পদ্মার ১৫ পয়েন্ট থেকে অবাধে মাটি-বালু লুট
jugantor
বালুমহাল ঘোষণার প্রস্তাব আটকা তিন মাস
পদ্মার ১৫ পয়েন্ট থেকে অবাধে মাটি-বালু লুট

  রাজশাহী ব্যুরো  

২০ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পদ্মার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বালু ও মাটি লুটের মচ্ছব চলছে। সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার অন্তত ১৫টি পয়েন্ট থেকে বালু ও মাটি লুটে নেওয়া হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না প্রশাসন। এদিকে ৫৬৬ কোটি টাকার চলমান পদ্মার বাম তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরবাগডাঙ্গা এলাকায় একটি বালুমহাল ঘোষণার প্রস্তাব তিন মাস ধরে আটকে আছে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জেলা প্রশাসনের কাছে প্রকল্পের কাজের জন্য বালুর চাহিদা মেটাতে পদ্মায় বালুমহাল ঘোষণার প্রস্তাব দেয়। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ বালু-মাটি লুটকারীদের সুবিধা করে দিতেই পাউবোর বালুমহাল ঘোষণা ও ইজারার প্রস্তাব ফেলে রাখা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে তেমনি পদ্মার ১৫টি পয়েন্টে অবাধে বালু ও মাটি লোপাট হচ্ছে। প্রশাসন সম্প্রতি সদর উপজেলার একটি অবৈধ বালু খাদান বন্ধ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে।

গত ১২ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরবাগডাঙ্গা এলাকায় পদ্মায় একটি নতুন বালুমহাল ঘোষণার লক্ষ্যে সরেজমিন সার্ভে করতে জেলা প্রশাসন চিঠি দেয় পাউবোকে। পরে ২২ জানুয়ারি পাউবোর একটি টিম পদ্মায় সরেজমিন সার্ভে করে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী জেলা প্রশাসনকে বিস্তারিত জানিয়ে প্রতিবেদন দেয়। এতে বলা হয়, চরবাগডাঙ্গা এলাকায় পদ্মায় ৩৪ লাখ ৭৪ হাজার ২০ ঘনমিটার উন্নতমানের উত্তোলনযোগ্য বালু আছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলা দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে বহমান পদ্মার ভাঙন একটি সাংবাৎসরিক সমস্যা। পদ্মার ভাঙন থেকে সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ও শাজাহানপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনপদ রক্ষায় সরকার প্রায় ৫৬৬ কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণ মানসম্মত বালু প্রয়োজন। চরবাগডাঙ্গা এলাকায় বৈধ বালুমহাল ঘোষণা করলে প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।

এদিকে সরেজমিন দেখা যায়, পদ্মার বাম তীর সংরক্ষণে বৃহৎ এ প্রকল্পের আওতায় ভাঙনের সর্বাধিক ঝুঁকিতে থাকা চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন এলাকায় ১৭টি ও শাজাহানপুর এলাকায় ১২টিসহ মোট ২৯টি প্যাকেজের টেন্ডার ও স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত বালু সংকটের কারণে ৪টি ছাড়া বাকি প্যাকেজগুলোর কাজ গত তিন মাসেও শুরু হয়নি। পদ্মার রানীনগর এলাকায় একটি বালুমহাল থাকলেও সেখান থেকে প্রকল্প এলাকায় বালু পৌঁছানো কঠিন ও ব্যয়বহুল। এ কারণে চরবাগডাঙ্গা এলাকায় বালুমহাল ঘোষণা হলে বালুর স্বাভাবিক সরবরাহ সম্ভব হবে-এমনটাই মনে করছেন বাগডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান শহিদ রানা টিপু। তিনি বলেন, আর এক দুমাস পরেই পদ্মা ভরে যাবে। ভাঙন শুরু হবে। তার আগেই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া জরুরি। কিন্তু এখন বালু ও উপকরণ সংকটে অনেক প্যাকেজের কাজ শুরু হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নে এমন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ায় ভাঙনের মুখে থাকা হাজার হাজার এলাকাবাসী আতঙ্কের মধ্যে আছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ যদিও আগামী বছর পর্যন্ত আছে তারপরও চলতি বর্ষার আগেই অর্ধেক কাজ সম্পন্ন করতে হবে। না-হলে নদী ভাঙন ঠেকানো অসম্ভব হয়ে যাবে। এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় উপকরণ পৌঁছানো কঠিন। বালু সংকট আছে। অবৈধ উৎস থেকে বালু সংগ্রহ করতে গিয়ে ঠিকাদাররা নানা সমস্যায় পড়ছেন। এ কারণে সুষ্ঠুভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থে এক বছরের জন্য হলেও প্রস্তাবিত বালুমহালটি ঘোষণা ও দ্রুত ইজারার ব্যবস্থা করা দরকার।

জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দেবেন্দ্র নাথ উঁরাও যুগান্তরকে বলেন, পাউবো থেকে সার্ভে প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। নতুন বালুমহাল ঘোষণার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। তবে অবৈধ বালু খাদান বন্ধসহ পদ্মার বালু ও মাটি লুট বন্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

জানা গেছে, পদ্মার বালু-মাটি লুট বন্ধে জেলা প্রশাসনে ১০টির বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। পাকা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন অভিযোগে বলেন, উজিরপুরের বালুঘাট দিয়ে পদ্মার পাকা এলাকা থেকে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক গাড়ি বালু ও মাটি লুট করছে হবি মেম্বারসহ একটি সিন্ডিকেট। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে গত কয়েক মাস ধরে বালু-মাটি অবাধে লোপাট হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। পদ্মার চার, পাঁচ, ছয় ও সাত নম্বর বাঁধের নিচ থেকেও অবাধে শত শত ট্রাক বালু-মাটি লোপাট হচ্ছে বলে অভিযোগগুলোয় বলা হয়েছে।

বালুমহাল ঘোষণার প্রস্তাব আটকা তিন মাস

পদ্মার ১৫ পয়েন্ট থেকে অবাধে মাটি-বালু লুট

 রাজশাহী ব্যুরো 
২০ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পদ্মার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বালু ও মাটি লুটের মচ্ছব চলছে। সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার অন্তত ১৫টি পয়েন্ট থেকে বালু ও মাটি লুটে নেওয়া হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না প্রশাসন। এদিকে ৫৬৬ কোটি টাকার চলমান পদ্মার বাম তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরবাগডাঙ্গা এলাকায় একটি বালুমহাল ঘোষণার প্রস্তাব তিন মাস ধরে আটকে আছে জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জেলা প্রশাসনের কাছে প্রকল্পের কাজের জন্য বালুর চাহিদা মেটাতে পদ্মায় বালুমহাল ঘোষণার প্রস্তাব দেয়। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ বালু-মাটি লুটকারীদের সুবিধা করে দিতেই পাউবোর বালুমহাল ঘোষণা ও ইজারার প্রস্তাব ফেলে রাখা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে তেমনি পদ্মার ১৫টি পয়েন্টে অবাধে বালু ও মাটি লোপাট হচ্ছে। প্রশাসন সম্প্রতি সদর উপজেলার একটি অবৈধ বালু খাদান বন্ধ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে।

গত ১২ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরবাগডাঙ্গা এলাকায় পদ্মায় একটি নতুন বালুমহাল ঘোষণার লক্ষ্যে সরেজমিন সার্ভে করতে জেলা প্রশাসন চিঠি দেয় পাউবোকে। পরে ২২ জানুয়ারি পাউবোর একটি টিম পদ্মায় সরেজমিন সার্ভে করে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী জেলা প্রশাসনকে বিস্তারিত জানিয়ে প্রতিবেদন দেয়। এতে বলা হয়, চরবাগডাঙ্গা এলাকায় পদ্মায় ৩৪ লাখ ৭৪ হাজার ২০ ঘনমিটার উন্নতমানের উত্তোলনযোগ্য বালু আছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলা দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে বহমান পদ্মার ভাঙন একটি সাংবাৎসরিক সমস্যা। পদ্মার ভাঙন থেকে সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ও শাজাহানপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনপদ রক্ষায় সরকার প্রায় ৫৬৬ কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণ মানসম্মত বালু প্রয়োজন। চরবাগডাঙ্গা এলাকায় বৈধ বালুমহাল ঘোষণা করলে প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।

এদিকে সরেজমিন দেখা যায়, পদ্মার বাম তীর সংরক্ষণে বৃহৎ এ প্রকল্পের আওতায় ভাঙনের সর্বাধিক ঝুঁকিতে থাকা চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন এলাকায় ১৭টি ও শাজাহানপুর এলাকায় ১২টিসহ মোট ২৯টি প্যাকেজের টেন্ডার ও স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত বালু সংকটের কারণে ৪টি ছাড়া বাকি প্যাকেজগুলোর কাজ গত তিন মাসেও শুরু হয়নি। পদ্মার রানীনগর এলাকায় একটি বালুমহাল থাকলেও সেখান থেকে প্রকল্প এলাকায় বালু পৌঁছানো কঠিন ও ব্যয়বহুল। এ কারণে চরবাগডাঙ্গা এলাকায় বালুমহাল ঘোষণা হলে বালুর স্বাভাবিক সরবরাহ সম্ভব হবে-এমনটাই মনে করছেন বাগডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান শহিদ রানা টিপু। তিনি বলেন, আর এক দুমাস পরেই পদ্মা ভরে যাবে। ভাঙন শুরু হবে। তার আগেই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া জরুরি। কিন্তু এখন বালু ও উপকরণ সংকটে অনেক প্যাকেজের কাজ শুরু হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নে এমন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ায় ভাঙনের মুখে থাকা হাজার হাজার এলাকাবাসী আতঙ্কের মধ্যে আছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ যদিও আগামী বছর পর্যন্ত আছে তারপরও চলতি বর্ষার আগেই অর্ধেক কাজ সম্পন্ন করতে হবে। না-হলে নদী ভাঙন ঠেকানো অসম্ভব হয়ে যাবে। এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় উপকরণ পৌঁছানো কঠিন। বালু সংকট আছে। অবৈধ উৎস থেকে বালু সংগ্রহ করতে গিয়ে ঠিকাদাররা নানা সমস্যায় পড়ছেন। এ কারণে সুষ্ঠুভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থে এক বছরের জন্য হলেও প্রস্তাবিত বালুমহালটি ঘোষণা ও দ্রুত ইজারার ব্যবস্থা করা দরকার।

জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দেবেন্দ্র নাথ উঁরাও যুগান্তরকে বলেন, পাউবো থেকে সার্ভে প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। নতুন বালুমহাল ঘোষণার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। তবে অবৈধ বালু খাদান বন্ধসহ পদ্মার বালু ও মাটি লুট বন্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

জানা গেছে, পদ্মার বালু-মাটি লুট বন্ধে জেলা প্রশাসনে ১০টির বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। পাকা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন অভিযোগে বলেন, উজিরপুরের বালুঘাট দিয়ে পদ্মার পাকা এলাকা থেকে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক গাড়ি বালু ও মাটি লুট করছে হবি মেম্বারসহ একটি সিন্ডিকেট। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে গত কয়েক মাস ধরে বালু-মাটি অবাধে লোপাট হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। পদ্মার চার, পাঁচ, ছয় ও সাত নম্বর বাঁধের নিচ থেকেও অবাধে শত শত ট্রাক বালু-মাটি লোপাট হচ্ছে বলে অভিযোগগুলোয় বলা হয়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন