শতফুল ফুটতে দাও

সাম্য ছাড়া টেকসই উন্নয়ন হয় না

  ড. মাহবুব উল্লাহ্ ০৯ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ড. মাহবুব উল্লাহ

বর্ষপরিক্রমায় পুরনো বছর শেষ করে আমরা নতুন বছরে পদার্পণ করেছি। বাংলাদেশের দৈনিকগুলো ২০১৭ সালটি কেমন কেটেছে তা নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। আমাদের দেশে অর্থবছর হিসাব করা হয় পূর্ববর্তী বছরের জুলাই মাস থেকে পরবর্তী বছরের জুন মাস পর্যন্ত। সুতরাং একটি খ্রিস্টীয় বছর দুটি অর্থবছরের পরিসংখ্যানকে অর্ধেক অর্ধেক করে ধারণ করে। এর ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে একটি পূর্ণ খ্রিস্টীয় বছরের অবস্থা কেমন ছিল তা নির্ণয় করা কঠিন। বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তিরা অবশ্য একটু চেষ্টা করলে খ্রিস্টীয় বছরের অবস্থা সম্পর্কে বলতে পারে।

পরিসংখ্যান শাস্ত্রটি গ্রিক সভ্যতার সময় থেকে সৃষ্টি হয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় এ শাস্ত্রের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। একদিকে যখন অর্থনৈতিক জীবনের জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে তখন পরিসংখ্যান শাস্ত্রের পরিশীলতাও অকল্পনীয়ভাবে উন্নতি লাভ করেছে। এর ফলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জটিল গ্রন্থিগুলো উন্মোচন করাও সম্ভব হচ্ছে। অবশ্য পরিসংখ্যান শাস্ত্র আমাদের কতটুকু পথ দেখাতে পারে সেটি নির্ভর করে মানুষের আচরণসংক্রান্ত ধারণার ওপর। অন্তত দুই শতাব্দী ধরে অর্থনীতিবিদরা বলে আসছেন, মানুষ যুক্তি-বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হয়। অর্থাৎ মানুষ Rational-এর ওপর ভিত্তি করেই ঊপড়হড়সরপ সধহ-এর ধারণাটিও গড়ে উঠেছে। গত ১০-২০ বছর ধরে অর্থনীতি শাস্ত্রের একটি ভিন্ন ধারা গড়ে উঠতে শুরু করেছে। এর নাম Behavioral Economics. ২০০২ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডেনিয়েল কাহনেম্যান এর জন্য নোবেল প্রাইজও পেয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষকে দৃশ্যত যুক্তি মেনে আচরণ করতে দেখা গেলেও অনেক সময়ই সে রকম আচরণ করে না। ডেনিয়েল কাহনেম্যানের প্রয়াস ছিল অর্থনীতিশাস্ত্র ও মনোবিজ্ঞানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ রচনা করা। কাহনেম্যানের তত্ত্ব যেহেতু সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পেয়েছে, সেহেতু বলা যায়, অর্থনীতি শাস্ত্রের অনেক তত্ত্বই মানুষের আচরণ ধর্মের বিচারে ভেঙে পড়বে। তারপরও আমরা মানুষের যুক্তিবাদী আচরণভিত্তিক তত্ত্বগুলোকে ছুড়ে ফেলে দিইনি।

পরিসংখ্যান শাস্ত্রের উদ্দেশ্য হল সরকারের চোখ-কান খুলে দেয়া। যাতে সরকার দেশের বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারে এবং সে অনুযায়ী নীতিনির্ধারণ করতে পারে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, পরিসংখ্যান অনেক সময় প্রচারণার কাজেও ব্যবহৃত হয়। সরকারগুলোকে দেখা যায়, ভুল পরিসংখ্যান তুলে ধরে অথবা পরিসংখ্যানের সূচকগুলোকে স্ফীত করে বাহবা কুড়াতে। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। সঠিক পরিসংখ্যান হয়তো অনেক সময় এমন বাহবা কুড়ানোর জন্য কাজে আসে না। বরং সরকারের সাফল্য সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু সঠিক পরিসংখ্যানের গুণ হল তা সঠিক নীতিনির্ধারণে সাহায্য করা। নীতিনির্ধারণ সঠিকভাবে করতে পারলে সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া যায়। ফলে শেষ বিচারে সরকার এবং জনগণ উভয়েই লাভবান হয়।

পরিসংখ্যান রচনায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানটি হল বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। জাতীয় অর্থনীতির দিকনির্দেশনায় এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিকে শক্তিশালী ও দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য যে প্রয়াস গ্রহণ করা উচিত ছিল, দুর্ভাগ্যজনকভাবে তেমনটি লক্ষ করা যায় না। কয়েক বছর আগে এই সরকারের আমলে কৃষিসংক্রান্ত বিবিএসের পরিসংখ্যান নিয়ে কৃষিমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে বিবিএসের ডিজিকে ভর্ৎসনা করতে দেখা গেছে। অথচ আদর্শ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব হল যতদূর সম্ভব সঠিক তথ্য পরিবেশন করা। এরকম চাপ ও হুমকির মুখে কী করে পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তারা বিবেকতাড়িত হয়ে কাজ চালিয়ে যাবেন সেটাও বোঝা কঠিন। অন্যদিকে ব্যুরোর কর্মকর্তাদের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। সামষ্টিক অর্থনীতির একটি হিসাবে হেরফের করলে অন্য হিসাবগুলোয়ও পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ব্যাপারটি বোঝা খুব কঠিন নয়। শতকরা হিসাবে মোট সংখ্যা ১০০-এর ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন ক্ষেত্রের অবদান শতকরা হিসাবে প্রকাশ করা হয়। কৃষির উৎপাদন বাড়িয়ে দেখানো হলে শিল্প কিংবা সেবা খাতে শতকরা হিসাবগুলো অনিবার্য হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিগত পরিসংখ্যানের মধ্যে প্রবৃদ্ধি পরিসংখ্যান কখনোই বিতর্কমুক্ত থাকতে পারেনি। সরকারিভাবে প্রবৃদ্ধির যে পরিসংখ্যান দেয়া হয়, তার সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রদত্ত প্রবৃদ্ধির হিসাবের সঙ্গে গরমিল প্রায়ই দেখা যায়। সরকারের দাবি অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ অতিক্রম করেছে। পরিসংখ্যানটি যদি সঠিক হয়, তাহলে অন্য সামষ্টিক চলকগুলোর সঙ্গে একটা সহসম্পর্ক থাকবে। ঋণ, রফতানি ও আমদানিসহ বিভিন্ন সামষ্টিক চলকগুলো, প্রবৃদ্ধির অঙ্কের সঙ্গে সহসম্পর্কিত থাকবে। কিন্তু এ সম্পর্কহীনতা পরিসংখ্যানে কারসাজির সন্দেহ সৃষ্টি করছে। ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এমএ তসলিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে তার লেখা নিবন্ধ Where did the benefits of economic growth disappear-এ এসব নিয়ে বেশকিছু প্রশ্নের অবতারণা করেছেন। তার মতে, যেসব পরিসংখ্যানের গঠন সংখ্যা বেশি এবং সময়ের বিস্তৃতির দিক থেকে সংক্ষিপ্ত, সেগুলো অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য। কারণ সেগুলো ক্রসচেক করা যায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ ব্যাংক ঋণের পরিসংখ্যান পরিবেশন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিটি ব্যাংকের ঋণ প্রদানের অঙ্ক যোগ করলেই সামগ্রিক ঋণ প্রদানের পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব। একইভাবে এনবিআর এবং রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোও রাজস্ব এবং রফতানিসংক্রান্ত পরিসংখ্যান তৈরি করে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে দেশীয় ও বিদেশি বিশেষজ্ঞরা অনেক চলকের তথ্যের ওপর নির্ভর করেন। তারা আন্তর্জাতিক প্রবণতা এবং দেশীয় উৎপাদন, ব্যয় এবং আমদানি-রফতানি ও ঋণের মতো উচ্চ গঠন সংখ্যাভিত্তিক তথ্যের মধ্যে সাযুজ্য খোঁজেন। তসলিমের মতে, পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলনের চেয়ে গত কয়েক বছর ধরে এগুলোর পরিমাণ নিন্মে অবস্থান করছিল। অনেকেরই নজর এড়িয়ে গেছে, আমাদের জাতীয় আয়ের পরিসংখ্যান কিছুসংখ্যক মাইক্রো লেভেল ডেটার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। মাইক্রো লেভেল ডেটা আমাদের সাধারণ মানুষের কল্যাণ সম্পর্কে বুঝতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ব্যাপকভিত্তিক এবং সুগভীর জরিপের মাধ্যমে প্রতি পাঁচ বছর গৃহস্থালির আয়-ব্যয় সম্পর্কে তথ্য নির্মাণ করে। ২০১৬ সালে মাঠপর্যায়ে করা এ জরিপের ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে। এ জরিপ থেকে গৃহস্থালির আকৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আয়-ব্যয়সহ নানা বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। নিবিড় জরিপভিত্তিক হওয়ায় এ পরিসংখ্যান জাতীয় আয়সংক্রান্ত পরিসংখ্যানের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য। খানা আয়-ব্যয় জরিপ থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালে খানা প্রতি নামিক আয় ছিল ৭ হাজার ২০৩ টাকা, ২০১০ সালে ১১ হাজার ৪৭৯ টাকা এবং ২০১৬ সালে ১৫ হাজার ৯৪৫ টাকা। এর পাশাপাশি নামিক ভোগ একই সময়ানুক্রমে ছিল যথাক্রমে ৫ হাজার ৯৬৪, ১১ হাজার ৩, ১৫ হাজার ৪২০ টাকা। এ হিসাব চলতি বাজার মূল্যভিত্তিক। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি হয়েছে। ২০০৫-এ ভোগ্যমূল্য সূচক ছিল ১০০। কিন্তু ২০১০ ও ২০১৬ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল যথাক্রমে ১৪১ ও ২২০। অর্থাৎ টাকার অঙ্কে আয় ও ভোগ বৃদ্ধি পেলেও মূল্যসূচক বেড়ে যাওয়ার ফলে গৃহস্থালির আয় ও ভোগ সেভাবে বৃদ্ধি পায়নি। গৃহস্থালির প্রকৃত আয় ভোগ্যমূল্য সূচকের নিরিখে দাঁড়িয়েছে একই সময়ানুক্রমে ৭ হাজার ২০৩ টাকা, ৮ হাজার ১৩০ টাকা এবং ৭ হাজার ২৫২ টাকা। একইভাবে প্রকৃত ভোগের পরিমাণ গৃহস্থালিপ্রতি ছিল একই সময়ানুক্রমে ৫ হাজার ৯৬৪, ৭ হাজার ৭৯২ ও ৭ হাজার ১৪ টাকা। তাহলে ব্যাপারটি দাঁড়াল কী? ২০১০-এর তুলনায় গৃহস্থালিপ্রতি প্রকৃত আয় এবং প্রকৃত ভোগ ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে বেশ খানিকটা কমে গেছে। তবে লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছিল ২০০৫ থেকে ২০১০-এ। একই সময়ে ৩টি সরকার ক্ষমতায় ছিল। এগুলো যথাক্রমে বিএনপি সরকার, জরুরি আইনের সরকার এবং আওয়ামী লীগের সরকার। গৃহস্থালির আকার জানা গেলে মাথাপিছু গৃহস্থালির প্রকৃত আয়ও জানা সম্ভব। ২০০৫-এ গৃহস্থালির মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৩৯১ টাকা, ২০১০-এ ১ হাজার ৮০৭ টাকা এবং ২০১৬-তে ১ হাজার ৭৮৬ টাকা। আয় হ্রাস পেলে ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণও যে কমে যায় সেটা জানা যায় এফএও এবং ডব্লিউএইচও-এর তথ্য থেকে। ২০০৫-এ ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৩৯, ২০১০-এ ২ হাজার ৩১৮ এবং ২০১৬-তে ২ হাজার ২১০। ক্যালরি গ্রহণের দিক থেকেও ২০১০-এর তুলনায় ২০১৬-তে অধঃগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। ২০১৭ সম্পর্কে এরকম তথ্য পরিবেশন করা গেল না; কিন্তু খাদ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় এ সময় মূল্যস্ফীতিও বেশ বেড়েছে। একটি সংস্থার হিসাবমতে, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ৫ লাখ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ফসলহানি ঘটেছে এবং সময়মতো খাদ্য আমদানি করতে না পারার ফলে চালের দামও বলগাহীনভাবে বেড়েছে। এ জন্যই সঠিক পরিসংখ্যান খুবই জরুরি।

বাংলাদেশে খানা আয়-ব্যয় জরিপ থেকে আয়বৈষম্য বৃদ্ধির সমস্যা যে আরও প্রকট হয়েছে, তা বোঝা যায়। ২০১৬-এর খানা আয়-ব্যয় জরিপ থেকে দেখা যায়, আয় বণ্টনের সূচক যা গিনি সূচক নামে পরিচিত, তা বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ আয়বৈষম্য আরও প্রকট হয়েছে এবং গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের অবস্থার অবনতি হয়েছে। ২০১০ সালে সবচেয়ে দরিদ্র এক-পঞ্চমাংশ গৃহস্থালি মোট আয়ের ২.৭৮ শতাংশ পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের মধ্যে তাদের হিস্যা হ্রাস পেয়ে ১.২৪ শতাংশে দাঁড়ায়। অন্যদিকে আয়ের সর্বোচ্চ শিখরে থাকা ৫ শতাংশ গৃহস্থালির ২০১০-এ আয়ের হিস্যা ছিল ২৪.৬ শতাংশ। ২০১৬-তে তাদের হিস্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২৭.৯ শতাংশে। গত ৬ বছরে গরিব ও ধনীর মধ্যে আয়ের বৈষম্য অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ তারও আগের ৫ বছরে পরিস্থিতি এমন ছিল না। ২০০৫-এ গিনি সূচক ছিল ০.৪৬৭ এবং ২০১০-এ ছিল ০.৪৫৮। অর্থাৎ এ সময়টায় আয় খানিকটা হ্রাস পেয়েছিল। ২০১৬-তে গিনি সূচক বাংলাদেশোত্তর কালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়ে ০.৪৮৩-এ দাঁড়িয়েছে। গিনি সূচক বাড়তে থাকলে বুঝতে হবে বৈষম্য বাড়ছে। গিনি সূচক ০ থেকে ১ এর মধ্যে হয়। সূচকটি যদি ১ হয় তাহলে বুঝতে হবে চরমতম বৈষম্য বিরাজ করছে। সূচকটি যদি ০ হয় তাহলে বুঝতে হবে কোনো বৈষম্য নেই। তবে বাস্তব জগতে এ দুটির কোনোটিই হয় না। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, গিনি সূচক ০.৫ হলে সেটা হয়ে দাঁড়ায় বিপজ্জনক বৈষম্য। এর ফলে সামাজিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। যেমনটি হয়েছিল তিউনেসিয়ায়। হয়েছে গত সপ্তাহ বা তার আগের সপ্তাহে ইরানে। ২০১৭ সালে এসে বাংলাদেশে গিনি সূচকে কোনো উন্নতি হয়েছে বলে মনে করার বোধগম্য কারণ নেই। কারণ বিনিয়োগ স্থবিরতা, বেকারত্ব, ব্যাংকে খেলাপি ঋণ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের প্রবণতা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজ ত্রৈমাসিক প্রতিচিন্তায় মানবজমিন ২০১৭ উদ্ধৃত করে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি অ্যাকাউন্টধারী ছিল মাত্র ৫ জন। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭। ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে ছিল ৯৮ জন। এরপর ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪৩। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের জুনে কোটিপতির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৯৪। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর শেষে কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ১৬২। এরপর অক্টোবর ২০০১ থেকে ডিসেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে হয়েছিল ৮ হাজার ৮৮৭। অর্থাৎ এ সময়ে কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজারে। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২ বছরে, অর্থাৎ ২০০৭-০৮ সালে বেড়েছিল ৫ হাজার ১১৪। এ সময়ে কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৯ হাজারের বেশি। পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট কোটিপতির সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৩৬৯। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭ বছরে দেশে মোট কোটিপতির সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৬১।’ এখানে কোটিপতি কথাটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে। বাস্তবে কোটিপতির মধ্যে যেমন- সর্বনিন্ম ১ কোটি টাকার মালিক আছে, তেমনি আছে শত-সহস্র কোটি টাকার মালিক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ছিল ‘সাম্য’। এ চেতনাকে ভ্রূকুটি দেখিয়ে ধাই-ধাই করে বেড়ে চলছে অসাম্য। পাকিস্তান সৃষ্টির পর অসাম্য ও অন্যায়ের বিস্তার দেখে এক কবি জিন্নাহকে লক্ষ্য করে লিখেছিলেন, ‘এমন আজাদ দেশ, এমন আজাদির স্বাদ তুমি কি চেয়েছিলে বন্ধু?’ এমন ধরনের একটি কবিতা লেখার পরিস্থিতি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতিকে লক্ষ্য করে লেখার অবস্থা শুধু আজ নয়, বেশ আগেই তৈরি হয়েছিল। প্রশ্নটি তিক্ত। কিন্তু সমাধানের পথে না এগোলে শুধু তিক্ততার মধ্যেই পরিস্থিতি সীমাবদ্ধ থাকবে না- এমন আশঙ্কা করা অমূলক নয়। অনেক অপরিণামদর্শী বলে থাকেন, উন্নয়ন হলে অসাম্য হবেই। হয়তো তারা সায়মন কুজনেটসের তত্ত্ব পড়ে এমন কথা বলছেন, অথবা না পড়ে না জেনেই বাস্তবতাকে আড়াল করার জন্য বলছেন। তবে ঘোরতর অসাম্য উন্নয়নের গল্পকে কেবল পরিহাসই করে। এমন অসাম্যের মধ্যে উন্নয়ন কিছুতেই টেকসই হতে পারে না। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সাম্য।

ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.