নৌযান শ্রমিকের ঘরে শুধুই হাহাকার
jugantor
নৌযান শ্রমিকের ঘরে শুধুই হাহাকার

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল  

১৭ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘সুঁই গলানোর ফাঁক না থাকার মতো ভিড় নিয়ে চলছে ফেরি। ঈদের আগে ভিড়ে পদদলিত হয়ে মারা গেছে ছয় জন। তারপরও লঞ্চ চালানোর অনুমতি দেয়নি সরকার। দেশের অন্যান্য এলাকায় সহজেই সড়ক পথে যেতে পারে মানুষ। শুধু খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে লঞ্চ। পাড়ি দিতে হয় পদ্মা নদী। ফেরিঘাটে লাখ লাখ মানুষের জটলা দেখে ফেরি চলাচল যেখানে স্বাভাবিক করে দেওয়া হলো সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে লঞ্চ চালানোর অনুমতি দিলে কি খুব বেশি ক্ষতি হতো? আর যাই হোক লঞ্চে তো আর এভাবে গায়ে গাঁ ঘেঁষে যেতে পারত না কেউ। তাছাড়া লঞ্চে আমাদের সর্বশেষ যে আয়োজন তাতে একজন যাত্রীর সঙ্গে আরেকজনের কমপক্ষে ৩-৪ ফুট দূরত্ব থাকার বিষয়টি তো আমরাই নিশ্চিত করেছিলাম।’

কথাগুলো বলছিলেন বরিশাল লঞ্চ মালিক সমিতির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রিয়াজ উল কবির। বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘ঈদের আগে যে ভিড় আমরা ফেরিতে দেখেছি তাতে এখন করোনার সংক্রমণ বাড়লে তার দায় এড়াতে পারবে না সরকার। এ যেন বজ আঁটুনি ফসকা গেড়ো। লকডাউনে লঞ্চ ও দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ রাখা হলো। কিন্তু তাতে কি মানুষের বাড়ি ফেরা আটকানো গেছে? মোবাইল কোম্পানিগুলোর হিসাবেই ঈদে ঢাকা ছেড়েছে ৬৫ লাখেরও বেশি মানুষ। প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম যানবাহন পারাপার আর সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়ে রেকর্ড করেছে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু।

এখন আবার একইভাবে শুরু হয়েছে রাজধানীতে ফেরা। কারো গমনাগমন যখন ঠেকানোই যাচ্ছিল না তখনই উচিত ছিল লঞ্চ-বাস ছেড়ে দেওয়া। স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি নিশ্চিত করে এসব যানবাহন যাত্রী পরিবহণ করলে আর যাই হোক করোনা মহামারির এই সময়ে ফেরিতে হাজার হাজার মানুষের এভাবে ভিড় করে পদ্মা পাড়ির দৃশ্য দেখতে হতো না।লঞ্চ বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দেশজুড়ে থাকা প্রায় ১৩শ যাত্রীবাহী লঞ্চের মালিক ও এসব নৌযানে কর্মরত ৩০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক-কর্মচারী। গত বছরের মার্চ থেকে করোনা মহামারির কারণে মন্দা চলছে লঞ্চ ব্যবসায়।

তার ওপর এখন টানা ৪১ দিন ধরে লঞ্চ বন্ধ থাকার কারণে বহু মালিকই বেতন-বোনাস দিতে পারেননি শ্রমিক-কর্মচারীদের। এফবিসিসিআই’র পরিচালক ও বরিশাল মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট নিজামউদ্দিন বলেন, ‘পকেটের টাকা দিয়ে লঞ্চ করার মতো ক্ষমতা সারা দেশে ২-৪ জন মালিকের থাকতে পারে। বাকিরা লঞ্চ নির্মাণ প্রশ্নে নিয়েছেন ঋণ। গত বছর টানা ৬৬ দিন বন্ধ ছিল লঞ্চ। তবে রোজা এবং কোরবানির ঈদে লঞ্চ চলাচলের অনুমতি থাকায় কিছুটা হলেও ক্ষতি পোষানো গেছে। এ বছর ৫ এপ্রিল থেকে বন্ধ লঞ্চ চলাচল। এই বন্ধে পার হয়ে গেছে ঈদ। নিজাম উদ্দিন আরও জানান, এক বছর ধরেই টানা লোকসান দিচ্ছি আমরা। গেল বছর অন্যান্য শিল্পের পাশাপাশি নৌযান শিল্পের জন্যও সহজ শর্তে ঋণ কিংবা প্রণোদনা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। তা দেওয়া হয়নি। এখন পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। ঋণে জর্জরিত হয়ে অনেক মালিকেরই নিঃস্ব হওয়ার দশা। এই অবস্থায় কী করে বেতন-বোনাস দেব? এখন তো বাকি আছে শুধু লোহার দরে লঞ্চ বেঁচে খরচ পোষানো।’

১১ বছর ধরে ঢাকা-বরিশাল রুটের লঞ্চে চাকরি করা ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদের আগে মাত্র দুই হাজার ৭শ টাকা পেয়েছি মালিকের কাছ থেকে। এটা দিয়ে ঈদের বাজার করব নাকি মাসের চাল-ডাল কিনব সেটাই তো বুঝে উঠতে পারিনি।’ সুন্দরবন নেভিগেশনের কর্মকর্তা হারুন আর রশিদ বলেন, ‘ঈদের আগে এক মাসের বেতন পেয়েছি। বোনাসের দেখা মেলেনি। তবু মালিকপক্ষকে ধন্যবাদ যে তারা অন্তত বেতনটা দিয়েছে। তা না হলে না খেয়ে থাকতে হতো।’

২-৪টি কোম্পানি এভাবে কর্মচারীদের কিছু কিছু টাকা দিলেও অধিকাংশরাই দিতে পারেনি কিছুই। ইমরান হাওলাদার নামে একজন লঞ্চ কর্মচারী বলেন, ‘আমাদের কোম্পানির সব শ্রমিক-কর্মচারীকে অর্ধেক বেতন দিয়েছে মালিকপক্ষ। তবে বেশ কয়েকটি লঞ্চের কর্মচারী কিছুই পায়নি।’

নৌযান শ্রমিকের ঘরে শুধুই হাহাকার

 আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল 
১৭ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘সুঁই গলানোর ফাঁক না থাকার মতো ভিড় নিয়ে চলছে ফেরি। ঈদের আগে ভিড়ে পদদলিত হয়ে মারা গেছে ছয় জন। তারপরও লঞ্চ চালানোর অনুমতি দেয়নি সরকার। দেশের অন্যান্য এলাকায় সহজেই সড়ক পথে যেতে পারে মানুষ। শুধু খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে লঞ্চ। পাড়ি দিতে হয় পদ্মা নদী। ফেরিঘাটে লাখ লাখ মানুষের জটলা দেখে ফেরি চলাচল যেখানে স্বাভাবিক করে দেওয়া হলো সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে লঞ্চ চালানোর অনুমতি দিলে কি খুব বেশি ক্ষতি হতো? আর যাই হোক লঞ্চে তো আর এভাবে গায়ে গাঁ ঘেঁষে যেতে পারত না কেউ। তাছাড়া লঞ্চে আমাদের সর্বশেষ যে আয়োজন তাতে একজন যাত্রীর সঙ্গে আরেকজনের কমপক্ষে ৩-৪ ফুট দূরত্ব থাকার বিষয়টি তো আমরাই নিশ্চিত করেছিলাম।’

কথাগুলো বলছিলেন বরিশাল লঞ্চ মালিক সমিতির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রিয়াজ উল কবির। বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘ঈদের আগে যে ভিড় আমরা ফেরিতে দেখেছি তাতে এখন করোনার সংক্রমণ বাড়লে তার দায় এড়াতে পারবে না সরকার। এ যেন বজ আঁটুনি ফসকা গেড়ো। লকডাউনে লঞ্চ ও দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ রাখা হলো। কিন্তু তাতে কি মানুষের বাড়ি ফেরা আটকানো গেছে? মোবাইল কোম্পানিগুলোর হিসাবেই ঈদে ঢাকা ছেড়েছে ৬৫ লাখেরও বেশি মানুষ। প্রতিষ্ঠার পর এবারই প্রথম যানবাহন পারাপার আর সর্বোচ্চ রাজস্ব আয়ে রেকর্ড করেছে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু।

এখন আবার একইভাবে শুরু হয়েছে রাজধানীতে ফেরা। কারো গমনাগমন যখন ঠেকানোই যাচ্ছিল না তখনই উচিত ছিল লঞ্চ-বাস ছেড়ে দেওয়া। স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি নিশ্চিত করে এসব যানবাহন যাত্রী পরিবহণ করলে আর যাই হোক করোনা মহামারির এই সময়ে ফেরিতে হাজার হাজার মানুষের এভাবে ভিড় করে পদ্মা পাড়ির দৃশ্য দেখতে হতো না।লঞ্চ বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দেশজুড়ে থাকা প্রায় ১৩শ যাত্রীবাহী লঞ্চের মালিক ও এসব নৌযানে কর্মরত ৩০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক-কর্মচারী। গত বছরের মার্চ থেকে করোনা মহামারির কারণে মন্দা চলছে লঞ্চ ব্যবসায়।

তার ওপর এখন টানা ৪১ দিন ধরে লঞ্চ বন্ধ থাকার কারণে বহু মালিকই বেতন-বোনাস দিতে পারেননি শ্রমিক-কর্মচারীদের। এফবিসিসিআই’র পরিচালক ও বরিশাল মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট নিজামউদ্দিন বলেন, ‘পকেটের টাকা দিয়ে লঞ্চ করার মতো ক্ষমতা সারা দেশে ২-৪ জন মালিকের থাকতে পারে। বাকিরা লঞ্চ নির্মাণ প্রশ্নে নিয়েছেন ঋণ। গত বছর টানা ৬৬ দিন বন্ধ ছিল লঞ্চ। তবে রোজা এবং কোরবানির ঈদে লঞ্চ চলাচলের অনুমতি থাকায় কিছুটা হলেও ক্ষতি পোষানো গেছে। এ বছর ৫ এপ্রিল থেকে বন্ধ লঞ্চ চলাচল। এই বন্ধে পার হয়ে গেছে ঈদ। নিজাম উদ্দিন আরও জানান, এক বছর ধরেই টানা লোকসান দিচ্ছি আমরা। গেল বছর অন্যান্য শিল্পের পাশাপাশি নৌযান শিল্পের জন্যও সহজ শর্তে ঋণ কিংবা প্রণোদনা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। তা দেওয়া হয়নি। এখন পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। ঋণে জর্জরিত হয়ে অনেক মালিকেরই নিঃস্ব হওয়ার দশা। এই অবস্থায় কী করে বেতন-বোনাস দেব? এখন তো বাকি আছে শুধু লোহার দরে লঞ্চ বেঁচে খরচ পোষানো।’

১১ বছর ধরে ঢাকা-বরিশাল রুটের লঞ্চে চাকরি করা ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদের আগে মাত্র দুই হাজার ৭শ টাকা পেয়েছি মালিকের কাছ থেকে। এটা দিয়ে ঈদের বাজার করব নাকি মাসের চাল-ডাল কিনব সেটাই তো বুঝে উঠতে পারিনি।’ সুন্দরবন নেভিগেশনের কর্মকর্তা হারুন আর রশিদ বলেন, ‘ঈদের আগে এক মাসের বেতন পেয়েছি। বোনাসের দেখা মেলেনি। তবু মালিকপক্ষকে ধন্যবাদ যে তারা অন্তত বেতনটা দিয়েছে। তা না হলে না খেয়ে থাকতে হতো।’

২-৪টি কোম্পানি এভাবে কর্মচারীদের কিছু কিছু টাকা দিলেও অধিকাংশরাই দিতে পারেনি কিছুই। ইমরান হাওলাদার নামে একজন লঞ্চ কর্মচারী বলেন, ‘আমাদের কোম্পানির সব শ্রমিক-কর্মচারীকে অর্ধেক বেতন দিয়েছে মালিকপক্ষ। তবে বেশ কয়েকটি লঞ্চের কর্মচারী কিছুই পায়নি।’
 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন