৩ ঘণ্টায় অভিযোগপত্র দেওয়ার নজির
jugantor
২ মাস ২৫ দিনে ১১০ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি
৩ ঘণ্টায় অভিযোগপত্র দেওয়ার নজির

  সিরাজুল ইসলাম  

১৯ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পূর্ব নিমাই কাশারীর নিজ বাসায় ১৪ মে ভোরে গৃহবধূ ফাতেমা ছুরিকাঘাতে খুন হন। ১৬ মে আসামি গ্রেফতার হয়। ওইদিনই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় ১৮ মে। অর্থাৎ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন, তদন্ত পরিচালনা, অভিযোগপত্র তৈরি এবং আদালতে জমা দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৪ দিনে। মামলার বাদী মো. মিলন যুগান্তরকে জানান, থানা পুলিশের তৎপরতায় আমি খুবই মুগ্ধ। এ ধরনের একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের চার্জশিট এত দ্রুত কখনও হয়েছে বলে জানা নেই।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার কর্ণফুলী শিপইয়ার্ডে ২৬ মে লোহার রিং চুরি হয়। আসামি গ্রেফতার, তদন্ত সম্পন্ন এবং অভিযোগপত্র প্রস্তুত করতে পুলিশের সময় লেগেছে কয়েক ঘণ্টা। মোস্তফা নামের এক চোরকে আসামি করে ঘটনার মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ।

মাদ্রাসাছাত্র রিয়াদ (৭) অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলার ২৫ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ। দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়ায় খুশি মামলার বাদী ও নিহত শিশুর বাবা মো. রাজু। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়ে পুলিশ আসামিদের আইনের আতায় এনেছে। ৩০ মে সাজু এবং সুজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

শুধু এ তিনটি ঘটনা নয়; পুলিশ এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার ব্যাপারে প্রত্যয়ী। যদিও পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে কালক্ষেপণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হয় তদন্ত কাজ। চলতি বছরের শুরুতে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে। ঢাকা রেঞ্জ এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১১ মার্চ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত ঢাকা রেঞ্জের ১৩টি জেলার মধ্যে ১২টি জেলায় (মাদারীপুর ছাড়া) দ্রুততম সময়ের মধ্যে ১১০টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এসব মামলার অভিযোগপত্র দিতে সময় লেগেছে সর্বোচ্চ ২৯ দিন। দিনে দিনে, এমনকি অপরাধ সংঘটনের ৩ ঘণ্টার মধ্যেও অভিযোগপত্র দাখিলের নজির তৈরি করেছে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জ।

রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দে মাত্র ৮ দিনের মধ্যে একটি ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন, ঘাতককে গ্রেফতার ও মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল তায়াবী জানান, নিখোঁজের ৩ দিন পর ১০ মে মঙ্গলবার দুপুরে নাসির ইসলাম নয়নের (২০) লাশ উদ্ধার করে গোয়ালন্দ ঘাট থানা পুলিশ। পার্শ্ববর্তী মঙ্গলপুর গ্রামের মশিউর রহমান নামে এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন বাড়ির পেছনে বালুর নিচ থেকে নয়নের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নয়নের মা নাসিমা বেগম বাদী হয়ে পরদিন গোয়ালন্দ ঘাট থানায় কারও নাম উল্লেখ না করে মামলা করেন। এর ৫ দিন পর ১৬ মে পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডের একমাত্র ঘাতক মানিক হোসেন ওরফে আজমীরকে (১৮) গ্রেফতার করে। আজমীরকে ১৭ মে রাজবাড়ীর চিফ জুডিশিয়াল আদালতে হাজির করা হলে সে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। ১৯ মে আদালতে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। ওসি বলেন, তালের রস খাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই বন্ধু- নয়ন এবং আজমীরের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। এর জেরে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে নয়নকে হত্যা করা হয়।

টাঙ্গাইলের সখিপুর থানার ওসি একে সাইদুল হক ভূঁইয়া জানান, স্ত্রীর করা যৌতুক ও নির্যাতন মামলায় স্কুলশিক্ষক স্বামীকে গ্রেফতারের ৩ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। স্কুলশিক্ষকের নাম মিজানুর রহমান সবুজ।

নরসিংদীর পুলিশ সুপার (এসপি) কাজী আশরাফুল আজীম জানান, একটি চাঞ্চল্যকর অপহরণ মামলায় ৬ ঘণ্টার মধ্যেই চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নরসিংদীর করিমপুর এলাকার বাসিন্দা কলেজছাত্র সবুজ মোল্লা ৩ মে সকাল ৭টার দিকে শালিধা এলাকা থেকে ব্রাহ্মণদীতে প্রাইভেট পড়তে রওনা হয়। নরসিংদী মডেল থানাধীন সরকারি কলেজের সামনে পৌঁছলে চার যুবক তাকে ধারালো ছুরির ভয়ভীতি দেখিয়ে গাড়িতে তোলে। এরপর তারা মুক্তিপণ দাবি করে। ওইদিন দুপুরে শিবপুর মডেল থানাধীন ঘাগটিয়া পুকুরপাড়ে অভিযান চালিয়ে অপহরণকারী নাদিম মিয়া, আরিফ মিয়া, প্রান্ত চন্দ্র দাস ও মামুনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। একই দিন তাদের আদালতে হাজির করে সবার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়।

গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জহিরুল ইসলাম বলেন, সদর উপজেলার জয়দেবপুর থানার মনিপুর এলাকায় স্ত্রীকে সাত টুকরা করে হত্যার ৪ দিনের মাথায় স্বামী জুয়েল আহমদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। ১১ মার্চ পুলিশ অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। নিহত ওই নারী হলেন পোশাককর্মী রেহেনা আক্তার (২০)। তিনি সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর থানার ইসলামপুর গ্রামের আবদুল মালেকের মেয়ে। অভিযুক্ত জুয়েলও একই গ্রামের বাছেদ মিয়ার ছেলে। ৭ মার্চ বিকালে গাজীপুর সদর উপজেলার মনিপুর এলাকার কয়েকটি স্থান থেকে রেহেনা আক্তারের সাত টুকরা লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই দিনই এলাকাবাসী জুয়েল আহমদকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। পরদিন এ ঘটনায় জয়দেবপুর থানায় হত্যা মামলা হয়।

মানিকগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ আকবর আলি খান বলেন, একটি চুরির ঘটনায় থানায় অভিযোগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুরি হওয়া মালামাল ও আসামিসহ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছি। ৩১ মে রাত অনুমানিক ১টার দিকে পৌরসভা এলাকায় নার্গিস আনোয়ারের বাড়ির ভাড়াটিয়া জসিম উদ্দিনের ঘরে চুরি হয়। এ ঘটনায় আসামি আনোয়ার হোসেনকে গ্রেফতারের পাশাপাশি চুরি হওয়া জিনিসপত্র উদ্ধার করে। এরপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়।

পুলিশ জানায়, দ্রুততম সময়ের মধ্যে গত ৩ মাসে ১১০টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে নরসিংদীতে ৩৪টি, টাঙ্গাইলে ২২টি এবং কিশোরগঞ্জে ১৭টি, নারায়ণগঞ্জে তিনটি, মুন্সীগঞ্জে চারটি, ফরিদপুরে চারটি, গোপালগঞ্জে নয়টি, মানিকগঞ্জে সাতটি, রাজবাড়ীতে সাতটি, শরীয়তপুরে চারটি, ঢাকায় দুটি এবং গাজীপুরে একটি।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (মিডিয়া) হায়দার আলী খান যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান আইজিপির নির্দেশনা হলো- প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ বা অভিযোগপত্র দাখিলের মতো তথ্য-উপাত্ত থাকতে কোনো মামলার তদন্ত ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। এছাড়া পুলিশের সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মনিটরিং বেড়েছে। এসব কারণে সম্প্রতিক সময়ে দ্রুততার সঙ্গে মামলার তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হচ্ছে।

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপরাধ) নূরে আলম মিনা বলেন- মাদক, অস্ত্র, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত শেষ করার জন্য নির্ধারিত সময় সীমা আছে। কিন্তু হত্যা, অপহরণ চাঁদাবাজি এবং প্রতারণাসহ দণ্ডবিধির অনেক অপরাধের ঘটনায় দায়ের হওয়ার মামলার তদন্ত শেষ করার বিষয়ে কোনো সময়সীমা নেই। তাই এসব মামলার তদন্ত কাজে অনেক ক্ষেত্রেই তদন্ত কর্মকর্তাদের ঢিলেমি ভাব ছিল। এতে অনেক মামলার তদন্ত বছরের পর বছর ঝুলে ছিল। বিষয়টি নিয়ে ভিকটিম ও তার স্বজনদের মধ্যে হতাশাবোধ কাজ করছিল। এ কারণে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান নির্দশনা দেন, নিষ্পত্তিযোগ্য কোনো মামলাই ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিতে হবে। এ নির্দেশনার পর ঢাকা রেঞ্জে তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। নতুন মামলার পাশাপাশি অতীতের ঝুলে থাকা মামলাগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। মে মাসেই ঢাকা রেঞ্জে দুই হাজার ৫০৫টি মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়। এ মুহূর্তে ঢাকা রেঞ্জের ১৩টি জেলায় এক বছরের বেশি সময়ের মামলার সংখ্যা মাত্র ৪৩টি। অধিকতর তদন্তের মামলা গত বছর ছিল এক হাজারের বেশি। এখন মাত্র ৬টি। কোর্ট পিটিশনের মামলা তদন্তাধীন ছিল ১৩ হাজারের বেশি। এ সংখ্যা কমে এখন এক হাজার ৩০০। অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঝুলে থাকা মামলা শূন্যের কোটায়।

জানতে চাইলে নরসিংদীর এসপি কাজী আশরাফুল আজীম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে থানায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ মামলা হলে সঙ্গে সঙ্গেই এসপি অফিস থেকে মনিটরিং শুরু করা হয়। থানা পুলিশকে দ্রুততার সঙ্গে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয়। এসব কারণে দ্রুত আসামি গ্রেফতারসহ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হচ্ছে। আর রহস্য উদ্ঘাটন হয়ে গেলে বা আসামি গ্রেফতার হলে অযথা মামলার তদন্ত ঝুলিয়ে রাখার কারণ নেই।

২ মাস ২৫ দিনে ১১০ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি

৩ ঘণ্টায় অভিযোগপত্র দেওয়ার নজির

 সিরাজুল ইসলাম 
১৯ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পূর্ব নিমাই কাশারীর নিজ বাসায় ১৪ মে ভোরে গৃহবধূ ফাতেমা ছুরিকাঘাতে খুন হন। ১৬ মে আসামি গ্রেফতার হয়। ওইদিনই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় ১৮ মে। অর্থাৎ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন, তদন্ত পরিচালনা, অভিযোগপত্র তৈরি এবং আদালতে জমা দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৪ দিনে। মামলার বাদী মো. মিলন যুগান্তরকে জানান, থানা পুলিশের তৎপরতায় আমি খুবই মুগ্ধ। এ ধরনের একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের চার্জশিট এত দ্রুত কখনও হয়েছে বলে জানা নেই।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার কর্ণফুলী শিপইয়ার্ডে ২৬ মে লোহার রিং চুরি হয়। আসামি গ্রেফতার, তদন্ত সম্পন্ন এবং অভিযোগপত্র প্রস্তুত করতে পুলিশের সময় লেগেছে কয়েক ঘণ্টা। মোস্তফা নামের এক চোরকে আসামি করে ঘটনার মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ।

মাদ্রাসাছাত্র রিয়াদ (৭) অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলার ২৫ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ। দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়ায় খুশি মামলার বাদী ও নিহত শিশুর বাবা মো. রাজু। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়ে পুলিশ আসামিদের আইনের আতায় এনেছে। ৩০ মে সাজু এবং সুজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

শুধু এ তিনটি ঘটনা নয়; পুলিশ এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার ব্যাপারে প্রত্যয়ী। যদিও পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে কালক্ষেপণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হয় তদন্ত কাজ। চলতি বছরের শুরুতে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে। ঢাকা রেঞ্জ এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১১ মার্চ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত ঢাকা রেঞ্জের ১৩টি জেলার মধ্যে ১২টি জেলায় (মাদারীপুর ছাড়া) দ্রুততম সময়ের মধ্যে ১১০টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এসব মামলার অভিযোগপত্র দিতে সময় লেগেছে সর্বোচ্চ ২৯ দিন। দিনে দিনে, এমনকি অপরাধ সংঘটনের ৩ ঘণ্টার মধ্যেও অভিযোগপত্র দাখিলের নজির তৈরি করেছে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জ।

রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দে মাত্র ৮ দিনের মধ্যে একটি ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন, ঘাতককে গ্রেফতার ও মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল তায়াবী জানান, নিখোঁজের ৩ দিন পর ১০ মে মঙ্গলবার দুপুরে নাসির ইসলাম নয়নের (২০) লাশ উদ্ধার করে গোয়ালন্দ ঘাট থানা পুলিশ। পার্শ্ববর্তী মঙ্গলপুর গ্রামের মশিউর রহমান নামে এক ব্যক্তির নির্মাণাধীন বাড়ির পেছনে বালুর নিচ থেকে নয়নের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নয়নের মা নাসিমা বেগম বাদী হয়ে পরদিন গোয়ালন্দ ঘাট থানায় কারও নাম উল্লেখ না করে মামলা করেন। এর ৫ দিন পর ১৬ মে পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডের একমাত্র ঘাতক মানিক হোসেন ওরফে আজমীরকে (১৮) গ্রেফতার করে। আজমীরকে ১৭ মে রাজবাড়ীর চিফ জুডিশিয়াল আদালতে হাজির করা হলে সে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। ১৯ মে আদালতে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। ওসি বলেন, তালের রস খাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই বন্ধু- নয়ন এবং আজমীরের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। এর জেরে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে নয়নকে হত্যা করা হয়।

টাঙ্গাইলের সখিপুর থানার ওসি একে সাইদুল হক ভূঁইয়া জানান, স্ত্রীর করা যৌতুক ও নির্যাতন মামলায় স্কুলশিক্ষক স্বামীকে গ্রেফতারের ৩ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। স্কুলশিক্ষকের নাম মিজানুর রহমান সবুজ।

নরসিংদীর পুলিশ সুপার (এসপি) কাজী আশরাফুল আজীম জানান, একটি চাঞ্চল্যকর অপহরণ মামলায় ৬ ঘণ্টার মধ্যেই চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নরসিংদীর করিমপুর এলাকার বাসিন্দা কলেজছাত্র সবুজ মোল্লা ৩ মে সকাল ৭টার দিকে শালিধা এলাকা থেকে ব্রাহ্মণদীতে প্রাইভেট পড়তে রওনা হয়। নরসিংদী মডেল থানাধীন সরকারি কলেজের সামনে পৌঁছলে চার যুবক তাকে ধারালো ছুরির ভয়ভীতি দেখিয়ে গাড়িতে তোলে। এরপর তারা মুক্তিপণ দাবি করে। ওইদিন দুপুরে শিবপুর মডেল থানাধীন ঘাগটিয়া পুকুরপাড়ে অভিযান চালিয়ে অপহরণকারী নাদিম মিয়া, আরিফ মিয়া, প্রান্ত চন্দ্র দাস ও মামুনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। একই দিন তাদের আদালতে হাজির করে সবার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়।

গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জহিরুল ইসলাম বলেন, সদর উপজেলার জয়দেবপুর থানার মনিপুর এলাকায় স্ত্রীকে সাত টুকরা করে হত্যার ৪ দিনের মাথায় স্বামী জুয়েল আহমদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। ১১ মার্চ পুলিশ অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। নিহত ওই নারী হলেন পোশাককর্মী রেহেনা আক্তার (২০)। তিনি সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর থানার ইসলামপুর গ্রামের আবদুল মালেকের মেয়ে। অভিযুক্ত জুয়েলও একই গ্রামের বাছেদ মিয়ার ছেলে। ৭ মার্চ বিকালে গাজীপুর সদর উপজেলার মনিপুর এলাকার কয়েকটি স্থান থেকে রেহেনা আক্তারের সাত টুকরা লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই দিনই এলাকাবাসী জুয়েল আহমদকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। পরদিন এ ঘটনায় জয়দেবপুর থানায় হত্যা মামলা হয়।

মানিকগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ আকবর আলি খান বলেন, একটি চুরির ঘটনায় থানায় অভিযোগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুরি হওয়া মালামাল ও আসামিসহ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছি। ৩১ মে রাত অনুমানিক ১টার দিকে পৌরসভা এলাকায় নার্গিস আনোয়ারের বাড়ির ভাড়াটিয়া জসিম উদ্দিনের ঘরে চুরি হয়। এ ঘটনায় আসামি আনোয়ার হোসেনকে গ্রেফতারের পাশাপাশি চুরি হওয়া জিনিসপত্র উদ্ধার করে। এরপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়।

পুলিশ জানায়, দ্রুততম সময়ের মধ্যে গত ৩ মাসে ১১০টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে নরসিংদীতে ৩৪টি, টাঙ্গাইলে ২২টি এবং কিশোরগঞ্জে ১৭টি, নারায়ণগঞ্জে তিনটি, মুন্সীগঞ্জে চারটি, ফরিদপুরে চারটি, গোপালগঞ্জে নয়টি, মানিকগঞ্জে সাতটি, রাজবাড়ীতে সাতটি, শরীয়তপুরে চারটি, ঢাকায় দুটি এবং গাজীপুরে একটি।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (মিডিয়া) হায়দার আলী খান যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান আইজিপির নির্দেশনা হলো- প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ বা অভিযোগপত্র দাখিলের মতো তথ্য-উপাত্ত থাকতে কোনো মামলার তদন্ত ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। এছাড়া পুলিশের সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মনিটরিং বেড়েছে। এসব কারণে সম্প্রতিক সময়ে দ্রুততার সঙ্গে মামলার তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হচ্ছে।

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপরাধ) নূরে আলম মিনা বলেন- মাদক, অস্ত্র, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত শেষ করার জন্য নির্ধারিত সময় সীমা আছে। কিন্তু হত্যা, অপহরণ চাঁদাবাজি এবং প্রতারণাসহ দণ্ডবিধির অনেক অপরাধের ঘটনায় দায়ের হওয়ার মামলার তদন্ত শেষ করার বিষয়ে কোনো সময়সীমা নেই। তাই এসব মামলার তদন্ত কাজে অনেক ক্ষেত্রেই তদন্ত কর্মকর্তাদের ঢিলেমি ভাব ছিল। এতে অনেক মামলার তদন্ত বছরের পর বছর ঝুলে ছিল। বিষয়টি নিয়ে ভিকটিম ও তার স্বজনদের মধ্যে হতাশাবোধ কাজ করছিল। এ কারণে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান নির্দশনা দেন, নিষ্পত্তিযোগ্য কোনো মামলাই ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিতে হবে। এ নির্দেশনার পর ঢাকা রেঞ্জে তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। নতুন মামলার পাশাপাশি অতীতের ঝুলে থাকা মামলাগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। মে মাসেই ঢাকা রেঞ্জে দুই হাজার ৫০৫টি মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়। এ মুহূর্তে ঢাকা রেঞ্জের ১৩টি জেলায় এক বছরের বেশি সময়ের মামলার সংখ্যা মাত্র ৪৩টি। অধিকতর তদন্তের মামলা গত বছর ছিল এক হাজারের বেশি। এখন মাত্র ৬টি। কোর্ট পিটিশনের মামলা তদন্তাধীন ছিল ১৩ হাজারের বেশি। এ সংখ্যা কমে এখন এক হাজার ৩০০। অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঝুলে থাকা মামলা শূন্যের কোটায়।

জানতে চাইলে নরসিংদীর এসপি কাজী আশরাফুল আজীম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে থানায় কোনো গুরুত্বপূর্ণ মামলা হলে সঙ্গে সঙ্গেই এসপি অফিস থেকে মনিটরিং শুরু করা হয়। থানা পুলিশকে দ্রুততার সঙ্গে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয়। এসব কারণে দ্রুত আসামি গ্রেফতারসহ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হচ্ছে। আর রহস্য উদ্ঘাটন হয়ে গেলে বা আসামি গ্রেফতার হলে অযথা মামলার তদন্ত ঝুলিয়ে রাখার কারণ নেই।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন