারণত সুকানিরাই লঞ্চ চালাচ্ছেন। তবে এদের ডিজি শিপিং থেকে কোয়ার্টার মাস্টারের সনদ দেওয়া হয়ে থাকে। নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি বদিউজ্জামান বাদল অতিরিক্ত যাত্রী নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, লঞ্চ কখনোই ওভারলোড হয় না। চাঁদপুর ও নরিয়া রুটের লঞ্চগুলো সিঙ্গেল ইঞ্জিন হওয়ায় সেগুলো তৃতীয় শ্রেণির মাস্টার ড্রাইভাররা চালাতে পারেন। তারা সব নিয়ম-কানুন মেনেই লঞ্চ পরিচালনা করছেন।

সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, তারা মাঝেমধ্যেই শীতলক্ষ্যা নদীতে চলাচলকারী সার্ভে সনদের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন এবং অভিযান পরিচালনা করে থাকেন। তারা বিধিমালা অনুসরণ করেই এক বছরের জন্য সার্ভে সনদ প্রদান করে থাকেন। তবে যদি কোনো লঞ্চ মালিক এক মাস মাস্টার ড্রাইভার রেখে বাকি ১১ মাস তাদের না রাখে সে ক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করণীয় থাকে না।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ জানিয়েছেন, আমরা গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছি। সেখানে সন্ধ্যা ৬টা হতে সকাল ৬টা পর্যন্ত বাল্কহেড চলাচল সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাস্টার ড্রাইভার ছাড়া কোনো সুকানি, গ্রিজার, প্রকৌশলী বা ইঞ্জিন চালক দ্বারা নৌযান চালানো যাবে না। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণ করা যাবে না। তিনি বলেন, পূর্বে এসব আইনের প্রয়োগ কিভাবে হয়েছে বা কেন সম্পূর্ণ ভাবে পালন হয়নি সেদিকে যাচ্ছি না। কিন্তু এখন থেকে নৌ নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলসংক্রান্ত আইন কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

শীতলক্ষ্যা-মেঘনায় মৃত্যুর হাতছানি

৭ রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চালাচ্ছেন সুকানি-গ্রিজাররা * এখন থেকে নৌ চলাচল আইন কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে -জেলা প্রশাসক
 রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ 
০৯ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মান্ধাতা আমলের লঞ্চ, সুদক্ষ ড্রাইভার আর নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা ছাড়াই শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও মেঘনায় চলছে ছোট বড় শত শত নৌযান। নারায়ণগঞ্জ থেকে ৭ রুটে চলাচলকারী অর্ধশতের বেশি যাত্রীবাহী লঞ্চ চালাচ্ছেন সুকানি আর গ্রিজাররা। এসব নদীতে চলছে ‘গুপ্তঘাতক’ নামে পরিচিত হাজারের ওপর বালুবাহী বাল্কহেড। তার ওপর খেয়া পারাপারের ঘাটগুলোতে অদক্ষ আর শিশুদের দিয়ে চালানো ট্রলারে প্রতিদিন নদী পার হচ্ছেন কয়েক লাখ মানুষ। ফলে সব সময়ই যেন মৃত্যুর হাতছানি দেয় এসব নদীতে। অভিযোগ রয়েছে নারায়ণগঞ্জ রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচলের গোটা বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছে একটি চক্র। কিছু নতুন লঞ্চ এ রুটে নিয়ে আসতে অনেক ব্যবসায়ী আগ্রহী হলেও তা সম্ভব হয় না ওই সিন্ডিকেটে কারণে। এসব বিষয় সামনে রেখে কঠোর হতে যাচ্ছে জেলা প্রশাসন।

নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের ঐতিহ্য আর গৌরব ম্লান হয়েছে আগেই। কলকাতা পর্যন্ত চলাচলকারী স্টিমার, ব্যবসায়ীদের বিশালাকৃতির সাম্পানের ইতিহাস এখন শুধুই স্মৃতি। সেই নারায়ণগঞ্জ থেকে ৭টি রুটে প্রায় ৭০টি লঞ্চ চলছে জোড়াতালি দিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, মালিক সিন্ডিকেটের কারণে এ রুটে নতুন ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন লঞ্চ প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। এর পাশাপাশি বালুবাহী বাল্ক হেড তো আছেই। বালু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কাছে প্রশাসনও একরকম অসহায়। সন্ধ্যার পর বাল্কহেড চলাচলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সেগুলো চলাচল করছে বীরদর্পে। এসব বাল্কহেড সাবমেরিনের মতো চলাচলকালে ঘটছে নানা দুর্ঘটনা।

নিরাপদ নৌপথ চাই ও বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সবুজ শিকদার জানান, নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলোর কোনোটিরই মাস্টার ড্রাইভার নেই। এসব লঞ্চ চালাচ্ছে সুকানি-গ্রিজাররা। সার্ভের সময় মালিকরা চালাকি করে ডিসপেনশন সার্টিফিকেট নিয়ে থাকে। আইএসও ১৯৭৬-এর নিয়ম অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণির নৌযান সূর্যাস্তের পর চলতে পারবে না। কিন্তু এসব লঞ্চ রাত ১০টা পর্যন্ত চলে। ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি যাত্রী নিয়ে চলাচল তো আছেই।

প্রতিটি লঞ্চে বয়া থাকার কথা ১২-১৬টি। আছে অর্ধেকেরও কম। সবুজ শিকদার অভিযোগ করেন, সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে ফিটনেসবিহীন লঞ্চকে সার্ভে সনদ দেওয়া হয়। কয়েকজন সুকানি জানান, কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই ছোট লঞ্চগুলোর চালানোর সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন।

বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের দায়িত্বে থাকা বাবু লাল বৈদ্য জানান, নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জ রুটে সাধারণত সুকানিরাই লঞ্চ চালাচ্ছেন। তবে এদের ডিজি শিপিং থেকে কোয়ার্টার মাস্টারের সনদ দেওয়া হয়ে থাকে। নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি বদিউজ্জামান বাদল অতিরিক্ত যাত্রী নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, লঞ্চ কখনোই ওভারলোড হয় না। চাঁদপুর ও নরিয়া রুটের লঞ্চগুলো সিঙ্গেল ইঞ্জিন হওয়ায় সেগুলো তৃতীয় শ্রেণির মাস্টার ড্রাইভাররা চালাতে পারেন। তারা সব নিয়ম-কানুন মেনেই লঞ্চ পরিচালনা করছেন।

সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, তারা মাঝেমধ্যেই শীতলক্ষ্যা নদীতে চলাচলকারী সার্ভে সনদের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন এবং অভিযান পরিচালনা করে থাকেন। তারা বিধিমালা অনুসরণ করেই এক বছরের জন্য সার্ভে সনদ প্রদান করে থাকেন। তবে যদি কোনো লঞ্চ মালিক এক মাস মাস্টার ড্রাইভার রেখে বাকি ১১ মাস তাদের না রাখে সে ক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করণীয় থাকে না।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ জানিয়েছেন, আমরা গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছি। সেখানে সন্ধ্যা ৬টা হতে সকাল ৬টা পর্যন্ত বাল্কহেড চলাচল সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাস্টার ড্রাইভার ছাড়া কোনো সুকানি, গ্রিজার, প্রকৌশলী বা ইঞ্জিন চালক দ্বারা নৌযান চালানো যাবে না। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণ করা যাবে না। তিনি বলেন, পূর্বে এসব আইনের প্রয়োগ কিভাবে হয়েছে বা কেন সম্পূর্ণ ভাবে পালন হয়নি সেদিকে যাচ্ছি না। কিন্তু এখন থেকে নৌ নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলসংক্রান্ত আইন কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন