চট্টগ্রামে ৬ নেতা হত্যার তদন্তে অগ্রগতি নেই

অভিযুক্তরা ক্ষমতাসীন দলের, প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে আসামিরা

  নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম ব্যুরো ০৫ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামে একের পর এক রাজনৈতিক নেতা হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও ধরা পড়ছে না মূল ঘাতকরা। এসব হত্যায় অভিযুক্তদের বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা থাকায় এসব হত্যা মামলার তদন্ত থমকে আছে। চলতি বছরের গত চার মাসে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ৪ জন এবং গেল বছর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ১০ জন নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদার ভাগবাটোয়ারা, মাদক ব্যবসা ও জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণসহ নানা দখল-বেদখল নিয়ে ঘটেছে এসব হত্যাকাণ্ড। সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৬ জন পদধারী রাজনৈতিক নেতা খুনে জড়িতদের গ্রেফতারের দাবিতে চট্টগ্রামে হরতাল, বিক্ষোভ মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে তাদের অনুসারীরা।

এর মধ্যে ছিল নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাস, যুবদল নেতা হারুন-উর রশিদ, যুবলীগ নেতা মহিউদ্দিন ও ফরিদুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সহ-সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম নুরু এবং প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ও নগর ছাত্রলীগ নেতা নাসিম আহমেদ সোহেল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম চকবাজারে ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুবলীগের দুই গ্র“পের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন যুবলীগ কর্মী ফরিদুল ইসলাম। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী ৮ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ২০ জনকে আসামি করে থানায় হত্যা মামলা দেন। নিহত ফরিদের স্ত্রী বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। চকবাজার থানার ওসি মীর মোহাম্মদ নুরুল হুদা জানান, ফরিদ হত্যার আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচিতে নগরীর বন্দর থানাধীন মেহের আফজল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় যুবলীগ নেতা মহিউদ্দিন মহিকে। বন্দর থানা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক হাজী ইকবালের নেতৃত্বে এ হত্যাকাণ্ড ঘটলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। এ ঘটনায় নিহতের মা বাদী হয়ে হাজী ইকবাল, মুরাদ আলী ও ছেলে আলী আকবরসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ২৯ মার্চ রাতে নগরীর চকবাজার থানাধীন চন্দনপুরা এলাকার মিন্নি মহলের বাসা থেকে তুলে নিয়ে খুন করা হয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম নুরুকে। এর পরদিন ৩০ মার্চ হাত-পা, চোখ বাঁধা অবস্থায় নুরুর লাশ রাউজান উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের কর্ণফুলী নদীর তীর থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ৩১ মার্চ রাউজান থানার এসআই কামাল হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ঘটনার ১২ দিন পর রাউজান নোয়াপাড়া পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ শেখ মো. জাবেদকে প্রধান আসামি করে ১৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন নিহতের স্ত্রী সুমি আকতার। বাকি ১২ আসামি আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। নিহতের স্ত্রী সুমি আকতার যুগান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার এক বছরেও পুলিশ হত্যার কোনো ক্লু উদঘাটন করতে পারেনি। যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তারাও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আসামিরা ক্ষমতাসীন দলের হওয়ার কারণে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না।’

গত বছরের ৩ ডিসেম্বর দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয় সদরঘাট থানা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও পরিবহন ব্যবসায়ী হারুনুর রশীদ চৌধুরী। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই হুমায়ুন কবির চৌধুরী বাদী হয়ে সন্দেহজনক ১০ জনকে আসামি করে সদরঘাট থানায় মামলা করেন। মামলার আসামিরা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এখনও আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।

একই বছরের ৬ অক্টোবর নগরীর সদরঘাট থানাধীন নিজ বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় মহানগর ছাত্রলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে। এ ঘটনায় সুদীপ্তের পিতা বাবুল বিশ্বাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া পাঁচজনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এর মধ্যে দু’জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে হত্যার দায় স্বীকার করে জড়িত আরও ২৫ থেকে ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে। হত্যায় জড়িতরা লালখান বাজার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুমের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। স্তিমিত হয়ে পড়েছে এ হত্যা মামলার তদন্তও। নিহতের স্বজনদের দাবি জবানবন্দিতে আসা আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ পুলিশ তাদের ধরছে না।

২০১৬ সালের ২৯ মার্চ প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ ২৩তম ব্যাচের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অতিথি করা নিয়ে বিরোধের জের ধরে খুন হন নগর ছাত্রলীগের সদস্য নাসিম আহমেদ সোহেল। নগরীর ওয়াসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পরদিন নাসিমের বাবা আবু তাহের বাদী হয়ে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত পরিচয় ২০-২৫ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। সোহেল হত্যার প্রধান আসামি সোহানসহ এখন অনেক আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে। সোহেল হত্যার প্রতিবাদে তার অনুসারী ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ নগরীতে ছাত্র ধর্মঘট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমাবেশ, পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান ধর্মঘট এবং প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের কার্যালয় অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। তবে এখনও তদন্ত শেষ করতে পারেনি চকবাজার থানা পুলিশ।

তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আরিফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সোহেল হত্যা মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। প্রধান আসামি সোহানকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter