ঢাবি ছাত্রীদের গভীর রাতে ‘হলছাড়া’

‘প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারী নির্যাতন দেশে এই প্রথম’

আজ সাদা দলের মৌন মিছিল

প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ঢাবি প্রতিনিধি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কবি বেগম সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রীদের গভীর রাতে ‘হলছাড়া’ করার মাধ্যমে দেশে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারী নির্যাতন করা হয়েছে। এটা সবার জন্য লজ্জার। রোববার সকালে ঢাবি অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে আয়োজিত এক মানববন্ধনে এসব কথা বলা হয়।

‘ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা কর’- স্লোগানে মানববন্ধনের আয়োজন করে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষকবৃন্দ’।

ঢাবি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এমএম আকাশের সভাপতিত্বে এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের পরিচালনায় মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের অর্ধশত শিক্ষক অংশ নেন।

এতে লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ, মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাসরীন ওয়াদুদ, আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, সিন্ডিকেট সদস্য ও ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক হাসানুজ্জামান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন ব্যাপারী, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক সংগীতা আহমেদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী, ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানজীম উদ্দিন খান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ফাহমিদুল হক, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আবদুজ জাহের প্রমুখ।

মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি লিখিত কয়েকটি দাবি পাঠ করেন তানজীম উদ্দিন খান। দাবিগুলো হল- বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্র-ছাত্রীর শিক্ষার পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে; তাদের মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে; ক্যাম্পাসে সব শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; বিধিসম্মতভাবে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ছাড়া কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না; রাষ্ট্রীয় বাহিনী কিংবা অন্য কোনো গোষ্ঠী দ্বারা ছাত্র-ছাত্রী যেন আক্রান্ত না হয় সে জন্য অবিলম্বে একটি বিশেষ সেল গঠন করতে হবে। এছাড়া সুনির্দিষ্টভাবে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; ঢাবি ভিসির বাসভবনে নারকীয় তাণ্ডবের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে; ভিসি ভবনসহ সব আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে এবং তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা দিতে হবে।

মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করে সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, আগে কোনো শিক্ষার্থীর সামান্য ইনফ্লুয়েঞ্জা হলেও ছাত্রদের কাছে শিক্ষকরা ছুটে যেতেন। এমনও হয়েছে রাত ২ থেকে ৩টা পর্যন্ত তাদের সঙ্গে শিক্ষকরা থাকতেন।

তিনি বলেন, ভিসি যেমন শিক্ষক, তেমনি অভিভাবকও। অথচ ভিসি বলেছেন অভিভাবকদের কাছে ছাত্রীদের হস্তান্তর করেছেন। এটা আমার কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক মনে হয়েছে। বাংলাদেশে এই প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারীকে নির্যাতিত করা হল। এটা আমাদের সবার জন্য লজ্জার। শুধু এটাই বলব প্রাতিষ্ঠানিক নারী নির্যাতনের ঘটনা এটাই যেন সর্বশেষ হয়।

অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, রাষ্ট্রযন্ত্র স্বায়ত্তশাসন লঙ্ঘন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর হামলা করেছে। স্বায়ত্তশাসন অনুযায়ী ভিসি ও প্রক্টরের অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকতে পারে না।

প্রশাসন দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা দায়িত্বে আছেন তারা দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছেন না। তিনি আরও বলেন, হলগুলোতে ছাত্রদের গণরুমে উঠিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিশেষ আদর্শ গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়।

প্রভোস্ট ও হাউজ টিউটরের দায়িত্ব এই ধরনের কার্যকলাপ থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরত করা। সুফিয়া কামাল হলের সেই রাতের ঘটনা উল্লেখ করে এমএম আকাশ বলেন, অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার সময় মনে রাখা উচিত অপরাধীরও ডিপেন্ড করার অধিকার আছে। এ রকম হয় না বলেই একবার বলা হলো ইফফাত পা কেটে দিয়েছে। আবার বলা হল ওই ছাত্রী নিজেই পা কেটেছে।

এরকম নাটক দেখতে পেলাম। আমরা একবার দেখলাম ভিসি বলছেন আমরা তাকে বহিষ্কার করলাম, আবার বললেন আমরা তাকে গ্রহণ করলাম। এই জায়গায় সঠিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।

রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে আমরা শিক্ষকরা আছি। তোমাদের যে কোনো ন্যায্য দাবির সঙ্গে আমরা আছি, পাশে থাকব। ছাত্রদের হয়রানি করা হলে শিক্ষকরা সমুচিত জবাব দেবে। ছাত্রদের আটক করার আগে আমাদের আটক করতে হবে।

আজ ঢাবি সাদা দলের মানববন্ধন : গভীর রাতে ছাত্রীদের ‘হলছাড়া’ করার প্রতিবাদে আজ সোমবার বেলা ১১টায় ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত শিক্ষকদের সাদা দল। শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের প্রতিবাদে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করা হবে।