অর্থমন্ত্রী বাজেটে তার শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করেছেন
jugantor
আলোচনা সভায় বিশিষ্টজনরা
অর্থমন্ত্রী বাজেটে তার শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করেছেন
দুর্নীতি বহাল রাখার ফাঁক রাখা হয়েছে

  যুগান্তর প্রতিবেদন  

১১ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রস্তাবিত বাজেট সাধারণ মানুষের জন্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্টজনরা। তারা বলেছেন, অর্থমন্ত্রী একজন ব্যবসায়ী, তার শ্রেণি চরিত্রের আলোকে এ বাজেট তৈরি করা হয়েছে। বাজেটে দুর্নীতি বহাল রাখার ফাঁক রয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল মিলনায়তনে ‘সচেতন নাগরিকদের দৃষ্টিতে ২০২১-২০২২ জাতীয় বাজেট’ শীর্ষক আলোচনাসভায় তারা এ কথা বলেন। এতে অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদরা অংশ নেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, আমার দৃষ্টিতে প্রস্তাবিত বাজেটে তিনটি জায়গায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এগুলো হলো : প্রথমত, কোথায় কী বরাদ্দ দেওয়া হলো। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতাসীনদের অর্থনীতির কৌশলের ধারণা। তৃতীয়ত, পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাজেটে চলমান বাস্তবতার সঠিক প্রতিফলন।

তিনি বলেন, কৌশলের পেছনে একজনের দর্শনও কাজ করে। অর্থনীতিন শাস্ত্রে একটা বহুলপ্রচলিত দার্শনিক অবস্থান আছে। যেটাকে বলা হয় চুইয়ে পড়া অর্থনীতি। দশকের পর দশক ধরে অর্থনীতির শাস্ত্রে বিশেষ করে যারা ক্ষমতাসীন বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের কাছে এই চুইয়ে পড়া অর্থনীতি বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়ে থাকে। অর্থমন্ত্রী মোটামুটি খোলামেলাভাবেই বলেছেন, মূলত ওনার নজর এই চুইয়ে পড়া অর্থনীতির দিকে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, দেশের জিডিপির ৫৫ শতাংশ আসছে সেবা খাত থেকে। সেই সেবা খাতের বিশাল অংশ হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী। এটার সঙ্গে বাংলাদেশে চুইয়ে পড়া অর্থনীতির ধারণাটা সামঞ্জপূর্ণ নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের যে অর্থনৈতিক স্তম্ভ, আমাদের নিচের দিকে যারা প্রবাসী শ্রমিক, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মাঝারি-এরাই কিন্তু অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। বাজেটে এদের বিষয়ে বরাদ্দ দেওয়া হলো কি না, তা বিবেচ্য বিষয় হওয়াটা প্রয়োজন।

১৯২০-২১ অর্থবছরের করোনা মোকাবিলায় ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই টাকার একটা হিসাব দরকার। সরকারের জন্যই এটা দরকার। প্রস্তাবিত বাজেটেও ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে একটা অংশ টিকার জন্য বরাদ্দ হবে তা আমরা জানি। এই অতিমারির সময় অন্যতম একটা ঘাটতি দেখা গেছে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবায়। এটার জন্য একটা সুস্পষ্ট বরাদ্দ দরকার। যাতে নগর স্বাস্থ্য সেবায় বড় ধরনের কাজ করা যায়। গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক বলে যে সেবা রয়েছে সেটা কাজ করছে না। কারণ, জনবল যেটা দরকার, সেখানে সেটা নেই। এখানেও একটা বড় বরাদ্দ থাকা দরকার।

গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বাজেটের প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর পেশা ও শ্রেণির প্রভাব পড়েছে। দুর্নীতি বহাল রাখার ফাঁক রয়ে গেছে। জাতীয় সংসদে বাজেট পেশের আগে সবার সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। জনগণের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি।

তিনি বলেন, বাজেটে আমলাদের খাতির করা হয়েছে। তাদের বেতন অনেক বাড়ানো হয়েছে। গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। তা পরিচালনায় খরচ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এই বাজেটে উপকার পেয়েছে উচ্চশ্রেণি। আমরা মধ্যম আয়ের দেশ; কিন্তু মনোবৃত্তিটা পরিবর্তন হয়নি। ওষুধের কাঁচামালের ওপর কর কমানো হয়েছে-এটা ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না, নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, অর্থমন্ত্রী ব্যর্থ বাজেট দিয়েছেন। উনি বড় শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক, ওনার শ্রেণির খুব বেশি মানুষ নেই। ক্যাপাসিটির তুলনায় আমরা ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার করি। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানিকে ৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের যে ঘাটতি হয়ে গেছে, এটা লাঘবে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া উচিত ছিল। টিকার জন্য আরও বরাদ্দ দরকার ছিল। কিন্তু তা দেওয়া হয়নি।

বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, এখনকার সংসদ প্রশ্নবিদ্ধ এবং সংসদ সদস্যরা জনগণের দাবি ও চাহিদার কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেন না।

প্রশ্ন আসে, বিশাল বাজেটে বড় অঙ্কের টাকা কীভাবে ব্যয় হবে। এক্ষেত্রেও জনগণের সামনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বালাই নেই। বাংলাদেশের গ্রামের মানুষকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তারা কীভাবে এই বাজেট দ্বারা উপকৃত হবে? অথবা তাদের জন্য কী বরাদ্দ রয়েছে? শতকরা ৯২ ভাগ মানুষ জবাব দিতে পারবে না। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, এখন সরকার স্বীকারই করতে চায় না যে, আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে পৌঁছেছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা যে তথ্য দিচ্ছে, সরকার তা আমলে নিচ্ছে না। কারণ তাহলে তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল।

অর্থনীতিবিদ ডা. রেজা কিবরিয়ার সভাপতিত্বে আলোচনাসভায় আরও বক্তব্য দেন জেএসডির শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর প্রমুখ।

আলোচনা সভায় বিশিষ্টজনরা

অর্থমন্ত্রী বাজেটে তার শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করেছেন

দুর্নীতি বহাল রাখার ফাঁক রাখা হয়েছে
 যুগান্তর প্রতিবেদন 
১১ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রস্তাবিত বাজেট সাধারণ মানুষের জন্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্টজনরা। তারা বলেছেন, অর্থমন্ত্রী একজন ব্যবসায়ী, তার শ্রেণি চরিত্রের আলোকে এ বাজেট তৈরি করা হয়েছে। বাজেটে দুর্নীতি বহাল রাখার ফাঁক রয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল মিলনায়তনে ‘সচেতন নাগরিকদের দৃষ্টিতে ২০২১-২০২২ জাতীয় বাজেট’ শীর্ষক আলোচনাসভায় তারা এ কথা বলেন। এতে অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদরা অংশ নেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, আমার দৃষ্টিতে প্রস্তাবিত বাজেটে তিনটি জায়গায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এগুলো হলো : প্রথমত, কোথায় কী বরাদ্দ দেওয়া হলো। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতাসীনদের অর্থনীতির কৌশলের ধারণা। তৃতীয়ত, পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাজেটে চলমান বাস্তবতার সঠিক প্রতিফলন।

তিনি বলেন, কৌশলের পেছনে একজনের দর্শনও কাজ করে। অর্থনীতিন শাস্ত্রে একটা বহুলপ্রচলিত দার্শনিক অবস্থান আছে। যেটাকে বলা হয় চুইয়ে পড়া অর্থনীতি। দশকের পর দশক ধরে অর্থনীতির শাস্ত্রে বিশেষ করে যারা ক্ষমতাসীন বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের কাছে এই চুইয়ে পড়া অর্থনীতি বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়ে থাকে। অর্থমন্ত্রী মোটামুটি খোলামেলাভাবেই বলেছেন, মূলত ওনার নজর এই চুইয়ে পড়া অর্থনীতির দিকে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, দেশের জিডিপির ৫৫ শতাংশ আসছে সেবা খাত থেকে। সেই সেবা খাতের বিশাল অংশ হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী। এটার সঙ্গে বাংলাদেশে চুইয়ে পড়া অর্থনীতির ধারণাটা সামঞ্জপূর্ণ নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের যে অর্থনৈতিক স্তম্ভ, আমাদের নিচের দিকে যারা প্রবাসী শ্রমিক, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মাঝারি-এরাই কিন্তু অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। বাজেটে এদের বিষয়ে বরাদ্দ দেওয়া হলো কি না, তা বিবেচ্য বিষয় হওয়াটা প্রয়োজন।

১৯২০-২১ অর্থবছরের করোনা মোকাবিলায় ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই টাকার একটা হিসাব দরকার। সরকারের জন্যই এটা দরকার। প্রস্তাবিত বাজেটেও ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে একটা অংশ টিকার জন্য বরাদ্দ হবে তা আমরা জানি। এই অতিমারির সময় অন্যতম একটা ঘাটতি দেখা গেছে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবায়। এটার জন্য একটা সুস্পষ্ট বরাদ্দ দরকার। যাতে নগর স্বাস্থ্য সেবায় বড় ধরনের কাজ করা যায়। গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক বলে যে সেবা রয়েছে সেটা কাজ করছে না। কারণ, জনবল যেটা দরকার, সেখানে সেটা নেই। এখানেও একটা বড় বরাদ্দ থাকা দরকার।

গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বাজেটের প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর পেশা ও শ্রেণির প্রভাব পড়েছে। দুর্নীতি বহাল রাখার ফাঁক রয়ে গেছে। জাতীয় সংসদে বাজেট পেশের আগে সবার সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। জনগণের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি।

তিনি বলেন, বাজেটে আমলাদের খাতির করা হয়েছে। তাদের বেতন অনেক বাড়ানো হয়েছে। গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। তা পরিচালনায় খরচ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এই বাজেটে উপকার পেয়েছে উচ্চশ্রেণি। আমরা মধ্যম আয়ের দেশ; কিন্তু মনোবৃত্তিটা পরিবর্তন হয়নি। ওষুধের কাঁচামালের ওপর কর কমানো হয়েছে-এটা ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না, নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, অর্থমন্ত্রী ব্যর্থ বাজেট দিয়েছেন। উনি বড় শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক, ওনার শ্রেণির খুব বেশি মানুষ নেই। ক্যাপাসিটির তুলনায় আমরা ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার করি। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানিকে ৯ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের যে ঘাটতি হয়ে গেছে, এটা লাঘবে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া উচিত ছিল। টিকার জন্য আরও বরাদ্দ দরকার ছিল। কিন্তু তা দেওয়া হয়নি।

বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, এখনকার সংসদ প্রশ্নবিদ্ধ এবং সংসদ সদস্যরা জনগণের দাবি ও চাহিদার কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেন না।

প্রশ্ন আসে, বিশাল বাজেটে বড় অঙ্কের টাকা কীভাবে ব্যয় হবে। এক্ষেত্রেও জনগণের সামনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বালাই নেই। বাংলাদেশের গ্রামের মানুষকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তারা কীভাবে এই বাজেট দ্বারা উপকৃত হবে? অথবা তাদের জন্য কী বরাদ্দ রয়েছে? শতকরা ৯২ ভাগ মানুষ জবাব দিতে পারবে না। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, এখন সরকার স্বীকারই করতে চায় না যে, আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে পৌঁছেছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা যে তথ্য দিচ্ছে, সরকার তা আমলে নিচ্ছে না। কারণ তাহলে তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল।

অর্থনীতিবিদ ডা. রেজা কিবরিয়ার সভাপতিত্বে আলোচনাসভায় আরও বক্তব্য দেন জেএসডির শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর প্রমুখ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন