ট্রিপে বেপরোয়া চালক প্রাণ যাচ্ছে যাত্রীর
jugantor
রাজধানীতে বছরে ৪৫০ জনের মৃত্যু
ট্রিপে বেপরোয়া চালক প্রাণ যাচ্ছে যাত্রীর

  শিপন হাবীব  

১৮ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ট্রিপ পদ্ধতির চাপে বাসচালকরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রাজধানী ঢাকার প্রধান প্রধান সড়কে কার আগে কে যাবে তা নিয়ে তাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা চলছে। চালকদের অসহিষ্ণু রেষারেষিতে বাসে পিষ্ট হয়ে প্রায়ই যাত্রীর প্রাণ যাচ্ছে। বিপজ্জনক প্রতিযোগিতায় শুধু বাসযাত্রী নয়, পথচারীও মারা যায়। এক বছরে রাজধানীতে ৪৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সোমবার রাতে মালিবাগ এলাকায় তুরাগ পরিবহণের যাত্রী মেহেদী হাসান রানা বাসচালকদের রেষারেষিতে প্রাণ হারিয়েছেন। আকাশ পরিবহণের একটি বাসের আঘাতে জানালার পাশে থাকা রানার মাথা এবড়ো-থেবড়ো হয়ে যায়। বাসেই তার করুণ মৃত্যু হয়। ঘটনার পরপরই দুই বাসের চালক পালিয়ে যায়। শৃঙ্খলা ও নিয়ম-নীতি ভেঙে চালকরা প্রতিটি জায়গা থেকে যাত্রী উঠাতে গিয়ে মরিয়া হয়ে ওঠে। কখনো তারা মাদকাসক্ত হয়েও বাস নিয়ে রাস্তায় নামে। কার আগে কে যাবে- এমন মরণ খেলায় তারা মেতে ওঠে। এর ফলে দুই বাসের মাঝখানে পড়ে প্রায় পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী, রিকশাযাত্রী মারাত্মক আহত হন। কখনো কখনো প্রাণও হারান। এসব দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির পরিবার কখনো ক্ষতিপূরণ পায় না। প্রতিবছর খোদ রাজধানীতে যাত্রীবাসগুলোর বিপজ্জনক প্রতিযোগিতায় ৩৫০ থেকে ৪৫০ মানুষের মৃত্যু হয়। এসব সড়ক দুর্ঘটনায় হাত-পা হারিয়ে কেউ কেউ সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায়। রানা বা রাজিব হোসেনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বিষয়গুলো আলোচনায় এলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয় না। বরং পরিস্থিতি আরও অবনতি হচ্ছে।

২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল সার্ক ফোয়ারার কাছে দুই বাসের চাপায় রাজিব হোসেন হাত হারান। ১৪ দিন পর ১৭ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মামলা হলেও তার পরিবারের সদস্যরা এখনো কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর রাজধানীর মৎস্যভবন এলাকায় বাসের চাকায় প্রিষ্ট হয়ে মা রেজিয়া খাতুনের করুণ মৃত্যু হয়। এতে মেয়ে রিনা আক্তার পঙ্গু হয়ে যায়। তাদের পরিবারও কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই হোটেল র‌্যাডিসনের বিপরীত পাশের জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের ঢালে জাবালে নূর পরিবহণের তিনটি বাসের রেষারেষিতে শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব (১৭) ও দিয়া খানম মিম (১৬) মারা যান। এ ঘটনায় ৯ জন আহত হন। এরপর নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ীতে দুই বাসের মরিয়া প্রতিযোগিতায় মোটরসাইকেল চালক ওমর ফারুক তুহিনের (২৮) প্রাণ যায়। একই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দুই বাসের রেষারেষিতে তিন পথচারী নিহত হয়। বুধবার কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় একজন বাসচালক জানান, চালকসহ তিনজন হেলপারকে প্রতি মাসে শ্রম আইন অনুযায়ী বেতন দেওয়া হবে। কিন্তু তাদের কোনোদিনই এমন বেতন দেওয়া হয়নি। আমরা মূলত প্রতিদিন ট্রিপ পদ্ধতিতে বাস চালাই। ট্রিপ অনুযায়ী নির্ধারিত টাকায় বাসভাড়া নিয়ে চালানো হয়। শুক্রবার ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা মালিক পক্ষকে দিতে হয়। অন্যদিন আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়। মালিকের টাকা ওঠার পর নিজেদের টাকা তোলার জন্য তারা মরিয়া হয়ে ওঠেন। এজন্য কার আগে কে যাবে এবং প্রতিটি জায়গা থেকে যাত্রী উঠাতে আমরা তৎপর হয়ে উঠি। লক্ষ্য একটাই- যাত্রী উঠানো। কারণ যাত্রী উঠাতে পারলেই টাকা আসে। তিনি আরও জানান, মালিকদের দৈনিক জমা তোলার চাপ ভয়ানক। কোনো কারণে একদিন আয় না হলেও জমার টাকা দিতে আমরা বাধ্য। তিনি বলেন, নির্ধারিত টাকা তুলতে গিয়ে তারা প্রতিযোগিতায় নামেন। এতে মানুষ মারা যাচ্ছে!

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ট্রাফিক পুলিশ জানান, রেষারেষি করে বেপরোয়া গতিতে বাস চালালে আমরা সেটিকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করি। যানজট সৃষ্টি হবে বলে প্রায় সময় বাস দাঁড় করানো যায় না। নির্ধারিত গতির চেয়ে বেশি গতিতে বাস চালালে সেটিকে থামিয়ে আমরা জরিমানা করি। কিন্তু জরিমানা দিয়ে বাসচালকরা আবার আগের মতোই চলেন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক জানান, রাজধানীতে বেপরোয়া বাস ও যান চলাচলের গল্প পুরোনো। এক একটি বাস যেন মানুষ মারার যন্ত্র। তবে এমন ঘটনায় শুধু চালক কিংবা হেলপার দোষী নয়। বাস মালিক ও তাদের নিয়ন্ত্রকরাই প্রকৃত দোষী। সরকারের নির্দেশনা কেন মানা হচ্ছে না-এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, চালক-হেলপার প্রতি মাসে বেতন পাবেন। কিন্তু তাদের বেতনের দেখা মেলে না। এ টাকা ওঠাতে গিয়ে চালক-হেলপাররা বাসকেই ঘাতকে পরিণত করেন।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক জানান, রাজধানীর সড়কগুলোতে বাস নয়, যেন ঘাতক চলাচল করছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার অনেকটাই উদাসীন। এতে মালিকপক্ষ থেকে শুরু করে চালক-হেলপাররা আরও বেশি হিংস হয়ে ওঠে। সড়কে যে প্রাণ ঝরছে ও ক্ষতি হচ্ছে সেটিকে সরকার যেন কোনো সমস্যা মনে করছে না। শুধু আইন করলেই হবে না-এর বাস্তবায়ন থাকতে হবে।

রাজধানীতে বছরে ৪৫০ জনের মৃত্যু

ট্রিপে বেপরোয়া চালক প্রাণ যাচ্ছে যাত্রীর

 শিপন হাবীব 
১৮ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ট্রিপ পদ্ধতির চাপে বাসচালকরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রাজধানী ঢাকার প্রধান প্রধান সড়কে কার আগে কে যাবে তা নিয়ে তাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা চলছে। চালকদের অসহিষ্ণু রেষারেষিতে বাসে পিষ্ট হয়ে প্রায়ই যাত্রীর প্রাণ যাচ্ছে। বিপজ্জনক প্রতিযোগিতায় শুধু বাসযাত্রী নয়, পথচারীও মারা যায়। এক বছরে রাজধানীতে ৪৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সোমবার রাতে মালিবাগ এলাকায় তুরাগ পরিবহণের যাত্রী মেহেদী হাসান রানা বাসচালকদের রেষারেষিতে প্রাণ হারিয়েছেন। আকাশ পরিবহণের একটি বাসের আঘাতে জানালার পাশে থাকা রানার মাথা এবড়ো-থেবড়ো হয়ে যায়। বাসেই তার করুণ মৃত্যু হয়। ঘটনার পরপরই দুই বাসের চালক পালিয়ে যায়। শৃঙ্খলা ও নিয়ম-নীতি ভেঙে চালকরা প্রতিটি জায়গা থেকে যাত্রী উঠাতে গিয়ে মরিয়া হয়ে ওঠে। কখনো তারা মাদকাসক্ত হয়েও বাস নিয়ে রাস্তায় নামে। কার আগে কে যাবে- এমন মরণ খেলায় তারা মেতে ওঠে। এর ফলে দুই বাসের মাঝখানে পড়ে প্রায় পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী, রিকশাযাত্রী মারাত্মক আহত হন। কখনো কখনো প্রাণও হারান। এসব দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তির পরিবার কখনো ক্ষতিপূরণ পায় না। প্রতিবছর খোদ রাজধানীতে যাত্রীবাসগুলোর বিপজ্জনক প্রতিযোগিতায় ৩৫০ থেকে ৪৫০ মানুষের মৃত্যু হয়। এসব সড়ক দুর্ঘটনায় হাত-পা হারিয়ে কেউ কেউ সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায়। রানা বা রাজিব হোসেনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বিষয়গুলো আলোচনায় এলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয় না। বরং পরিস্থিতি আরও অবনতি হচ্ছে।

২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল সার্ক ফোয়ারার কাছে দুই বাসের চাপায় রাজিব হোসেন হাত হারান। ১৪ দিন পর ১৭ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মামলা হলেও তার পরিবারের সদস্যরা এখনো কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর রাজধানীর মৎস্যভবন এলাকায় বাসের চাকায় প্রিষ্ট হয়ে মা রেজিয়া খাতুনের করুণ মৃত্যু হয়। এতে মেয়ে রিনা আক্তার পঙ্গু হয়ে যায়। তাদের পরিবারও কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই হোটেল র‌্যাডিসনের বিপরীত পাশের জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের ঢালে জাবালে নূর পরিবহণের তিনটি বাসের রেষারেষিতে শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব (১৭) ও দিয়া খানম মিম (১৬) মারা যান। এ ঘটনায় ৯ জন আহত হন। এরপর নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ীতে দুই বাসের মরিয়া প্রতিযোগিতায় মোটরসাইকেল চালক ওমর ফারুক তুহিনের (২৮) প্রাণ যায়। একই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দুই বাসের রেষারেষিতে তিন পথচারী নিহত হয়। বুধবার কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় একজন বাসচালক জানান, চালকসহ তিনজন হেলপারকে প্রতি মাসে শ্রম আইন অনুযায়ী বেতন দেওয়া হবে। কিন্তু তাদের কোনোদিনই এমন বেতন দেওয়া হয়নি। আমরা মূলত প্রতিদিন ট্রিপ পদ্ধতিতে বাস চালাই। ট্রিপ অনুযায়ী নির্ধারিত টাকায় বাসভাড়া নিয়ে চালানো হয়। শুক্রবার ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা মালিক পক্ষকে দিতে হয়। অন্যদিন আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়। মালিকের টাকা ওঠার পর নিজেদের টাকা তোলার জন্য তারা মরিয়া হয়ে ওঠেন। এজন্য কার আগে কে যাবে এবং প্রতিটি জায়গা থেকে যাত্রী উঠাতে আমরা তৎপর হয়ে উঠি। লক্ষ্য একটাই- যাত্রী উঠানো। কারণ যাত্রী উঠাতে পারলেই টাকা আসে। তিনি আরও জানান, মালিকদের দৈনিক জমা তোলার চাপ ভয়ানক। কোনো কারণে একদিন আয় না হলেও জমার টাকা দিতে আমরা বাধ্য। তিনি বলেন, নির্ধারিত টাকা তুলতে গিয়ে তারা প্রতিযোগিতায় নামেন। এতে মানুষ মারা যাচ্ছে!

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ট্রাফিক পুলিশ জানান, রেষারেষি করে বেপরোয়া গতিতে বাস চালালে আমরা সেটিকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করি। যানজট সৃষ্টি হবে বলে প্রায় সময় বাস দাঁড় করানো যায় না। নির্ধারিত গতির চেয়ে বেশি গতিতে বাস চালালে সেটিকে থামিয়ে আমরা জরিমানা করি। কিন্তু জরিমানা দিয়ে বাসচালকরা আবার আগের মতোই চলেন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক জানান, রাজধানীতে বেপরোয়া বাস ও যান চলাচলের গল্প পুরোনো। এক একটি বাস যেন মানুষ মারার যন্ত্র। তবে এমন ঘটনায় শুধু চালক কিংবা হেলপার দোষী নয়। বাস মালিক ও তাদের নিয়ন্ত্রকরাই প্রকৃত দোষী। সরকারের নির্দেশনা কেন মানা হচ্ছে না-এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, চালক-হেলপার প্রতি মাসে বেতন পাবেন। কিন্তু তাদের বেতনের দেখা মেলে না। এ টাকা ওঠাতে গিয়ে চালক-হেলপাররা বাসকেই ঘাতকে পরিণত করেন।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক জানান, রাজধানীর সড়কগুলোতে বাস নয়, যেন ঘাতক চলাচল করছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার অনেকটাই উদাসীন। এতে মালিকপক্ষ থেকে শুরু করে চালক-হেলপাররা আরও বেশি হিংস হয়ে ওঠে। সড়কে যে প্রাণ ঝরছে ও ক্ষতি হচ্ছে সেটিকে সরকার যেন কোনো সমস্যা মনে করছে না। শুধু আইন করলেই হবে না-এর বাস্তবায়ন থাকতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন