বেহুন্দি চরগড়া জালে বন্দি মাছের ভবিষ্যৎ
jugantor
বেহুন্দি চরগড়া জালে বন্দি মাছের ভবিষ্যৎ
চলছে রেণু পোনা নিধন * মাঝরাতে সাগরতীরে নিষিদ্ধ হাট

  আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল  

১৮ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বেহুন্দি চরগড়া জালে বন্দি মাছের ভবিষ্যৎ

মাছ ধরার জালের নাম নেট-বেহুন্দি আর চরগড়া। অতিসূক্ষ্ম ফাঁসের এসব জালের ফাঁক দিয়ে বলতে গেলে কিছুই বেরুতে পারে না। এরকম হাজার হাজার জাল দিয়েই উপকূলের নদী মোহনা আর সাগরপারে চলছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু নিধন।

একজন বা দুজন নয়, হাজার হাজার মানুষ জড়িত এই কাজে। সবাই সাগর ও নদীপারের স্থানীয় বাসিন্দা। শিকার নিষিদ্ধ এসব মাছের রেণু কেনা-বেচার গোপন হাটও রয়েছে সাগরতীরে। গভীর রাতে হাজারো মানুষের আনাগোনায় জমজমাট সেই হাটে দূর-দূরান্ত থেকে আসে পাইকাররা। রাতেই ট্রাক কিংবা মোটরসাইকেলে চেপে পোনা আর রেণু চলে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। বিষয়টি জানেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও।

প্রতিরোধে নানা ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলছেন তারা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অভিযোগ উঠেছে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি আর ম্যানেজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চলে অবাধে পোনা নিধন।

প্রকৃতিতে চলছে বিভিন্ন মাছের প্রজনন মৌসুম। যে কারণে সরকার বন্ধ রেখেছে সমুদ্রে মাছ শিকার। ২০ মে থেকে শুরু হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা চলবে ২৩ জুলাই পর্যন্ত। এই সময়ে গভীর সমুদ্র থেকে উপকূলের কাছাকাছি অগভীর পানিতে এসে ডিম ও পোনা ছাড়ে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। বড় হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত এসব পোনা বিচরণ করে অভ্যন্তরভাগের নদনদীতে।

দেশে মৎস্যসম্পদে প্রাচুর্য্য আনার জন্য এই সময়টাকে বিবেচনা করা হয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে। কিন্তু এখনই চলছে নদী মোহনা ও সাগরে রেণু-পোনা নিধনের মহোৎসব। বরগুনা ও পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় এই নিধনযজ্ঞই যেন হয়ে উঠেছে জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান মাধ্যম।

বরগুনার পরিবেশ ও উন্নয়নকর্মী আরিফুর রহমান বলেন, ‘আশপাশের যে ৩টি বিশাল নদী এই দুই জেলার ওপর দিয়ে সাগরে মিশেছে, সেগুলোর মোহনায় এখন চোখে পড়বে নেট-বেহুন্দি আর চরগড়া জাল দিয়ে রেণু-পোনা ধরার দৃশ্য। ঘণ্টা দুয়েক জাল টানার পর নদী কিংবা সমুদ্রসৈকতে রাখা পানির পাত্রে ঢালা হয় মাছের পোনা। বিক্রিযোগ্য পোনা রেখে সৈকতেই ফেলে দেওয়া হয় বাকিগুলো। ফলে মৃত্যু ঘটে ভবিষ্যতের কোটি কোটি বড় মাছের।’

আরিফুর রহমানের বক্তব্যের প্রতিফলন চোখে পড়ে বলেশ্বর-বিশখালী আর পায়রা নদী মোহনার বিভিন্ন এলাকায়। বরগুনা সদর উপজেলার কুমিরমারা, নিশানবাড়িয়া, গোলবুনিয়া ও চালিতাতলি, পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা স্লুইজ, রুহিতা এবং তালতলী উপজেলার জয়ালভাঙ্গা, নিশানবাড়িয়া, নিদ্রা সখিনা ও সমুদ্রসৈকত শুভ সন্ধ্যায় সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল দিয়ে রেণু-পোনা ধরছে হাজার হাজার মানুষ। আবালবৃদ্ধবনিতা জড়িত এই কাজে। কথা হয় তালতলী শুভ সন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতে বেহুন্দি জাল দিয়ে রেণু-পোনা ধরায় ব্যস্ত এক কিশোরীর সঙ্গে।

সে জানায়, ‘সবচেয়ে ভালো দাম পাওয়া যায় বাগদা চিংড়ির পোনার ক্ষেত্রে। প্রতি পিস ১ টাকা ৫০ পয়সা। এছাড়া জালে ধরা পড়ে চিংড়ি, দগড়ি, পোমা এবং তাপসিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পোনা মাছ। এগুলো বিক্রি হয় ঠিকা দামে। স্থানীয় কয়েকজন আছেন, যারা আমাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে নেন এসব পোনা।’

বাংলাদেশ ফিশিং বোট ওনার্স ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘যেসব জাল দিয়ে এই রেণু-পোনা ধরা হয়, তার ভয়াবহতা বলে শেষ করা যাবে না। পানিতে থাকা কোনো কিছুই ছাড়া পায় না জাল থেকে। ছেঁকে সব ধরার পর যা বিক্রিযোগ্য, তা রেখে বাকি রেণু-পোনা ফেলে দেওয়া হয় সৈকতের শুকনো বালি কিংবা নদীর চরে। ফলে মারা যায় সব। এভাবে রেণু-পোনা নিধনের বিরুদ্ধে বহু আন্দোলন করেছি আমরা। নেট-বেহুন্দি আর চরগড়া জাল নিষিদ্ধ করারও দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এইসব জাল নিষিদ্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে দেশে মাছ বলে আর কিছু থাকবে না। এই যে সরকারের এত উদ্যোগের পরও এবার ভরা মৌসুমে ইলিশ পাওয়া গেল না, এর জন্য দায়ী এই রেণু-পোনা নিধন। সরকারের উচিত এই বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে নজর দেওয়া।’

বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু আর পোনা বিক্রির জন্য মধ্যরাতের হাটও আছে সাগরপারের বিভিন্ন এলাকায়। এর মধ্যে কেবলই বাগদা চিংড়ির পোনা বিক্রি হয় পাথরঘাটার চরদোয়ানী এলাকায়। রাত ১২টার পরে বসে এই হাট। দূর-দূরান্ত থেকে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ছোট যানবাহন নিয়ে হাটে আসে ক্রেতারা। পাথরঘাটার একাধিক সূত্র জানায়, হাট থেকে বাগদা চিংড়ির পোনা কিনে কলসিতে ভরে নিয়ে যায় মোটরসাইকেল আরোহীরা।

প্রতি মোটরসাইকেলে থাকে ২টি করে কলসি। এসব পোনা যায় বাগেরহাট যশোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের চিংড়ির ঘেরগুলোয়। একই উপজেলার রুহিতা আর পদ্মা স্লুইজ এলাকায় বসে ইলিশসহ অন্যান্য পোনা মাছের হাট। এই দুটি অবশ্য বসে রাত ২টার পর। হাটের পাশেই অপেক্ষমাণ থাকে ট্রাকের সারি। কেনা-বেচা হলেই ড্রামে ভরে ট্রাকে উঠে পোনার চালান সারা দেশে যায়।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি যুগান্তরকে বলেন, ‘এভাবে পোনা নিধন ও বিক্রির সবকিছুই জানেন মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা। কিন্তু ম্যানেজ প্রক্রিয়ায় নীরব থাকেন তারা। যারা রেণু-পোনা ধরে, তাদেরকে নিরাপত্তা দেওয়া আর এই ম্যানেজ প্রক্রিয়ার জন্য রয়েছে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী চক্র। এরাই দেখে রাখে সবকিছু।’

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে পাথরঘাটা উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, ‘মধ্যরাতে হাটের বিষয়টি আমরাও জানি। তবে সেটি বসে সুন্দরবনের পক্ষিদিয়া এলাকায়। আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হওয়ায় কিছুই করার থাকে না। এছাড়া আমরা নদী মোহনা এবং সমুদ্রসৈকতে নিয়মিত টহল দিই। ঠেকানোর চেষ্টা করি রেণু-পোনা নিধন।’

তালতলী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা। গত তিনদিনে বিপুল সংখ্যক রেণু-পোনা ধরে মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা হয়েছে। লোকবল সংকট না থাকলে হয়তো পুরোটাই সামাল দিতে পারতাম।’

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যাকোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলে যে কোনো মাছের রেণু-পোনা নিধন আইনত দণ্ডনীয়। এসব ক্ষেত্রে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ তো করতেই হবে তবে সবচেয়ে জরুরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং রেণু-পোনা নিধনে যেসব জাল ব্যবহার হয়, তার উৎপাদন নিষিদ্ধ করা। তা না হলে যে হারে রেণু-পোনা নিধন হচ্ছে তাতে দেশ অচিরেই মাছের সংকটে পড়বে।’

বেহুন্দি চরগড়া জালে বন্দি মাছের ভবিষ্যৎ

চলছে রেণু পোনা নিধন * মাঝরাতে সাগরতীরে নিষিদ্ধ হাট
 আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল 
১৮ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
বেহুন্দি চরগড়া জালে বন্দি মাছের ভবিষ্যৎ
বরগুনা পাথরঘাটায় পদ্মানদী থেকে রেণু পোনা ধরতে জাল টানছে দুই কিশোরী। (বৃহস্পতিবারের ছবি)। যুগান্তর

মাছ ধরার জালের নাম নেট-বেহুন্দি আর চরগড়া। অতিসূক্ষ্ম ফাঁসের এসব জালের ফাঁক দিয়ে বলতে গেলে কিছুই বেরুতে পারে না। এরকম হাজার হাজার জাল দিয়েই উপকূলের নদী মোহনা আর সাগরপারে চলছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু নিধন।

একজন বা দুজন নয়, হাজার হাজার মানুষ জড়িত এই কাজে। সবাই সাগর ও নদীপারের স্থানীয় বাসিন্দা। শিকার নিষিদ্ধ এসব মাছের রেণু কেনা-বেচার গোপন হাটও রয়েছে সাগরতীরে। গভীর রাতে হাজারো মানুষের আনাগোনায় জমজমাট সেই হাটে দূর-দূরান্ত থেকে আসে পাইকাররা। রাতেই ট্রাক কিংবা মোটরসাইকেলে চেপে পোনা আর রেণু চলে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। বিষয়টি জানেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও।

প্রতিরোধে নানা ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলছেন তারা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অভিযোগ উঠেছে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি আর ম্যানেজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চলে অবাধে পোনা নিধন।

প্রকৃতিতে চলছে বিভিন্ন মাছের প্রজনন মৌসুম। যে কারণে সরকার বন্ধ রেখেছে সমুদ্রে মাছ শিকার। ২০ মে থেকে শুরু হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা চলবে ২৩ জুলাই পর্যন্ত। এই সময়ে গভীর সমুদ্র থেকে উপকূলের কাছাকাছি অগভীর পানিতে এসে ডিম ও পোনা ছাড়ে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। বড় হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত এসব পোনা বিচরণ করে অভ্যন্তরভাগের নদনদীতে।

দেশে মৎস্যসম্পদে প্রাচুর্য্য আনার জন্য এই সময়টাকে বিবেচনা করা হয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে। কিন্তু এখনই চলছে নদী মোহনা ও সাগরে রেণু-পোনা নিধনের মহোৎসব। বরগুনা ও পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় এই নিধনযজ্ঞই যেন হয়ে উঠেছে জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান মাধ্যম।

বরগুনার পরিবেশ ও উন্নয়নকর্মী আরিফুর রহমান বলেন, ‘আশপাশের যে ৩টি বিশাল নদী এই দুই জেলার ওপর দিয়ে সাগরে মিশেছে, সেগুলোর মোহনায় এখন চোখে পড়বে নেট-বেহুন্দি আর চরগড়া জাল দিয়ে রেণু-পোনা ধরার দৃশ্য। ঘণ্টা দুয়েক জাল টানার পর নদী কিংবা সমুদ্রসৈকতে রাখা পানির পাত্রে ঢালা হয় মাছের পোনা। বিক্রিযোগ্য পোনা রেখে সৈকতেই ফেলে দেওয়া হয় বাকিগুলো। ফলে মৃত্যু ঘটে ভবিষ্যতের কোটি কোটি বড় মাছের।’

আরিফুর রহমানের বক্তব্যের প্রতিফলন চোখে পড়ে বলেশ্বর-বিশখালী আর পায়রা নদী মোহনার বিভিন্ন এলাকায়। বরগুনা সদর উপজেলার কুমিরমারা, নিশানবাড়িয়া, গোলবুনিয়া ও চালিতাতলি, পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা স্লুইজ, রুহিতা এবং তালতলী উপজেলার জয়ালভাঙ্গা, নিশানবাড়িয়া, নিদ্রা সখিনা ও সমুদ্রসৈকত শুভ সন্ধ্যায় সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল দিয়ে রেণু-পোনা ধরছে হাজার হাজার মানুষ। আবালবৃদ্ধবনিতা জড়িত এই কাজে। কথা হয় তালতলী শুভ সন্ধ্যা সমুদ্রসৈকতে বেহুন্দি জাল দিয়ে রেণু-পোনা ধরায় ব্যস্ত এক কিশোরীর সঙ্গে।

সে জানায়, ‘সবচেয়ে ভালো দাম পাওয়া যায় বাগদা চিংড়ির পোনার ক্ষেত্রে। প্রতি পিস ১ টাকা ৫০ পয়সা। এছাড়া জালে ধরা পড়ে চিংড়ি, দগড়ি, পোমা এবং তাপসিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পোনা মাছ। এগুলো বিক্রি হয় ঠিকা দামে। স্থানীয় কয়েকজন আছেন, যারা আমাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে নেন এসব পোনা।’

বাংলাদেশ ফিশিং বোট ওনার্স ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘যেসব জাল দিয়ে এই রেণু-পোনা ধরা হয়, তার ভয়াবহতা বলে শেষ করা যাবে না। পানিতে থাকা কোনো কিছুই ছাড়া পায় না জাল থেকে। ছেঁকে সব ধরার পর যা বিক্রিযোগ্য, তা রেখে বাকি রেণু-পোনা ফেলে দেওয়া হয় সৈকতের শুকনো বালি কিংবা নদীর চরে। ফলে মারা যায় সব। এভাবে রেণু-পোনা নিধনের বিরুদ্ধে বহু আন্দোলন করেছি আমরা। নেট-বেহুন্দি আর চরগড়া জাল নিষিদ্ধ করারও দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এইসব জাল নিষিদ্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে দেশে মাছ বলে আর কিছু থাকবে না। এই যে সরকারের এত উদ্যোগের পরও এবার ভরা মৌসুমে ইলিশ পাওয়া গেল না, এর জন্য দায়ী এই রেণু-পোনা নিধন। সরকারের উচিত এই বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে নজর দেওয়া।’

বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু আর পোনা বিক্রির জন্য মধ্যরাতের হাটও আছে সাগরপারের বিভিন্ন এলাকায়। এর মধ্যে কেবলই বাগদা চিংড়ির পোনা বিক্রি হয় পাথরঘাটার চরদোয়ানী এলাকায়। রাত ১২টার পরে বসে এই হাট। দূর-দূরান্ত থেকে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ছোট যানবাহন নিয়ে হাটে আসে ক্রেতারা। পাথরঘাটার একাধিক সূত্র জানায়, হাট থেকে বাগদা চিংড়ির পোনা কিনে কলসিতে ভরে নিয়ে যায় মোটরসাইকেল আরোহীরা।

প্রতি মোটরসাইকেলে থাকে ২টি করে কলসি। এসব পোনা যায় বাগেরহাট যশোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের চিংড়ির ঘেরগুলোয়। একই উপজেলার রুহিতা আর পদ্মা স্লুইজ এলাকায় বসে ইলিশসহ অন্যান্য পোনা মাছের হাট। এই দুটি অবশ্য বসে রাত ২টার পর। হাটের পাশেই অপেক্ষমাণ থাকে ট্রাকের সারি। কেনা-বেচা হলেই ড্রামে ভরে ট্রাকে উঠে পোনার চালান সারা দেশে যায়।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি যুগান্তরকে বলেন, ‘এভাবে পোনা নিধন ও বিক্রির সবকিছুই জানেন মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা। কিন্তু ম্যানেজ প্রক্রিয়ায় নীরব থাকেন তারা। যারা রেণু-পোনা ধরে, তাদেরকে নিরাপত্তা দেওয়া আর এই ম্যানেজ প্রক্রিয়ার জন্য রয়েছে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী চক্র। এরাই দেখে রাখে সবকিছু।’

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে পাথরঘাটা উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, ‘মধ্যরাতে হাটের বিষয়টি আমরাও জানি। তবে সেটি বসে সুন্দরবনের পক্ষিদিয়া এলাকায়। আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হওয়ায় কিছুই করার থাকে না। এছাড়া আমরা নদী মোহনা এবং সমুদ্রসৈকতে নিয়মিত টহল দিই। ঠেকানোর চেষ্টা করি রেণু-পোনা নিধন।’

তালতলী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা। গত তিনদিনে বিপুল সংখ্যক রেণু-পোনা ধরে মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা হয়েছে। লোকবল সংকট না থাকলে হয়তো পুরোটাই সামাল দিতে পারতাম।’

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যাকোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলে যে কোনো মাছের রেণু-পোনা নিধন আইনত দণ্ডনীয়। এসব ক্ষেত্রে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ তো করতেই হবে তবে সবচেয়ে জরুরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং রেণু-পোনা নিধনে যেসব জাল ব্যবহার হয়, তার উৎপাদন নিষিদ্ধ করা। তা না হলে যে হারে রেণু-পোনা নিধন হচ্ছে তাতে দেশ অচিরেই মাছের সংকটে পড়বে।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন