যশোরে ফুলের রাজ্যে হাহাকার
jugantor
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ
যশোরে ফুলের রাজ্যে হাহাকার

  বিক্রিতে বিপর্যয়  

২৩ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইন্দ্রজিৎ রায়, যশোর

গত বছর করোনা মহামারির মধ্যেই আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। লন্ডভন্ড হয় ফুলচাষিদের জীবন-জীবিকা। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন ফুলের রাজধানী খ্যাত যশোরে গদখালি এলাকার চাষিরা। সেই স্বপ্ন আবার ভেঙে চুরমার করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে। ফুল বিক্রিতে বিপর্যয় চলছে। খেতেই নষ্ট হচ্ছে ফুল। আবার অনেকে খেতের ফুল কেটে গরু-ছাগলের খাদ্য হিসাবে জোগান দিচ্ছে। চাষির দীর্ঘশ্বাসে ফুলের রাজ্যে শুধুই চলছে হাহাকার।

সূত্র জানায়, দেশে প্রায় ২০ হাজার ফুলচাষি রয়েছে। এর মধ্যে শুধু যশোর জেলায় প্রায় ৬ হাজার চাষি সার্বিক চাহিদার সিংহভাগ সরবরাহ করে থাকে। এজন্য যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালি ফুলের রাজধানী হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলের কৃষকের প্রধান অর্থকরী ফসল হিসাবে ফুলই স্বীকৃত। সেই ফুলের রাজধানীতে চাষিরা ভালো নেই। মহামারি ও ঘূর্ণিঝড়ের ধকলে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। এরপর গত ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দেশের করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় সামাজিক অনুষ্ঠান ঘিরে ফুলের চাহিদা বাড়ে। বেচাকেনাও মোটামুটি ভালো হয়। তখন চাষিরা ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু মার্চ থেকে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে। চলতি এপ্রিলে কয়েক দফায় লকডাউনে ফুলের বাজারে ধস নেমেছে।

ঝিকরগাছার নীলকণ্ঠনগর গ্রামের চাষি হোসেন আলী বলেন, চার বিঘা জমিতে গোলাপ চাষ করেছি। এতে তার ৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। তবে ২ লাখ টাকার মতো ফুল বিক্রি করতে পেরেছি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসে তার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলে দিল। গতবার করোনা ও আম্পান ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এসব ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কোনো পথ দেখছি না। ফুল কেনার কেউ নেই। মানুষের হাতে টাকাও নেই।

তিনি আরও বলেন, ফুলের আবাদে লোকসান গুনতে হচ্ছে। কিন্তু বিকল্প আবাদেও যেতে পারছি না। ফুলচাষিরা বেশি বিপদে রয়েছেন। দায়-দেনা বাড়ছে দিন দিন।

গদখালি এলাকার চাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, তিন বিঘা জমিতে গোলাপ, রজনিগন্ধা, জারবেরা ও কামিনী ফুল রয়েছে। অনেক কষ্টে খরচ করে বাগান প্রস্তুত করেছি। করোনায় ফুল বিক্রি না হলেও বাগান নষ্ট করতে পারছি না। এজন্য খেতের ফুল কেটে ফেলে দিচ্ছি। গরু-ছাগলের খাওয়াচ্ছি। ফুল তুলে এভাবে ফেলে দিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ফুল বিক্রি করতে না পারলেও খরচ কিন্তু বসে নেই। গত বছরের করোনা ও আম্পানের ধকল কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছিলেন চাষিরা। সেই স্বপ্ন এবারের লকডাউনে তছনছ করে দিল। শুধু চাষি হোসেন আলী কিংবা রফিকুল ইসলাম নন, যশোরের প্রায় ৬ হাজার চাষির একই করুণ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের ঋণের বোঝা বাড়ছে। অনেকে সার, কীটনাশকের বকেয়া পরিশোধ করতে পারছেন না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার্স সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, গত বছর করোনা ও আম্পান ঝড়ে ফুল সেন্টরে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতির কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন চাষিরা। বিজয় দিবস, পহেলা জানুয়ারি, বিশ্ব ভালোবাসা দিবসেও চাষিরা ভালো দামে ফুল বিক্রি করতে পেরেছে। আশায় ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস ও নববর্ষে ফুল বিক্রি করবে। কিন্তু তার আগেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত এনেছে। একই সঙ্গে রমজান হওয়ায় ফুলের চাহিদায় ধস নেমেছে। চাষিদের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন শেষ। ফুলচাষিদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। উৎপাদন ধরে রাখতে চাষিরা খেতের ফুল গরু-ছাগলকে খাওয়াচ্ছে। বিকল্প আবাদেও তারা যেতে পারছে না।

তিনি আরও বলেন, সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক অনুষ্ঠানের অনুমিত দিলে ফুল সেক্টরকে বাঁচানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ফুলচাষিদের প্রণোদনা বাড়াতে হবে। সীমিত সংখ্যক চাষি প্রণোদনার সুবিধা পেয়েছে।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ

যশোরে ফুলের রাজ্যে হাহাকার

 বিক্রিতে বিপর্যয় 
২৩ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইন্দ্রজিৎ রায়, যশোর

গত বছর করোনা মহামারির মধ্যেই আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। লন্ডভন্ড হয় ফুলচাষিদের জীবন-জীবিকা। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন ফুলের রাজধানী খ্যাত যশোরে গদখালি এলাকার চাষিরা। সেই স্বপ্ন আবার ভেঙে চুরমার করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে। ফুল বিক্রিতে বিপর্যয় চলছে। খেতেই নষ্ট হচ্ছে ফুল। আবার অনেকে খেতের ফুল কেটে গরু-ছাগলের খাদ্য হিসাবে জোগান দিচ্ছে। চাষির দীর্ঘশ্বাসে ফুলের রাজ্যে শুধুই চলছে হাহাকার।

সূত্র জানায়, দেশে প্রায় ২০ হাজার ফুলচাষি রয়েছে। এর মধ্যে শুধু যশোর জেলায় প্রায় ৬ হাজার চাষি সার্বিক চাহিদার সিংহভাগ সরবরাহ করে থাকে। এজন্য যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালি ফুলের রাজধানী হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলের কৃষকের প্রধান অর্থকরী ফসল হিসাবে ফুলই স্বীকৃত। সেই ফুলের রাজধানীতে চাষিরা ভালো নেই। মহামারি ও ঘূর্ণিঝড়ের ধকলে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। এরপর গত ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দেশের করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় সামাজিক অনুষ্ঠান ঘিরে ফুলের চাহিদা বাড়ে। বেচাকেনাও মোটামুটি ভালো হয়। তখন চাষিরা ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু মার্চ থেকে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে। চলতি এপ্রিলে কয়েক দফায় লকডাউনে ফুলের বাজারে ধস নেমেছে।

ঝিকরগাছার নীলকণ্ঠনগর গ্রামের চাষি হোসেন আলী বলেন, চার বিঘা জমিতে গোলাপ চাষ করেছি। এতে তার ৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। তবে ২ লাখ টাকার মতো ফুল বিক্রি করতে পেরেছি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসে তার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলে দিল। গতবার করোনা ও আম্পান ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এসব ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কোনো পথ দেখছি না। ফুল কেনার কেউ নেই। মানুষের হাতে টাকাও নেই।

তিনি আরও বলেন, ফুলের আবাদে লোকসান গুনতে হচ্ছে। কিন্তু বিকল্প আবাদেও যেতে পারছি না। ফুলচাষিরা বেশি বিপদে রয়েছেন। দায়-দেনা বাড়ছে দিন দিন।

গদখালি এলাকার চাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, তিন বিঘা জমিতে গোলাপ, রজনিগন্ধা, জারবেরা ও কামিনী ফুল রয়েছে। অনেক কষ্টে খরচ করে বাগান প্রস্তুত করেছি। করোনায় ফুল বিক্রি না হলেও বাগান নষ্ট করতে পারছি না। এজন্য খেতের ফুল কেটে ফেলে দিচ্ছি। গরু-ছাগলের খাওয়াচ্ছি। ফুল তুলে এভাবে ফেলে দিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ফুল বিক্রি করতে না পারলেও খরচ কিন্তু বসে নেই। গত বছরের করোনা ও আম্পানের ধকল কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছিলেন চাষিরা। সেই স্বপ্ন এবারের লকডাউনে তছনছ করে দিল। শুধু চাষি হোসেন আলী কিংবা রফিকুল ইসলাম নন, যশোরের প্রায় ৬ হাজার চাষির একই করুণ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের ঋণের বোঝা বাড়ছে। অনেকে সার, কীটনাশকের বকেয়া পরিশোধ করতে পারছেন না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার্স সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, গত বছর করোনা ও আম্পান ঝড়ে ফুল সেন্টরে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতির কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন চাষিরা। বিজয় দিবস, পহেলা জানুয়ারি, বিশ্ব ভালোবাসা দিবসেও চাষিরা ভালো দামে ফুল বিক্রি করতে পেরেছে। আশায় ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস ও নববর্ষে ফুল বিক্রি করবে। কিন্তু তার আগেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত এনেছে। একই সঙ্গে রমজান হওয়ায় ফুলের চাহিদায় ধস নেমেছে। চাষিদের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন শেষ। ফুলচাষিদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। উৎপাদন ধরে রাখতে চাষিরা খেতের ফুল গরু-ছাগলকে খাওয়াচ্ছে। বিকল্প আবাদেও তারা যেতে পারছে না।

তিনি আরও বলেন, সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক অনুষ্ঠানের অনুমিত দিলে ফুল সেক্টরকে বাঁচানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ফুলচাষিদের প্রণোদনা বাড়াতে হবে। সীমিত সংখ্যক চাষি প্রণোদনার সুবিধা পেয়েছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন